প্রজন্ম আইকন
বিকল্প বিনিয়োগে আপনজন
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০১৩, ১৯:৪০
পড়াশোনা করেছেন রসায়ন বিজ্ঞানে। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে ফিন্যান্সে এমবিএ করেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকগুলোতেই কাজের দারুণ সুযোগ ছিল তার। মন সেদিকে টানেনি, চেয়েছিলেন ফিন্যান্সের পাঠ্যবই থেকে বেরিয়ে বাস্তবিক প্রয়োগ কাছ থেকে দেখবেন। সেইরকম কিছু স্বপ্ন সামনে রেখেই যোগ দিয়েছিলেন গ্রামীণ ফান্ডে। বিকল্প বিনিয়োগকে প্রণোদনা দেওয়াই তার কাজ ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আজ তিনি বিশ্বের প্রথম কাতারে থাকা ভেনচার ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান সীফের (স্মল এন্টারপ্রাইজ অ্যাসিস্টেন্স ফান্ডস) বাংলাদেশ কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেই সাথে শখের বসে শুরু করলেও গুগল ম্যাপিংয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান নির্ণয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছেন। তিনি মোহাম্মদ আলতাফুজ্জামান, এই প্রজন্মের কাছে একজন আইকন। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
নতুন নতুন ভাবনার আশ্রয়ে নবপ্রজন্মের কাজের জয়যাত্রা এখন। বিশ্বের সেরা সেরা প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড বিবেচনায় আনলেও দেখা যাবে তরুণদের উদ্যোগেই শুরু হয়েছিল স্বপ্ন দেখা। আর যুগটা যেহেতু তথ্যপ্রযুক্তির, স্বাভাবিকভাবেই সবার ভাবনা থাকে তাকে কেন্দ্র করেই। কিন্তু ব্যবসায়ের বিশাল প্রসারের কথা কেবল স্বপ্নে দেখলেই হবে না, প্রয়োজন সেটার সঠিক বাস্তবায়ন। যেকোনো ব্যবসার শুরুতেই যেমন দরকার মূলধন, তেমনি দরকার কিছু পরামর্শও। সেইরকম চিন্তা চেতনার আশ্রয়েই সীফের যাত্রা শুরু। তারা চেয়েছিলেন তাদেরকেই প্রণোদনা দিবেন, যাদের রয়েছে আগ্রহ, মনোবল, লক্ষ্যে পৌঁছানোর মানসিকতা।
সীফ দুই দশক আগে যাত্রা শুরু করলেও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করে। আর শুরু থেকেই তাদের কাজের সারথী হয়েছেন আলতাফুজ্জামান, যিনি নিজেই বিকল্প বিনিয়োগে বাংলাদেশের একজন বিশেষজ্ঞ জন।
সীফের কর্মকাণ্ডটা আর সাধারণের মতো নয়। স্বভাবতই আলতাফুজ্জামানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে। তিনি জানান, মূলত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকে উত্সাহিত করা। প্রযুক্তির দিকগুলোতে বিনিয়োগে ব্যাংক অতটা উত্সাহী থাকে না। অথচ তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এই খাতে মেধার পরিচয় দিচ্ছে অনেকেই। অমিত সম্ভাবনাকে একটু উত্সাহ দিলেই খুব ভালো ফল আসতে থাকে। আর সীফের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা আর্থিক সাহায্য করেই হাল ছাড়েন না। নিজেকে বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠানের একজন হিসেবে ধরে তাদের সব কাজের উপর নজর রাখেন। বিশেষজ্ঞ পরামর্শকরা ব্যবসা সংক্রান্ত নানা বিষয়ে সহযোগিতাও করে থাকেন। সব মিলিয়ে একটা প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যান তারা নিজেদের মনে করেই। তাদের লাভ-ক্ষতির অংশীদারও হন তারা। এ যাত্রায় বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে বেশ কিছু সফল কাজে তাদের অবদান রয়েছে। আলতাফুজ্জামান নিজেও প্রকৌশলী দলের সাথে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সোলার সিস্টেম উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। এই খাতে বিনিয়োগের হারও বাড়াচ্ছেন তারা।
আলতাফুজ্জামান মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দেশে এসএমই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। বিকাশমান এসএমই খাত দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে অনেকটা বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। এর মাধ্যমে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে না, সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিও বেশ জোরালো হয়ে ওঠে। শিল্পকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে এসএমইর কার্যকারিতা অনেক বেশি। আমাদের এখানে বেসরকারি খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রায় শতকরা ৯৯ ভাগ এসএমইর অন্তর্ভুক্ত। অকৃষি খাতের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ শ্রমশক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সাম্প্রতিক সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া পড়েছে তেমন প্রেক্ষাপটে কোনোভাবেই এসএমই খাতকে অবহেলিত এবং গুরুত্বহীন অবস্থানে রাখার কথা ভাবা উচিত নয়। বরং এটাকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারকারী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। এসএমই খাত উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বেসরকারি খাতের দ্রুত বিকাশ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে সাধারণত।
দেশের বিনিয়োগ খাতকে আরও বেশি অগ্রসর করতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকে উত্সাহিত করার কথা উল্লেখ করে আলতাফুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগ এবং বিভিন্ন মহলের যথেষ্ট আন্তরিকতা থাকলেও এসএমই খাতকে এখনও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ প্রতিকূলতার মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত মূলধনের জোগানে ব্যর্থতা, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার প্রতিকূল বিধিবিধান, অবকাঠামোগত সমস্যা, আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞানের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা। এত সব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে এসএমই খাত নানাভাবে সাফল্যের সূচনা করেছে। এটা শুভ সংবাদ হলেও এসএমই শিল্পজাত পণ্যকে বৃহত্ শিল্প এবং বৈদেশিক আমদানিজাত পণ্যের সঙ্গে নিত্য প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত নীতিমালার কারণে অনেকেই সবকিছু গুছিয়ে আনার পরও প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছেন না।’ আর এইসব উদ্যোক্তাদের পাশেই রয়েছে আলতাফুজ্জামানের মতো মানুষেরা। তারা ব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযোগী হিসেবেই সেইসব উদ্যোক্তাদের শুরুটা করে দেন নিবিড়ভাবে। সেটার ফলেই হয়তো একটা সময় ব্যাংক আরও বড় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। আলতাফুজ্জামানের কাছে প্রশ্ন ছিল, এই বিনিয়োগ বা লাভ-ক্ষতির ঝুঁকিটা কেনই বা নিলেন তিনি? উত্তরে জানালেন গতানুগতিক ব্যাংকিং থেকে বেরিয়ে করতে চেয়েছিলেন ভিন্ন কিছু। আর সে যাত্রায় আজ তিনি সফলও বটে। তিনি মনে করেন, অর্থের পেছনে ছোটাই কখনও ক্যারিয়ার গড়ে দিতে পারে না। ভালোবেসে কিছু করে গেলে সেটার সফলতা আসবেই। আর এটা যে শুধুই কথার খাতিরে কথা নয়, তার উদাহরণ তিনিই। আইবিএর এমবিএ শেষ করে লোভনীয় কাজের সুযোগ ছেড়ে ভিন্ন কিছুকে আঁকড়ে ধরাটা তার জন্য সঠিক সিদ্ধান্তই ছিল।
আলতাফুজ্জামানের বেড়ে ওঠা পদ্মাপাড় রাজশাহীতে। সেখানেই কেটেছে স্কুল কলেজের উচ্ছল দিনগুলো। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পর চলে যান ভারতের আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে রসায়নে স্নাতক শেষ করে দেশে ফিরে এমবিএ করেন ফিন্যান্সে। নেদারল্যান্ড সরকারের বৃত্তিতে করেছেন এই বিষয়ে একটি ডিপ্লোমা। কাজের বাইরের শখের বসে গুগলের ম্যাপে বিভিন্ন জায়গার নির্দেশনা তৈরি করেন তিনি। এ কাজে বাংলাদেশের আরও অনেকেই সম্পৃক্ত, আলতাফুজ্জামান তাদের নিজেদের একটি প্ল্যাটফর্মও তৈরি করেছেন গুগল ম্যাপ মেকার নামে। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে গুগলের ম্যাপ মেকিংয়ের উপর বিভিন্ন কর্মশালাতেও অংশ নেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে একমাত্র সন্তান ওয়াফিকে নিয়েই কেটে যায় তার সারাদিন। স্ত্রী রাবেয়া বেগম গৃহিণী, তার সব কাজের সারথী। আলতাফুজ্জমান ভিন্ন ধারার বিনিয়োগের প্রসারে বাংলাদেশের একজন অগ্রপথিক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে যাবেন আজীবন, তেমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।
মোহাম্মদ আলতাফুজ্জামান
ডাকনাম :জামান
জন্মতারিখ ও স্থান :৮ আগস্ট, রাজশাহী
মায়ের নাম :শিরীন জামান
বাবার নাম :আরশাদ উজ জামান
প্রথম স্কুল :রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল
প্রিয় মানুষ :আমার মা
প্রিয় পোশাক :জিন্স-শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :নেট ব্রাউজিং করে
সাফল্যের সংজ্ঞা :আত্মতৃপ্তি