রৌহানির বিজয়

ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সংস্কারপন্থিদের সমর্থনে হাসান রৌহানির বিজয় দেশের দক্ষিণপন্থি শক্তির জন্য বেশ কিছু অস্বস্তিকর বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। রৌহানি ইরানের সংস্কারপন্থিদের পছন্দের তালিকায় প্রথম কিংবা দ্বিতীয় অবস্থানেও ছিলেন না। তাদের প্রথম পছন্দ ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট খাতামি। কিন্তু তিনি নির্বাচনের জন্য এগিয়ে আসেননি। পরে তারা দক্ষ রাজনীতিবিদ আলী আকবর হাশেমি রাফসানজানিকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে। সর্বশেষ যখন সংস্কারবাদী নেতা মোহাম্মদ রেজা আরেফ হাসান, রৌহানির সমর্থনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন তখন সংস্কারবাদীরা নির্বাচনে রৌহানির পক্ষে নামলেন। তার বিজয় নিশ্চিতভাবেই সংস্কারবাদীদের শক্তিশালী করেছে। নির্বাচনে মধ্যপন্থী রক্ষণশীল প্রার্থী হাসান রৌহানিকে গত শনিবার বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। শুক্রবারের এই ভোটাভুটিতে তিনি পেয়েছেন এক কোটি ৮৫ লাখের বেশি ভোট, যা মোট প্রদত্ত ভোটের পঞ্চাশ শতাংশের সামান্য বেশি। তার নিকটতম প্রতিদন্দ্বী তেহরানের মেয়র মোহাম্মদ বাকার কালিবাফের তুলনায় তিনি বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেন। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিই ১৩ অগাস্ট এই নির্বাচনকে অনুমোদন দেবেন । রৌহানির পেছনে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির সমর্থন রয়েছে, যিনি একজন সংস্কারপন্থি। এছাড়াও তাকে সমর্থন দিয়েছেন আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি যিনি একজন মধ্যপন্থি। দ্বিতীয় দফা ভোট এড়ানোর জন্য রৌহানির প্রথম দফায় ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়া দরকার ছিল যা তিনি পেতে সমর্থ হয়েছেন। সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার পর আহমাদিনেজাদ ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ালেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের গবেষক ফারায সানেই ফল ঘোষণার আগে বিবিসিকে বলেন, ফলাফলের এই প্রবণতা অনেককে বিস্মিত করেছে। তিনি বলেন, ইরান বিষয়ক বহু বিশ্লেষক, সেইসঙ্গে অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এই ফলাফলে বিস্মিত। দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অনুগত চরম রক্ষণশীল ৫ জন প্রার্থীর বিপরীতে মধ্যপন্থী ও ও বাস্তববাদী রক্ষণশীল প্রার্থী রৌহানিকে দেখা হয়েছে কার্যত একজন বিরোধী প্রার্থী হিসাবে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ৬৪ বছরের ধর্মীয় নেতা রৌহানি কট্টরপন্থীদের সমালোচনা করে বলেছেন, তারা পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি যে ধরনের নীতি অনুসরণ করছেন তা ইরানকে একটা চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। রৌহানি পশ্চিমের দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের আবার আলোচনার পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন । চার বছর নেতাদের বন্দিদশা, গণমাধ্যমের সহযোগিতা হ্রাস ইত্যাদির পর সংস্কারবাদীরা দেখছে জনগণ তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছে। যদিও রৌহানিকে একজন সংস্কারবাদী না বলে মধ্যপন্থি নেতা বললেই যথাযথ হবে। রক্ষণশীলদের সমর্থক গণমাধ্যমগুলোও তাদের সমালোচনা করছে। তাবনাক নিউজ এজেন্সির একটি সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, রক্ষণশীলদের পরাজয়ের প্রয়োজন ছিল। তাদেরকে বুঝতে হবে তাদেরও জবাবদিহিতা রয়েছে, গণমাধ্যমের ওপর একচেটিয়া প্রভাবের দিন শেষ হয়েছে। জাভান সংবাদপত্রে বলা হয়েছে, এই নির্বাচনের ফলাফল বর্তমান রাজনৈতিক কার্যক্রম ও আচরণের একটি সংশোধনী।রক্ষণশীলরা নিজেদের অবস্থানকে বেশ মজবুত মনে করেছিল তাই ্্এ্্্্্্ই নির্বাচন তাদের একটি ধাক্কা দেবে। সংস্কারপন্থিরা তাদের শক্তির জানান দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে রক্ষণশীলরা পরিবর্তনের এই বার্তা কতটুকু অনুধাবন করতে পারবে। রৌহানির বিজয় কি ইরানে সত্যি সত্যি পরিবর্তন আনবে?