অন্য তারুণ্য
আবিষ্কারের নেশায় সামি
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৩, ১৯:৫৫
স্কুলজীবন থেকেই সামি ছিল আবিষ্কারের নেশায় মাতাল। গভীর রাতে যখন নিরবতা নেমে আসে ঠিক তখনই কুপির আলোতে শুরু হয় সামির কাজ। নির্জন রাতে সামির মা পাশে থেকে চেয়ে চেয়ে দেখতেন ছেলে কী আবিষ্কার করে। তখন কিছুই বুঝতে পারতেন না সামির মা। এভাবে দিন গড়াতে থাকে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান গবেষণা শিল্প পরিষদ আয়োজিত বিজ্ঞান মেলায় শ্রেষ্ঠ তরুণ বিজ্ঞানী নির্বাচিত হন। ‘গ্রামীণফোন বিজয়ের গল্প বলি’-তে নির্বাচিত ২৫টি গল্পের মধ্যেও সামির সংগ্রাম ও আবিষ্কারের গল্প ঠাঁই পায়। তরুণ আবিষ্কারকের গল্প জানাচ্ছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
কখনও কখনও রেলগেটগুলো অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করে। রেলগাড়ি আসছে অথচ সময়মতো আটকানো হচ্ছে না মোটরগাড়ির পথ। একদিকে হুইসেল বাজাতে বাজাতে আসছে ট্রেন, অন্যদিকে গাড়িও পার হয়ে যাচ্ছে রেললাইন। আবার রেলগাড়ির নিচে কাটা পড়ে অনেকের মৃত্যু হয় অসাবধানতায়। আবার কখনও কখনও লাইনম্যান ঘুমিয়ে পড়ে—এ রকম অনেক কারণ আছে দুর্ঘটনার। সে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়ার একটা উপায় বের করা হয়েছে। এ উপায় বের করেছেন স্বপ্নবান এক তরুণ। শাহাবুদ্দীন সামি তার নাম। সামি তার প্রকল্পে দেখিয়েছেন, একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে ট্রেন এলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম বাজবে, লালবাতি জ্বলে উঠবে এবং রেলগেটগুলো আপনাআপনি পড়ে যাবে। আবার নিরাপদ দূরত্ব পার হলেই নিজে থেকেই গেটগুলো উঠে যাবে এবং সবুজ বাতি জ্বলবে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ এই প্রকল্পের জন্য সামিকে ‘শ্রেষ্ঠ তরুণ বিজ্ঞানী’র পুরস্কার দেয়। এরপর সামি কাজ করে গেছেন নিভৃতে। করেছেন প্রকল্পের মানোন্নয়ন।
সামির বাবা নেই। মা সুফিয়া বেগম আর দুই ভাই, এক বোনের অভাব অনটনের সংসারে সামির বিজ্ঞান চর্চা কিন্তু থেমে নেই। বাসায় ছিল না কোনো গবেষণাগার, কোনো প্রযুক্তিগত সুবিধা। সামি বলেন, ‘বিজ্ঞানী ড. শমসের আলী আমাকে এ বিষয়ে উত্সাহিত করেন, যা আমার জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।’ শুধু রেল কন্ট্রোলার তৈরিই নয়। পরিত্যক্ত পানির বোতল দিয়ে তৈরি করেছেন লাইফ জ্যাকেট। সামি বলেন, ‘এই লাইফ জ্যাকেট তৈরিতে খরচ হয় মাত্র ২০ টাকা এবং এটি ১০০ কেজি ওজনের মানুষ ভাসিয়ে রাখতে সক্ষম।’ শুধু পড়ালেখা আর বিজ্ঞান চর্চাতেই শেষ নয়। সামি রেললাইনের উপর দিয়ে সাইকেল চালাতে পারেন ও ছবিও আঁকতে পারেন।
সামির লেখাপড়া ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পুরকৌশল বিভাগে। কিন্তু এরই মধ্যে বিজ্ঞানের নতুন নতুন প্রকল্প তৈরি করে সবাইকে বিস্মিত করেছেন নেত্রকোনার এই তরুণ বিজ্ঞানী। ‘স্বয়ংক্রিয় রেল নিয়ন্ত্রণ’ পদ্ধতির জন্য জাতীয়ভাবে শ্রেষ্ঠ তরুণ বিজ্ঞানীর সম্মান লাভের পর দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে অভিনন্দন জানান। গ্রামীণফোনের ‘বিজয়ের গল্প বলি’তে বিজয়ী হওয়ায় তাকে সম্মাননা জানানো হয় ২০১০ সালের মার্চে। সামি যত পুরস্কার পেয়েছেন, তার বেশির ভাগই এসেছে এই প্রকল্প থেকে। এ প্রকল্প উদ্ভাবনের শুরুতেই সামি নেত্রকোনা স্থানীয় বিজ্ঞান মেলায় প্রথম হন ২০০৫। প্রকল্পের মান উন্নয়ন করে দেশসেরা রৌপ্যপদক পেয়েছেন ২০০৫ ও ২০০৭ সালে। বিদ্যুত্ ছাড়াই লেমিনেটিং এরজন্য নেত্রকোনা জেলার শ্রেষ্ঠ খুদে বিজ্ঞানী হন ২০০১ সালে। বাতাসের গতি নির্ণয় যন্ত্র আবিষ্কারের কারণে ২০০৪ সালে নেত্রকোনা বিজ্ঞান মেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ সামিকে ‘শ্রেষ্ঠ তরুণ বিজ্ঞানী’ পদক দেয় ২০০৮ সালে।
সামির জন্ম নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে, ১৯৯২ সালের ২০ অক্টোবরে। সামি পদে পদে নানা বাধার মুখোমুখি হয়েছেন। সবসময় তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক বাধার দেয়াল। সামি যখন সপ্তম শ্রেণীতে, তখন বিল পরিশোধ করতে না পারায় বাড়ির বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেদিনগুলোর কথা বললেন সামি, ‘দিনে স্কুল আর পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। রাতে ভাঙা যন্ত্রপাতি দিয়ে কিছু একটা আবিষ্কারের চেষ্টা করতাম। বাড়ির বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন থাকায় কুপি জ্বালিয়ে সারা রাত জেগে কাজ করতাম। বারবার ব্যর্থ হয়েছি, কিন্তু হাল ছাড়িনি।’ সামি ভবিষ্যতে অনেক বড় বিজ্ঞানী হতে চান। এমন কিছু করে দেখাতে চায় যাতে সারা বিশ্ব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে সামির দিকে। এ জন্য সামি সবার সহায়তা চান। প্রতিবন্ধীদের জন্য কিছু করতে চান সামি। সামি এখন স্বপ্ন দেখেন কম খরচে রোবট তৈরি করার, যা প্রতিবন্ধীদের চলাফেরা ও কাজে সাহায্য করবে।
সম্প্রতি আমাদের এই তরুণ বিজ্ঞানী বেশ চ্যালেঞ্জিং এক প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। সাম্প্রতিক সাভারের রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় বেঁচে গেছে অনেক প্রাণ। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেরই ভাগ্য তেমন সুপ্রসন্ন ছিল না, জীবনের বিনিময়ে হারাতে হয়েছে হাত অথবা পা। আর এসব হতভাগ্যদের জন্য কিছু করতে চান সামি। তিনি যে প্রকল্প হাতে নিয়েছেন, তাতে যদি সফলতার মুখ দেখেন তাহলে এ পঙ্গু মানুষগুলো ফিরে পাবে তাদের অঙ্গ, তবে সেগুলো কৃত্রিম উপায়ে। তাদের জন্য কৃত্রিম অঙ্গ বানানোর কাজ করছেন সামি। সত্যিই এ এক মহান উদ্যোগ। আমাদের সবার প্রত্যাশা এই কাজে যেন তিনি সফলতা পান।