অনন্ত আদর্শের অপেক্ষায়
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০১৩, ২০:০৪
উচ্ছ্বল শৈশবে বাবা-মা তাকে দিয়েছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা। যখন যেদিকে আগ্রহ দেখিয়েছেন, কলেজ শিক্ষক বাবা তাতে আরও প্রেরণা জুগিয়েছেন। পড়ালেখায় ভালো হলেই যে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে, এমন ধারণা থেকে বের হয়ে ফার্মাসিতে পড়ার স্বপ্ন দেখেছিল ছেলেটা। সেদিনের স্বপ্নবাজ সেই তরুণ আজ দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি রাব্বুর রেজা, এ দেশের ঔষধশিল্পের বিকাশে একজন অগ্রপথিক। তিনি অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের অ্যাসোসিয়েট ফেলো, আমেরিকান সোসাইটি অব হেলথ সিস্টেম ফার্মাসিস্ট এবং ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটি অব অস্ট্রেলিয়ার সদস্য। সেই সাথে ইউনাইটেড নেশনস এনভারনমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউনেপ)-এর মেডিক্যাল টেকনিক্যাল অপশন কমিটির সম্মানিত সদস্যও তিনি। গুণী এই মানুষটা প্রজন্মকে শুনিয়েছেন তার পথচলার গল্প। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র, ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
রাব্বুর রেজার ছেলেবেলা কেটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তিন ভাইয়ের মাঝে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বাবা-মায়ের আদর-শাসনের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘কোনো কাজে বাবা-মা কখনও বাঁধ সাধেননি।’ আরও জানান, এই অফুরন্ত স্বাধীনতার অপব্যবহারও করেননি তিনি কখনোই। গণ্ডির বাইরে ভাবতে শিখিয়েছিলেন বাবা তাকে। সবকিছুতেই তাই আগ্রহের কমতি ছিল না রাব্বুর রেজার। পড়াশোনাতে বরাবরই ভালো ফলাফল করে এসেছেন, তার জন্য যে খুব বই নিয়ে বসে থাকতেন তা না, চেষ্টা করতেন জেনে-বুঝে কোনো বিষয়কে আত্মস্থ করার। একটা সময় পারিপার্শ্বিকতার কারণে অনেকেই চাইতেন মেধাবী এই ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হোক। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের পড়াশোনা শেষ করে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগও পেয়ে যান তিনি। কয়েক মাস পড়ার পরই ফার্মাসিতে শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে যান ভারতের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিতে। আশির দশকের শেষভাগটা তখন। ঔষধশিল্পের ভবিষ্যত্ যে ভালোই হবে, সেটা অনুমান করা যাচ্ছিল। সব ভেবেচিন্তেই তাই ফার্মাসিতে ভর্তি হয়ে গেলেন তিনি। সময়ের সফল একজন ফার্মাসিস্টের এই জগতে শুরুটা এভাবেই।
রাব্বুর রেজা পাঞ্জাব থেকে পড়াশোনা শেষ করেই দেশে ফিরে আসেন। বেক্সিমকো ফার্মাতে যোগ দিলেন প্রোডাক্ট অফিসার হিসেবে। নব্বই দশকে দেশের ফার্মা খাত দ্রুত বিকশিত হতে থাকে এবং এটি একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। এই সময়টাতেই বেক্সিমকোর বিপণন বিভাগের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন তিনি। ১৯৯৭ সালের দিকে রাব্বুর রেজা এমবিএ করার জন্য পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। ফার্মাসিউটিক্যালে কাজ করতে করতেই তিনি অনুধাবন করেন যে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ব্যবসায় প্রশাসনে অভিজ্ঞতারও দরকার রয়েছে। সেই আগ্রহেই অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে তিনি এমবিএ করেন। এমবিএ শেষ করে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোতে কয়েক বছর কাজ করেন তিনি। এর ফলে তার অভিজ্ঞতার পরিধি বেড়েছে। একটা বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালনা করা হয়, সেটাও তিনি সামনে থেকে দেখেছেন। ২০০৫ সালের দিকে আবার দেশে ফিরে আসেন তিনি। বেক্সিমকোতেই আবার নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। পদোন্নতি পেয়ে পরিচালক হন মার্কেটিং বিভাগের। এরই মধ্যে আমেরিকার হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল এবং লন্ডন বিজনেস স্কুল থেকে স্ট্র্যাটেজি এবং লিডারশিপে উচ্চতর এক্সিকিউটিভ এডুকেশন গ্রহণ করেন, যেটা একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক হিসেবে গড়ে উঠতে তাকে অনেক সাহায্য করেছে। তার অভিজ্ঞতা আর পারদর্শিতার বিচারের এরপর কর্তৃপক্ষ তাকে ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানের চিফ অপারেটিং অফিসার পদে আসীন করেন। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা আর ভালোবাসা থেকেই সেই গুরুদায়িত্ব সফলভাবে পালন করে চলেছেন রাব্বুর রেজা।
প্রজন্মের এই মেধাবী মানুষটার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ঔষধশিল্পে নতুন প্রজন্মের কাজ সম্পর্কে। তিনি জানালেন, তরুণেরা সবসময়ই ভালো করছে, নতুন নতুন ভাবনার আশ্রয়ে নবপ্রজন্মেরই তো জয়যাত্রা এখন। তবে আরও ভালো করতে কাজের প্রতি ভালোবাসা থাকাটা খুবই দরকার। এই বিষয়টা নতুনদের একটু বোঝা প্রয়োজন বলে মন্তব্য তার। কাজের দায়িত্বকে শুধুই দায়িত্ব না ভেবে যদি একটু ভালোবেসে করা যায়, সেটা বরং অনেক সহায়কই হয়। তার নিজের অভিজ্ঞতাটাও তেমনিই—ফার্মাসিতে পড়তে এসে আন্তরিকতার সবটুকু দিয়ে চেয়েছেন এই জগতের সুধাটুকু খুঁজে নিতে এবং এর প্রবণতায় সাফল্যের স্বাদও পেয়েছেন। এরই আলোকে বলা যায়, নতুনরা যে কাজই করুক; আগ্রহ আর ভালোবাসা থেকে করলে সফলতা আসবেই।
দেশের ফার্মাসিউটিক্যালসের অগ্রযাত্রা রাব্বুর রেজা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেই সূত্রে তার কাছ থেকে সংক্ষেপে জানতে চেয়েছিলাম এই শিল্পের বিকাশ সম্পর্কে। তিনি জানালেন, স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত আমাদের দেশের ওষুধ আসত বাইরে থেকেই। বহুজাতিক কিছু প্রতিষ্ঠানই পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে এই বাজার। ১৯৮২ সালে ড্রাগ পলিসি প্রণয়নের ফলেই আসলে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে এই খাতে। ঔষধশিল্পের ক্রমশ বিকাশ ঘটতে থাকে। আর মাঝের এই ত্রিশ বছরে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে উন্নত দেশগুলোসহ বিশ্বের অনেক দেশে পৌঁছেছে আমাদের তৈরি ওষুধ। বেক্সিমকোও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে সর্বোচ্চ মানের প্রোডাক্ট দিয়েই উন্নত দেশগুলোতে ওষুধ রফতানি শুরু করে। আর এখন অর্ধশতেরও বেশি দেশে সরবরাহ রয়েছে তাদের। এরই মধ্যে বেক্সিমকো ফার্মা টিজিএ অস্ট্রেলিয়া, ইইউ জিএমপি, এনভিসা ব্রাজিল, জিসিসি জিএমপিসহ সর্বাধিক সংখ্যক জিএমপি অনুমোদন লাভ করেছে। বেক্সিমকো বরাবরই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার দিয়ে ওষুধ উত্পাদনে মনোনিবেশ করেছে। সেই যাত্রায় মিটারড ডোজ ইনহেলার, অপথ্যালমিকস, ইনট্রাভেনাস ফ্লুইড, ড্রাই পাউডার ইনহেলার, প্রিফিলড সিরিঞ্জ বেক্সিমকোর ভিন্ন পরিচিতি তৈরি করে দিয়েছে বিশ্বের দরবারে। এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারলেই অদূর ভবিষ্যতে রফতানির দুয়ার আরও উন্মোচিত হবে মনে করেন রাব্বুর রেজা। তার নেতৃত্বে বেক্সিমকো কাজ করে যাচ্ছে এমন একটা লক্ষ্য সামনে রেখেই। প্রজন্মের এই আইকনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, অগ্রসরমান এই পেশায় কাজের সুযোগ কেমন রয়েছে সামনের দিনগুলোতে? আর তারা কেমন প্রার্থীদেরকেই বা অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন? রাব্বুর রেজা বলেন, ‘এই শিল্পে বিজ্ঞান বা ফার্মাসী শাস্ত্র তো বটেই, প্রকৌশল ও ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থীদেরও কাজের সুযোগ রয়েছে। তারা বরাবরই প্রার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয়ের পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক জ্ঞান ও ইংরেজি দক্ষতাকে বিশেষ প্রাধান্য দেন বলে জানালেন। একসময় বিদেশি ওষুধের রাজত্ব থাকলেও এখন মাথা তুলে সরব হয়ে উঠেছে দেশি ওষুধের কোম্পানিগুলো। বর্তমানে উত্পাদনে রয়েছে এমন দেশি ওষুধ কোম্পানির সংখ্যা ১৬০-এর বেশি। লক্ষ্য ঠিক রেখে যে কেউ এই ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারেন, মন্তব্য তার। রাব্বুর রেজা এত বিশাল দাপ্তরিক কাজের পরেও পরিবারের মানুষদের কাছে আত্মার আপনজন। তার বাবা ছিলেন কলেজের শিক্ষক, মা গৃহিণী। মূলত তাদের টানেই বাইরের দেশের সুযোগ সব অগ্রাহ্য করে এসেছেন তিনি সবসময়। প্রিয় বাবা-মা ক’ বছর হলো চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সন্তানের সাফল্যে তারা বরাবরই উচ্ছ্বাসিত ছিলেন। সব কাজে উত্সাহ দিতেন, অনুপ্রেরণা দিতেন। ঠিক এখন নিজের মেয়েদেরকেও একই ভাবে উত্সাহ-অনুপ্রেরনা দেন রাব্বুর রেজা। তিন মেয়ের দু’জন ফাবলিহা আর তাসফিয়া প্রি-মেডিকেল গ্র্যাজুয়েশন করছেন অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটিতে এবং আরেক মেয়ে সায়িরা পড়ছে গ্রেড ফোরে। স্ত্রী সুরাইয়া আক্তার একজন চিকিত্সক, তিনিও মেয়েদের সাথে অস্ট্রেলিয়ায়।
রাব্বুর রেজা মনে করেন, কেউই চিরদিন থাকে না। কিন্তু কিছু কাজ মানুষকে চিরঞ্জীব করে রাখে, সেই কাজগুলো অনন্তকাল আদর্শ হয়ে থাকে। এদেশীয় ফার্মাসিউটিক্যাল যাত্রায় বেক্সিমকোকে তিনি নিয়ে যেতে চান এ রকম কোনো মাত্রায়, যেটা শুধু প্রতিষ্ঠানই নয়, জীবন ছুঁয়ে যাবে বিশ্বের অনেক মানুষের। সে স্বপনের পথ ধরে অনেকটা দূর এগিয়ে যাবেন তিনি, অজস্র শুভকামনা তার জন্য।
রাব্বুর রেজা
জন্মতারিখ ও স্থান :১৪ নভেম্বর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
মায়ের নাম :রশিদা খানম
বাবার নাম :একলিমুর রেজা
প্রথম স্কুল :বাবুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :বাবা-মা
প্রিয় উক্তি :‘ইফ ইউ লাভ হোয়াট ইউ আর ডুইং, ইউ উইল বি সাকসেসফুল।’
প্রিয় পোশাক :পায়জামা-পাঞ্জাবি
অবসর কাটে যেভাবে :পড়াশোনা করে আর গান শুনে
সাফল্যের সংজ্ঞা :লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য চেষ্টা করে যাওয়া।