মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এ প্রজন্ম

একটি প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ মানবসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন করার একটি প্রক্রিয়া মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা। এ ছাড়াও কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট করা, আগ্রহীদের মধ্য থেকে যোগ্যদের খুঁজে বের করা, কর্মীদের সাথে প্রতিষ্ঠানের সু-সম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের কর্মজীবনে উত্তরোত্তর উন্নয়নের পথ সৃষ্টি করা এবং প্রয়োজনে তাদের চাকরিচ্যুত করাসহ প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ সম্পর্কিত সব ধরনের কাজই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাজ। এই প্রজন্মের তেমনই কয়েকজন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। পুরো আয়োজনটি দেখুন পরের পৃষ্ঠায়। সম্পাদনা এবং গ্রন্থনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র মঞ্জুরুল আলম হেড অব এইচআর ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড একটা দুইটা বা তিনটা নয়। নয় নয়টা স্কুলে ঘুরে ঘুরে কেটেছে তার স্কুলজীবন। বাবা ছিলেন প্রকৌশলী। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাজে এ শহর ও শহর ঘুরতে হয়েছে। দুই ভাইকেও সেই সাথে তল্পিতল্পা গোছাতে হতো। তারা অবশ্য বিষয়টা পছন্দ করতেন আর মেনেও নিয়েছিলেন। বছর বছর নতুন নতুন স্কুল আর বন্ধু পাওয়ার সৌভাগ্য কজনেরই বা হয়! মঞ্জুরুল আলম জুয়েলের কথা বলছি। ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব এইচআর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। শৈশবের সেই যে অভিযোজন ক্ষমতা, সেটা তাকে এই সময়ে এই পরিবেশ কাজ করতে দারুণ সাহায্য করেছে। মঞ্জুরুল আলম ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান হিসেবে এ বিষয় সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে বলেন, ‘মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা আধুনিক বিশ্বের একটি চৌকস চাকরি ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে এর জনপ্রিয়তা এবং ক্ষেত্র একেবারেই নতুন বলা চলে। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে এ পেশার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কর্মক্ষমতার যথার্থ ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়ে বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ‘মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ বিভাগের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য অর্জন অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার উপর।’ একজন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপককে প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার বাইরেও অনেক বেশি সচেতন থাকতে হয় তার যোগাযোগ দক্ষতা নিয়ে, সবার সাথে সম্পর্কটা সৌহার্দ্যপূর্ণ করে নিতে। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট অফিসারের ভালো যোগাযোগ দক্ষতা এবং অন্যের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বোঝার ক্ষমতা থাকা আবশ্যক। কর্মজীবনে একজন হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট অফিসারের সবার নিকট গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসী হতে হয়। নিজ প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান ও সেই আনুযায়ী মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা করতে হয় এই বিভাগের কর্মীদের।’ এরপরই তিনি এই পেশায় আসতে আগ্রহীদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘এই পেশায় যারা প্রবেশ করতে চান তাদের কিছু প্রাথমিক যোগ্যতা থাকা বাধ্যতামূলক। শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম স্নাতক পাস হতে হবে। ব্যবসায় শিক্ষা ও এইচআরএম বিষয়ে ডিগ্রিধারী ব্যক্তিরা প্রাধান্য পেলেও অন্য বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ ব্যক্তিরা এ পেশায় আসতে পারেন। এ পেশায় প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি নেতৃত্বগুণ, ধৈর্য্য, সদালাপ, সমস্যা সমাধানে পারদর্শিতাকে বিশেষ গুণ হিসেবে দেখা হয়।’ মঞ্জুরুল আলমের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তার কাজের ধরন সম্পর্কে। উত্তরে তিনি বলেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়নে সবসময় কাজ করে যায় হিউম্যান রিসোর্স বিভাগের কর্মকর্তারা। প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সুন্দরভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের বিভিন্ন ধরনের কর্মসংশ্লিষ্ট ট্রেনিং প্রদানের ব্যবস্থা করে থাকেন তারা। সেইসাথে কর্মরত ব্যক্তিদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজসমূহ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারছেন কি না তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বও এই বিভাগটির উপরই বর্তায়। মূলত এই বিভাগে কর্মরত ব্যক্তিরা স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকেন।’ মঞ্জুরুল আলম আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে আধুনিক ধারার চাকরির বাজারে হিউম্যান রিসোর্স বিভাগে কর্মরতরা যথেষ্ট ভূমিকা রেখে চলেছে। পেশা হিসেবে হিউম্যান রিসোর্স বিভাগটি আপনাকে খুব দ্রুতই সাফল্যের চূড়ায় নিতে সহায়তা করবে।’ মঞ্জুরুল আলম ব্যক্তিজীবনেও একজন সজ্জন মানুষ। স্ত্রী আর দুই কন্যা আনিকা ও আদিতাকে নিয়ে কাটে তার অবসর। মা দুই সন্তানকে আদর্শ করে গড়ে তুলেছেন, করছেন লেখালেখিও। একমাত্র ছোট ভাই কর্মরত রয়েছেন ওয়ান ব্যাংকে। আর কাজের অবসরে মঞ্জুরুল আলম মাঝে মাঝে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন, কখনও গিটারের টুং টাং ছন্দে মাতেন। মঞ্জুরুল আলম ডাকনাম :জুয়েল জন্মতারিখ ও স্থান :৯ এপ্রিল, চট্টগ্রাম মায়ের নাম :ফেরদৌসী মজুমদার বাবার নাম :আব্দুস সাত্তার প্রথম স্কুল :হাতেখড়ি স্কুল, আগ্রাবাদ প্রিয় মানুষ :আমার মা প্রিয় উক্তি :এক্সেস-অ্যাকসেস-অ্যাকসেপটেবিলিটি প্রিয় পোশাক :শার্ট-প্যান্ট অবসর কাটে যেভাবে :গিটার বাজিয়ে, ড্রাইভ করে সাফল্যের সংজ্ঞা :অনন্ত আদর্শ হয়ে মানুষের মনে বেঁচে থাকা। ছবি :দীপঙ্কর দীপু === ফরিদা ইয়াসমিন ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (এইচআর), জিফোরএস সিকিউরিটি সার্ভিসেস শৈশব থেকেই মানুষের মাঝে থাকতে ভালোবাসতেন তিনি, ছিলেন অসাধারণ বন্ধুবত্সল! আর আজ তার উপরেই দায়িত্ব এসে পড়েছে অসংখ্য মানুষকে সম্পদে পরিণত করার। পড়াশোনার সময় থেকেই চেয়েছেন মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করবেন। নিজের যোগ্যতাতেই সেই সুযোগটি করে নিয়েছেন তিনি, শুনছেন ফরিদা ইয়াসমিন পিংকির কথা, যিনি ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বহুজাতিক নিরাপত্তা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান জিফোরএস-এর বাংলাদেশস্থ প্রধান কার্যালয়ে। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সম্পন্ন করার পরপরই তিনি আর সবার মতো পছন্দসই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ খুঁজছিলেন। নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন চাকরি বিষয়ক ওয়েবসাইটগুলোতে। সেই সূত্রেই তিনি ইন্টারভিউয়ের আমন্ত্রণ পান জিফোরএস-এ, আর প্রথম সাক্ষাতেই চাকরির সুযোগটা পেয়ে গেলেন। এখানে মূলত তাকে কাজ করতে হয় প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত বিষয়ে। আর সেই কাজ যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্যের সাথেই করে যাচ্ছেন তিনি। তরুণ এই কর্পোরেট ব্যবস্থাপক পিংকির কাছে আমরা জানতে চেয়েছিলাম, আমাদের দেশে এই ক্ষেত্রটি পেশা হিসেবে কতটা উপযোগী আর মেয়েরা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে এখানে। তিনি বলেন, ‘পেশা হিসেবে আর যেকোনো পেশার চেয়ে কর্পোরেট দুনিয়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি থাকে, কারণ এখানে কাজের পরিবেশটা অনেক বেশি ভালো। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্পোরেট নিয়মাবলি অনেক বেশি অনুসরণ করা হয়। এটা আমাদেরকে আরও বেশি সহায়তা করে স্বচ্ছন্দে কাজ করতে।’ এরপর মেয়েদের কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা স্বীকার করে পিংকি বলেন, ‘পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েরা কিছুটা সমস্যায় পড়তেই পারে কর্মক্ষেত্রে, নিজের যোগ্যতা দিয়ে সেই পরিস্থিতি সামলে নিতে হয়।’ প্রজন্মের মেধাবী এই ব্যবস্থাপক মনে করেন, নতুনরা যতই নিত্যনতুন ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসবে, ততই সমৃদ্ধ হবে এই ক্ষেত্র, আর নতুনরা যেন নিজেদের আরও শাণিত করে গড়ে তুলতে পারে, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়নরত সময় থেকেই নানাবিধ শিক্ষাকার্যক্রমের পাশাপাশি ক্যারিয়ারবান্ধব নানা আয়োজনেও অংশ নিতে হবে। সবার ভালোবাসা পেয়ে পেয়ে আনন্দেই কেটেছে পিংকির শৈশব! বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে জন্ম তার, সেখানেই পার করেছেন ছেলেবেলার উচ্ছল দিনগুলো। বাওয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি পরীক্ষা দেন, এইচএসসি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন হাজী মুহম্মদ মহসীন কলেজ থেকে। অতঃপর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেন। এর বাইরেও একাধিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। ব্যবসায়ী বাবা আর গৃহিণী মায়ের সংসারে তারা চার ভাই-বোন। বড় ভাই আইন পেশায় নিয়োজিত আর অন্য দু’বোন পিয়া ও রাইয়ান এখনও অধ্যয়নরত। ভবিষ্যতে নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে চান পিংকি, শখের এই রন্ধনশিল্পী সুযোগ পেলে নিজেই করতে চান একটি রেস্তোরাঁ! এর বাইরে তিনি তার কর্পোরেট দুনিয়ায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন যোগ্য একজন নির্বাহী হিসেবে, সেই কামনা নিরন্তর। ফরিদা ইয়াসমিন ডাকনাম :পিংকি জন্মতারিখ ও স্থান :১২ মে, চট্টগ্রাম মায়ের নাম :রাজিয়া সুলতানা বাবার নাম :নূরুল আফসার চৌধুরী প্রথম স্কুল :শাহ ওয়াইউল্লাহ ইনস্টিটিউট প্রিয় মানুষ :আমার মা প্রিয় উক্তি :আই আম দ্য মাস্টার অব মাই ফেট, আই আম দ্য ক্যাপ্টেন অব মাই সোল প্রিয় পোশাক :শাড়ি অবসর কাটে যেভাবে :ইন্টারনেট ব্রাউজিং, বই পড়ে, রান্না করে। সাফল্যের সংজ্ঞা :ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকা। == মাসুদ আল মনোয়ার এইচআর ম্যানেজার গ্ল্যাক্সো স্মিথ ক্লাইন বাংলাদেশ লিমিটেড আদমজী জুট মিলসের সেই কর্মময় পরিবেশের মাঝে বেড়ে ওঠা তার। বাবার চাকরির সুবাদেই সেখানে কেটেছে তার শৈশবের হাসিখেলার দিনগুলো। সবসময় নিজের পড়াশোনাটাকেই অগ্রাধিকার দিতেন। আর তাই সফলভাবে এসএসসি-এইচএসসি দেওয়ার পর সুযোগ পেয়ে গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে। স্বভাবতই দেশসেরা বিজনেস গ্র্যাজুয়েটদের এই পীঠস্থানেই তার সুযোগ হয় আধুনিক ব্যবসায়িক ধারার নতুন নতুন বিষয়গুলো সম্পর্কে জানার। সেই তুমুল আগ্রহ, জানার প্রচেষ্টাই পেশাজীবনে খুব অল্প সময়েই তাকে নিয়ে এসেছে দায়িত্বপূর্ণ পদে। বলছি মাসুদ আল মনোয়ারের কথা। বহুজাতিক সংস্থা গ্ল্যাক্সো স্মিথ ক্লাইনে মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। মানবসম্পদ তথা হিউম্যান রিসোর্স সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে মাসুদ বলেন, ‘মানবসম্পদ ধারণাটি যথেষ্টই আধুনিক। গত শতাব্দীর প্রথম দিকেও কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখা হতো না। তারা ছিলেন শুধুই শ্রমিক, উচ্চ পদস্থ কর্তাদের আদেশ পালন করা ছিল তাদের প্রথম ও প্রধান কাজ। ধীরে ধীরে কোম্পানিগুলো দেশে-বিদেশে বিস্তার লাভ করার পর উপলব্ধি করল যে এই বিস্তৃতি ধরে রাখার কাণ্ডারি হলো তাদের কর্মীগণ। একটি প্রতিষ্ঠানের লোকবলই তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই উপলব্ধি থেকেই ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন’ ধারণার প্রবর্তন। বাংলাদেশে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির হাত ধরে এর যাত্রা শুরু হয় ১৫-২০ বছর আগে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও দ্রুত মানবসম্পদ উন্নয়ন শাখা চালু করে, এতে আকর্ষণীয় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়।’ মানবসম্পদ বিভাগে দায়িত্ব পালনকারীদের কাজের ধরন সম্পর্কে জানতে চাইলে মাসুদ বলেন, ‘স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের লোকবল ও তাদের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামনে যথাযথ তথ্য উপস্থাপন করাই একজন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কর্মীর মূল কাজ। আর মানবসম্পদ বাহিনীতে যারা যোগ দিতে চান তাদের নিজেদেরও কিছু যোগ্যতা থাকা একান্ত জরুরি। নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা, যোগাযোগ বাড়ানোর দক্ষতা, কাউকে দেখেই তার অবস্থান বুঝে ফেলার সক্ষমতা, অন্যদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার মানসিকতা, সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখা ইত্যাদি যোগ্যতা থাকলে আপনি এ পেশায় ভালো করতে পারবেন। এ বিভাগে ভালো করতে হলে নিজেকে সত্ রাখা, পক্ষপাতদুষ্ট না হওয়া, কম্পিউটার-ইন্টারনেট সংক্রান্ত ধারণা, সময়নিষ্ঠ এবং পরিশ্রমী হলে সফলতা আপনার হাতের মুঠোয়।’ স্বল্প সময়েই অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানে কাজ করে আসা মাসুদ আল মনোয়ারের অভিজ্ঞতা এমনটাই বলে। মাসুদ আল মনোয়ার ২০০৫ সালে পড়াশোনা শেষ করেই সিটিসেলে যোগ দেন প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টে। এরপরই বাংলালিংকে চলে আসেন মানবসম্পদ বিভাগে। সেখান থেকেই নেসলে বাংলাদেশের মাধ্যমে বহুজাতিক এক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ হয়। সেখান থেকে ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোতে। এরপরই আসেন বর্তমান কর্মস্থল গ্ল্যাক্সোতে। তার কাজের জায়গা পরিবর্তন যে নেহায়েতই পেশার খাতিরে তা নয়। নতুন পরিবেশে ভিন্ন ধরনের কাজে আগ্রহই তার মূল কারণ। আর আগ্রহটা আছে বলেই তো চ্যালেঞ্জটা নিতে পারা যায় বলে মনে করেন তিনি। মাসুদের বাবা ছিলেন আদমজী জুট মিলসে, মা গৃহিণী। স্ত্রী নিশাত জাহান আরা ইসলাম বাংলালিংকে কর্মরত। একমাত্র সন্তান আয়ানাকে নিয়েই এখন তাদের আনন্দের দিনলিপি রচিত হয় প্রতিদিন। মাসুদ আল মনোয়ার ডাকনাম :ফারহাজ জন্মতারিখ ও স্থান :২০ মে, ঢাকা মায়ের নাম :রওনক আরা চৌধুরী বাবার নাম :মইনুর রহমান চৌধুরী প্রথম স্কুল :আদমজী জুট মিলস হাই স্কুল প্রিয় মানুষ :বাবা-মা প্রিয় পোশাক :আরামদায়ক যেকোনো পোশাক। প্রিয় উক্তি :যে পরিবর্তন অন্যের মাঝে দেখতে চাও, সেটা নিজের ভেতরে আনো। অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, মুভি দেখে, মিউজিক করে সাফল্যের সংজ্ঞা :আমার কাজ দেখে যখন অন্য কেউ অনুপ্রাণিত হয়। ছবি :দীপঙ্কর দীপু == হাসান তারিক এইচআর ম্যানেজার এসি আই গ্রুপ যশোর এমএম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে হাসান তারিক ভর্তি হন খুলনা ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে ব্যাচেলর অব আরবান অ্যান্ড রুরাল প্ল্যানিং কমপ্লিট করে ভর্তি হন বুয়েটে এমইউআরপিতে। কিন্তু শেষ করার আগেই সুযোগ পান ঢাকা ইউনিভার্সটির আইবিএতে এমবিএ করার। যদিও আরবান প্ল্যানিং তার অত্যন্ত পছন্দের বিষয় ছিল কিন্তু বাংলাদেশে আরবান প্ল্যানিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ কম থাকায় ডিসিশন নেন কর্পোরেট বিজনেসে ক্যারিয়ার গড়ার। তখনই হাসান তারিকের মনে হয়েছিল বাংলাদেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এইচআর ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা অর্জন করবে এবং এই পেশায় বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে। পাস করার সাথে সাথেই দেখতে পান এইচআর-এর উপর পড়ালেখা করা লোকের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। পড়ালেখা শেষ করতে না করতেই সুযোগ আসে শান্তা ইন্ডাস্ট্রিজে কাজে যোগদানের। এরপরে শুধুই এগিয়ে চলা। যশোর শহরে মধ্যবিত্ত এক পরিবারে হাসান তারিকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বিএএফ শাহীন স্কুলের শিক্ষকদের কড়া শাসন ও নিয়মানুবর্তিতার মাঝেই চলত বন্ধুদের সাথে দুষ্টুমি ও দুরন্তপনা। কোচিংয়ের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সাথে সাইকেলে করে ঘুরে বেড়ানো ছিল প্রিয় কাজ। বাবা ছিলেন পড়ালেখার ব্যাপারে দারুণ উদার একজন মানুষ। কিন্তু এ ব্যাপারে কখনোই তেমন প্রেসার দিতেন না। পড়ালেখা, খেলাধুলা, বন্ধুদের সাথে বাঁদরামি—এভাবেই শৈশব আর কৈশোর কেটে যায় চারপাশে সবুজ পরিবেষ্ঠিত ছোট শহরটিতে। নিজের ক্যারিয়ার সম্পর্কে জানাতে গিয়ে হাসান তারিক বলেন, ‘মনে হয় সঠিক পেশাটিই বেছে নিয়েছিলাম। সেকারণেই আন্তরিকতার সাথে কাজ করে সাফল্য লাভ করতে পেরেছি। শান্তা ইন্ডাস্ট্রিজের দেড় বছরের কর্মজীবন ছিল অনেক বৈচিত্র্য আর চ্যালেঞ্জে ভরপুর। শান্তা ইন্ডাস্ট্রিজে আমি এইচআর ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি লাভ করি এবং ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে এসিআইতে যোগদান করি। এসিআই বাংলাদেশের অন্যতম লোকাল কর্পোরেট হাউস যেখানে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে আমি এসিআই গ্রুপের এইচআর ম্যানেজার পদে কর্মরত আছি, এসিআই-এর কর্মীদের সুন্দর কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।’ এই প্রজন্ম সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক শিক্ষার্থীই এখন বিবিএ বা এমবিএ-তে মেজর হিসেবে এইচআরকে বেছে নিচ্ছে। আমরা কোম্পানিতে এইচআর এক্সিকিউটিভ পজিশনের জন্য ফ্রেশ ক্যান্ডিডেটদের প্রাধান্য দিই। বর্তমান জনশক্তির একটি বড় অংশই তরুণ এবং তরুণরাই একটি কোম্পানির মূল চালিকাশক্তি। নতুনদের মাথা থেকে অনেক ইনোভেটিভ এবং ক্রিয়েটিভ আইডিয়া আসে যা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পেশা পছন্দ করতে ভুল হলে এবং কাজে আনন্দ না পেলে কর্মজীবন দুর্বিষহ মনে হবে। সেকারণে পেশা পছন্দের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। আর এইচআর প্রফেশনালদের কোম্পানিতে রোল মডেল হিসেবে কাজ করতে হয়। এ জন্য কোম্পানির পলিসি পরিপূর্ণভাবে মেনে চলা উচিত। এ ছাড়া এইচআর প্রফেশনালদের সর্বদাই পড়ালেখার মাঝে থাকতে হয় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন কি সংযোজিত হলো তা জানা এবং প্রয়োগ করার জন্য।’ সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এইচআর-এর উপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে চাই এবং এইচআর-এর উপর রিসার্চ কাজগুলোর সাথে যুক্ত হতে চাই। আমার স্বপ্ন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্ম পরিবেশে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা যা থেকে মালিক এবং কর্মচারী সকলেই উপকৃত হতে পারে।’ হাসান তারিক ডাকনাম :তারিক জন্মতারিখ ও স্থান :৫ জানুয়ারি, যশোর মায়ের নাম :সুফিয়া ইসলাম বাবার নাম :সিরাজুল ইসলাম প্রথম স্কুল :সম্মিলনি ইনস্টিটিউশন প্রিয় মানুষ :বাবা প্রিয় উক্তি :Your life is in your hands, to make of it what you choose. প্রিয় পোশাক :জিন্স, পোলো শার্ট অবসর কাটে যেভাবে :পড়াশোনা করে, মুভি দেখে আর ঘুরে বেড়িয়ে। সাফল্যের সংজ্ঞা :ভালো মানুষ হওয়া।