ফেলনা ও পুরাতন কাগজ থেকে বাণিজ্যিকভিত্তিতে নিউজপ্রিন্ট ও মিডিয়াম পেপার উত্পাদন হচ্ছে বগুড়ার বড় ছয়টি পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস কারখানায়। বিগত সাড়ে তিন বছরে গড়ে ওঠা এসব কারখানার প্রতিটিতে দৈনিক গড়ে ৪০ থেকে ৫০ টন কাগজ উত্পাদন হচ্ছে। সেই হিসেবে বছরে গড়ে প্রায় এক লাখ টন কাগজ উত্পাদন হচ্ছে বগুড়ার এসব কারখানায়।
এর বাইরে জেলায় গড়ে উঠেছে ১৮টি মাঝারি আকারের বোর্ড কাগজ তৈরির কারখানা। এসব কারখানায় বছরে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন বোর্ড কাগজ উত্পাদন হচ্ছে। এতে গড়ে কর্মসংস্থান হয়েছে সব মিলে ২৫ হাজার শ্রমিকের। শহরের ওলিগলিতে পড়ে থাকা ফেলনা কাগজ কুড়িয়ে দিনশেষে বগুড়ায় গড়ে ওঠা পেপার মিলে বিক্রি করে মুখে ভাত জুটছে কয়েকশ ছিন্নমূল পথশিশু ও অসহায় মানুষের। আর পুরানো কাগজ সংগ্রহের ব্যবসা করে জীবিকা চলছে প্রায় ছয় হাজার স্বল্পপুঁজির ব্যবসায়ীদের।
সরেজমিনে খোঁজ-খবর নিয়ে ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৯ সালে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের টিএমএসএস-এর প্রধান কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠে বিসিএল পেপার মিল্স। এর পাশাপাশি সময়ে শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের ফাঁসিতলা এলাকায় গড়ে ওঠে রাজা পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস লিমিটেড, বগুড়া শহরতলীর এরুলিয়া এলাকায় গড়ে ওঠে হাসান পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস্, বগুড়া দুপচাঁচিয়া সড়কের পাশে আজাদ পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস, বগুড়া-কাহালু সড়কের পাশে গড়ে ওঠে কিবরিয়া পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস এবং দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া বাজারে গড়ে ওঠে সূচি পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস্।
এর বাইরে শহরের নিশিন্দারা, কারবালা, মাটিডালি, দ্বিতীয় বাইপাস সড়কের জয়বাংলা মোড়, জয়পুরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট ও মাঝারি আকারের আরো ১৮টি বোর্ড কাগজ তৈরির কারখানা। ছোট-বড় ও মাঝারি এসব কারখানায় পুরাতন কাগজ গলিয়ে মন্ড তৈরির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে নিউজপ্রিন্ট ও মিডিয়াম পেপার ও বোর্ড কাগজ উত্পাদন হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে তালোড়া বাজারের অদূরে সূচি পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস্ ঘুরে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে উত্পাদনে যাওয়া এই কারখানায় ছাপাখানা শিল্পে ব্যবহূত নিউজপ্রিন্ট এবং প্যাকেজিং শিল্পে ব্যবহূত মিডিয়াম কাগজ তৈরি হচ্ছে।
এই কারখানার উদ্যোক্তা সুভাষ প্রসাদ বলেন, গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতেই তিনি শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার অদূরে গ্রামীণ এলাকায় এই পেপার মিলস কারখানা স্থাপন করেছেন। তার কারখানায় তিন শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। গ্রামীণ এলাকার এসব শ্রমিকেরা আগে বেকার ছিলেন। তিনি বলেন, গ্রামে গ্যাস না থাকায় বিদ্যুত্ দিয়ে কারখানা চালাতে হচ্ছে। এতে উত্পাদন খরচ বেশি পড়ছে। এ ছাড়া রয়েছে কাঁচামাল সংকট।
বগুড়ার এরুলিয়া এলাকায় ২০১৬ সাল থেকে উত্পাদনে রয়েছে হাসান পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস। এ মিলে দৈনিক গড়ে ৫০ টন মিডিয়াম পেপার উত্পাদন হচ্ছে। এখানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৩৫০ জন শ্রমিকের।
কারখানাটির উদ্যোক্তা এটিএম শফিকুল হাসান বলেন, উত্পাদিত কাগজ দেশীয় বাজারে চাহিদা থাকায় এ শিল্পের আরো অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু গ্যাস সংযোগ না থাকা এবং কাঁচামালের সংকট এ শিল্পের জন্য বেশ অন্তরায়। সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার উদ্যোক্তাদের সহায়তা করলে বগুড়ায় এ শিল্প স্থাপনে আরো বেশি উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবেন।
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার অদূরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পাশে ফাঁসিতলায় গড়ে উঠেছে রাজা পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস লিমিটেড।
এ কারখানার উদ্যোক্তা ও বগুড়ার ব্যবসায়ী খন্দকার মেজবাহুল হক বলেন, গ্যাস সংযোগ মিলবে না এমনটা জেনেই শহর থেকে বেশ দূরে গ্রামীণ এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে মোটা অঙ্কের লগ্নি বিনিয়োগ করেছি। শুধু ব্যবসা নয়; গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতেই এই ঝুঁকিটা নিয়েছি। এই কারখানায় গড়ে প্রতিদিন ৩৫০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। বছরে গড়ে ১৮ হাজার ২০ হাজার মেট্রিক টন নিউজপ্রিন্ট উত্পাদন হচ্ছে এই কারখানায়। উত্পাদিত কাগজ যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে। এসব কাগজ ছাপাখানা শিল্পে ব্যবহার হচ্ছে।
বগুড়ার বিসিএল পেপার মিলস এর প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, ২০০৯ সালে উত্পাদনে যাওয়া এই কারখানায় গড়ে প্রতিদিন ৩০ টন নিউজপ্রিন্ট এবং মিডিয়াম কাগজ উত্পাদন হয়। এখানে প্রায় ৫৫০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। উত্পাদিত কাগজের প্রধান বাজার রাজধানী ঢাকা।
বগুড়া শহরের ছাপাখানা ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, বইখাতা বাঁধাই কাজে বোর্ড কাগজ প্রয়োজন পড়ে। ঢাকায় ২৪ আউন্সের বোর্ড কাগজ প্রতিটির দাম ৩২ টাকা। অন্যদিকে একই পরিমাণ পুরু বগুড়ায় উত্পাদিত বোর্ড কাগজের দাম গড়ে ২২ টাকা। দামে সাশ্রয়ী হওয়ায় স্থানীয় কারখানায় উত্পাদিত বোর্ড কাগজের চাহিদা বেশি।