অসুস্থ ম্যান্ডেলাকে নিয়ে ডাক্তারদের বাড়াবাড়ি

নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট। তিনি ১৯৯৪ হতে ১৯৯৯ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ম্যান্ডেলা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সশস্ত্র সংগঠনের নেতা হিসেবে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৬২ সালে তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকার গ্রেফতার করে ও অন্তর্ঘাতসহ নানা অপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়। ম্যান্ডেলা ২৭ বছর কারাবাস করেন। এর অধিকাংশ সময়ই তিনি ছিলেন রবেন দ্বীপে। ১৯৯০ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারিতে তিনি কারামুক্ত হন। এর পর তিনি তাঁর দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকারের সাথে শান্তি আলোচনায় অংশ নেন। এর ফলশ্রুতিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটে এবং সব বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে ১৯৯৪ সালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেকেই তাকে মাদিবা বলে ডাকে। গত চার দশকে ম্যান্ডেলা ২৫০টিরও অধিক পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৯৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পান তিনি। গত এক সপ্তাহ ধরে ফুসফুসের সংক্রমণজনিত অসুস্থতায় এই মহান নেতা হাসপাতালে আছেন। যদিও কয়েকদিন স্থিতিশীল থাকার পর তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু সারাজীবন সংগ্রাম করে, জেল খেটে বেঁচে থাকা মানুষটি আবারো যেন কারাবন্দি। নিঃসঙ্গ, একা ম্যান্ডেলার জন্য হাসপাতালকে এখন কারাগার বললে ভুল হবে না। আর এটা হচ্ছে ডাক্তারদের এক রকম বাড়াবাড়িতে। ম্যান্ডেলার দেহরক্ষী শন ভ্যান হিরডেন। ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ম্যান্ডেলার দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করে আসছেন। তার মতে, অসুস্থ ম্যান্ডেলা এখন কারাগারে ফিরে এসছেন। এসএএনডিএফ’র যেসব ডাক্তাররা ম্যান্ডেলার চিকিত্সা করছেন তারা এখন যেন কারারক্ষী। ডাক্তারদের নির্দেশে পরিদর্শক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিন্ত্রয়ণ করতে হচ্ছে তাকে। ভ্যান হিরডেনের মতে, মাদিবা এখন খুবই নিঃসঙ্গ। মনে হচ্ছে হাসপাতালের লোকেরা তাকে আবারো জেলে এনে রেখেছে। ম্যান্ডেলার একান্ত অনুসারী আহমেদ খাথরাদা। তিনি বলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে ম্যান্ডেলার কাছে লোকজনের প্রবেশ কমিয়ে দেয়ায় এ বছরের শুরু থেকে তিনি সাক্ষাত্ করতে পারেননি। ডাক্তার বলেছে, মাদিবাকে একা ছাড়তে। যেন সে একটু বিশ্রাম নিতে পারে। এজন্য আমি তার সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করিনি। ভ্যান হিরডেনকে ভালো করে চেনেন খাথরাদা। তার মতে, ভ্যান হিরডেন একজন ভালো মানুষ। সে তার দায়িত্ব যথাযথভাব পালন করছেন। তবে ম্যান্ডেলাকে নিয়ে ডাক্তারদের বাড়াবাড়িতে হিরডেনের অসেন্তাষও আছে। এবারও ম্যান্ডেলা অসুস্থ হওয়ার পর তার নিরাপত্তার জন্য হিরডেনকে মোতায়েন করা হয়। ম্যান্ডেলা অসুস্থ হওয়ার কারণে হাসপাতালের লোকেরা তার সঙ্গে ছবি তোলা ও অটোগ্রাফ নেয়ার সুযোগ নিচ্ছে। হিরডেনই একমাত্র ব্যক্তি যে তাদের এসব কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, মাঝ গভীর রাতে ডাক্তাররা ম্যান্ডেলার রুমে আসে। হাতে করে আনে ম্যান্ডেলার লেখা বই লং ওয়াক টু ফ্রিডম। তারা চাই এ বইতে ম্যান্ডেলার একটি অটোগ্রাফ নিতে। এ কারণে আমি তাদের সতর্ক করেছি বেশ কয়েকবার। এছাড়া মাদিবাকে দেখতে কোনো বিশেষ অতিথিরা আসলে এসব ডাক্তাররা তাদের সঙ্গেও ছবি তোলার জন্য পাল্লা দিতে শুরু করে। এর আগে একবার মাদিবা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দেখত এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। তখনো মাদিবার চিকিত্সা করছিলেন বর্তমান ডাক্তার রামলকন। হিলারির সঙ্গে ছবি তোলার জন্য তিনি আমাকে ডেকেছিলেন। কিন্তু আমি মাদিবার কোনো অতিথির সঙ্গে ছবি তুলতে চাইনি। বইতে ম্যান্ডেলার স্বাক্ষর নেয়া থেকে আমি অনেক সময় বাধা দিয়েছি কিন্তু তাদের বরত রাখা সম্ভব হয়নি। ডাক্তাররা এমন আচরণ করছেন যে তারা ম্যান্ডেলাকে কিনে নিয়েছেন। মাদিবার সঙ্গে কে দেখা করবেন সেটাও এই ডাক্তাররা নির্ধারণ করছেন। আহমেদ খাথরাদা, জর্জ বিজস, সোফি ডে ব্রুয়েনের মতো মাদিবার পুরানো ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু তার সঙ্গে দেখা করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ডাক্তাররা মাদিবার সঙ্গে তাদের দেখা করতে দেয়নি। এমনকি ম্যান্ডেলার সাবেক ডাক্তার প্লিট যেন তাকে দেখতে না আসতে পারে সেজন্যও নিরাপত্তা বাহিনীকে চিঠিতে জানিয়েছে এই ডাক্তাররা। ভ্যান হিরডেন কী বলছেন এ বিষয়ে ডাক্তার প্লিটের কোনো ধারণা নেই বলে জানান। তবে প্লিট বলেন, গত বছর তিনি মাদিবাকে দেখেছিলেন সামাজিক ভিত্তিতে। ডাক্তার হিসেবে নয়। নেলসন ম্যান্ডেলা ফাউন্ডেশনের বিদায়ী প্রধান নির্বাহী আচমাট ড্যানগোর বলেন, এ চিঠির বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই। তবে হিরডেন ডাক্তারদের বাড়াবাড়ির বিষয়ে দুটি ঘটনার কথা জানান। ২০১০ সালে বিশ্বকাপের সময় জনসমুখে আসেন ম্যান্ডেলা। কিন্তু এ সময় ডাক্তার রামলকন বলেন, গলফ কোর্টে ম্যান্ডেলার সঙ্গে একটি মেডিক্যাল টিম যাবে। ঐ ডাক্তার জানান, আমরা ম্যান্ডেলা চিকিত্সার দায়িত্বে রয়েছি। মাঠে আমরাই তাকে নিয়ে যাবে। আমি তখন বাধা দিইনি। তবে আমি জানতাম সেখানে কী হবে। এর কারণ হলো এদিন মাদিবাকে শতকোটি মানুষ দেখবে। আর ডাক্তাররা চান তারা জনগণের সামনে নিজেদের তুলে ধরতে। নিজেদের দেখাতে। কুনুতে হিলারি ম্যান্ডেলাকে যখন দেখতে এসেছিলো তখন ডাক্তাররা ছবি তোলার জন্য তাকে হাইজ্যাক করেছিলো। ভ্যান হিরডেন বলেন, ম্যান্ডেলা এখন হাসপাতালে এজন্য আমি এসব কথা বলছি না। বরং এ কারণে ইউনিটে আমি বিভিন্ন রকম চাপে রয়েছি। আমি নিজের লাভের জন্য কখনো ম্যান্ডেলাকে ব্যবহার করিনি। ম্যান্ডেলার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতিই রয়েছে। হয়তো অনেক স্মৃতি নিয়ে কবরে যেতে হবে। হাসপাতালে ম্যান্ডেলার শারীরিক অবস্থা কিছু দিন স্থিতিশীল থাকার পর এখন একটু উন্নতির দিকে। দক্ষিণ আফ্রিকা শুধু নয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তার সুস্থতা কামনায় প্রার্থনা করছে। হিরডেনও এখন সেই প্রার্থনাই করছেন।