তারুণ্যই ভারতের শক্তি, তবে...

শুধু এশিয়া নয়, পুরো পৃথিবীকে এক সময় অর্থনৈতিকভাবে শাসন করবে ভারত। সারাবিশ্বকে অর্থনৈতিকভাবে শাসন করতে ভারতের যে জিনিসটি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে তাহলো দেশটির জনসংখ্যা। প্রশ্ন জাগতে পারে, জনসংখ্যার দিক দিয়ে চীন তো ভারতের থেকে এগিয়ে, তাহলে কেন ভারতের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে? উত্তর হলো ভারতের তরুণ জনসংখ্যা। তারুণ্যই যে ভারতের শক্তি। তবে এই শক্তিকে সুসংহতভাবে ব্যবহার করতে জানতে হবে ভারতকে। ২০৪০ সালের মধ্যে সারাবিশ্বে যে কর্মক্ষম জনবল দাঁড়াবে তার প্রায় এক চতুর্থাংশই হবে ভারতে। বর্তমানে ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১২২ কোটি। ২০৪০ সালের মধ্যে প্রতিমাসে কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যোগ দিবে। আবার ভারতের জনসংখ্যার অর্ধেকের বয়স ২৫ বছরের নিচে। ৬৫ শতাংশ লোকের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। ২০২০ সালের মধ্যে ভারতীয়দের গড় বয়স হবে মাত্র ২৯ বছর। ওই সময় চীন ও আমেরিকার জনসংখ্যার গড় বয়স হবে ৩৭ বছর। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর জনসংখ্যার গড় বয়স হবে ৪৫ বছর। আর জাপানের গড় বয়স দাঁড়াবে ৪৮। বিশাল একটি তরুণ জনগোষ্ঠী পেতে যাচ্ছে ভারত। আইএমএফ ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে, ভারতের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধার কারণে আগামী ২০ বছরের মধ্যে আরো দুই শতাংশ বেশি মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই অর্জন থেকে ভারত এখনো অনেক বহু দূরে রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু বেশি জনসংখ্যা হলেই কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয় না। মানবসম্পদকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সোপান হিসেবে ব্যবহার করতে হলে তাদের দক্ষতা সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও শিক্ষিত করে তোলা অপরিহার্য। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, কোন দেশের জনসংখ্যাকে কার্যকর করে গড়ে তুলতে হলে সবার আগে তাদের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নতি করতে হবে। এক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান তেমন একটা সুবিধার নয়। সামগ্রিক স্বাস্থ্যখাতের উন্নতি, বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের সুস্বাস্থ্য গড়ে তোলার মতো সারাদেশে এখনো পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। দারিদ্র্যও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসেবে ভারতের ৩২.৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। যাদের মাথাপিছু আয় দৈনিক মাত্র ১ দশমিক ২৫ ডলার। বিশ্বের মোট দরিদ্র মানুষের এক তৃতীয়াংশেরই বাস ভারতে। বিশ্বব্যাংক অপুষ্টিজনিত অবস্থা ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার মধ্যে একটি সরাসরি যোগসূত্র দেখিয়ে বলেছে, যদি ভারত শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও উন্নত পরিবেশে না রাখতে পারে তাহলে ভবিষ্যতে উত্পাদনশীলতা ও উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানব উন্নয়ন নির্দেশক র্যাংকিংয়ে ১৮৭টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৩৪। এর অর্থ এখনো অনেকটা পথ হাঁটতে হবে ভারতকে। দ্রুত তার বিরাট সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয় হলো বিশাল তরুণ সমাজকে শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সাধারণ পদে ভারতীয়দের বেশি পাওয়া যায়। কোম্পানির শীর্ষ পদে যাওয়ার জন্য যে পরিমাণ দক্ষতা প্রয়োজন তা এখনো অর্জন করতে পারেনি ভারতীয়রা। তবে আউটসোর্সিংয়ে সারাবিশ্বে নিজেদের স্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছে ভারতীয়রা। তরুণদের প্রস্তুত করতে ভারত সরকার নানা উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। ২০৪০ সালের মধ্যে যে কর্মশক্তি তৈরি হবে তাদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। সে হিসেবে প্রতিবছর ভারতে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ লোকের কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। ভারতে বিনিয়োগের অভাব ও নানা কারণে এখনো এই পরিমাণ কর্মক্ষেত্র বৃদ্ধির হার তৈরি হয়নি। আরেকটি বিশেষ দিক হলো ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এই শ্রেণি দেশের অর্থনীতি, দুর্নীতি ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এই শ্রেণিটিকে যথোপযুক্ত ব্যবহার করাটাও ভারতের একটি চ্যালেঞ্জ। শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠী মূলত বেশি উঠে আসে এই শ্রেণি থেকে।