সাদা পোশাকের অপেক্ষায়
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০১৩, ২১:০৮
‘১২৮ ওয়ানডে খেলে আমার ১৬২ উইকেট এখন। আর একশ’ ওয়ানডে খেললে হয়তো আড়াইশ’ বা তিনশ’ উইকেটের মালিক থাকতাম। শুধু উইকেট সংখ্যার কারণেই লোকেরা গ্রেটদের সঙ্গে আমার নাম উচ্চারণ করত।’
মাত্রই অনুশীলন শেষ করে এসেছে ছেলেটি। সারা শরীর থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরে পড়ছে। সেদিকে খেয়াল নেই। ক্রিকেট বোর্ড অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে মাঠের দিকে। কাছে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করতে নিজেই হেসে বললো, ‘মাশরাফি ভাইয়ের অ্যাকশন দেখি। ওনার নাম মাশরাফি বিন মুর্তজা, আমার নাম হাসান বিন মুর্তজা। আমি ওনার মতো বোলার হতে চাই। উনি আমার আইডল।’
অনূর্ধ্ব-১৯ দলের পেসার হাসান বিন মুর্তজা একাই নয় মাশরাফির এই ভক্ত তালিকায়। কথা বলতে গিয়ে দেখা গেল, মাশরাফিদের পাশেই অনুশীলন করতে থাকা অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২৩ দলের বেশিরভাগ পেসারই অনেক আগে থেকে নাম লিখিয়ে বসে আছে এই ‘মাশরাফি-ভক্ত’ তালিকায়! এর মধ্যে হাসানের মতো কেউ একধাপ এগিয়ে এসে বলে, ‘দেখবেন, উনি আগের চেয়েও ভালো ফর্মে ফিরে আসবেন।’
আগের চেয়ে ভালো ফর্মে ফিরবেন কি না, সেটা সময় বলবে। তবে মাশরাফি নিজেও নিশ্চিত, আরেকবার ফেরার সময় হয়ে গেছে তার। শরীর-মন বলছে, এখন শুধু মাঠে নামার অপেক্ষা; বাকী সব তৈরি। আরেকবার ফিটনেসটাকে ঝালিয়ে দেখে ফিরতে ফিরতে বললেন, ‘একেবারে শতভাগ তৈরি, সেটা বলতে পারছি না। তবে হ্যাঁ, এখন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার জন্য প্রস্তুত আমি। এখন আবার টেস্ট খেলার জন্য মুখিয়ে আছি।’
এটাই আসল কথা। ইনজুরির ছোবলের ক্ষতবিক্ষত দেহটা নিয়ে ওয়ানডে মাঝে মাঝেই খেলছেন। ফলে ওয়ানডেতে মাশরাফির ফেরাটা আর বিরাট কোনো খবর নয়। এখন অপেক্ষা—চার বছর পর আবার সেই সাদা পোশাকে, লাল বল হাতে মাঠে নামবেন মাশরাফি।
শরীর প্রস্তুত হয়ে গেলেও সাদা পোশাকে মাঠে নামতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা মাশরাফিকে করতেই হচ্ছে। অক্টোবরে নিউজিল্যান্ড দল ঢাকায় এলে তবেই আবার টেস্ট খেলার সুযোগ মিলবে তার। সে পর্যন্ত মাশরাফির সময় কাটানোই যেন সমস্যা!
টেস্ট খেলার জন্য ক্রিকেটাররা সবসময়ই আকুলি-বিকুলি করেন। মাশরাফিও করছেন। তবে মাশরাফির ব্যাকুলতার নিজস্ব কিছু ব্যাখ্যাও আছে, ‘আসলে টেস্ট খেলবো না, এটা বলেছিলাম, শরীর আর সাড়া দিচ্ছিল না বলে। কিন্তু টেস্ট খেলার মজা তো আর কোনো ফরম্যাটে নেই। বিশেষ করে আমাদের বোলারদের জন্য বাকী দুই ফরম্যাটে তো আর কিচ্ছুই নেই। একমাত্র টেস্টেই নতুন কিছু করা, নিজেকে মানিয়ে নেয়া, নানারকম লড়াই করা; এগুলোর সুযোগ আছে। আর আমার ক্ষেত্রে লংগার ভার্সনটা আরেকটু জরুরি বলে ইদানিং মনে হচ্ছে। আমার ক্যারিয়ারটা তো এই যাওয়া-আসার মধ্যেই চলছে। মাঝে মাঝে এসে হঠাত্ হঠাত্ ওয়ানডে খেলছি; এতে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়। টেস্ট একটা খেলে তারপর সীমিত ওভারের যে কোনো ম্যাচ খেললে, যে কোনো বোলারের বল হবে গুলির মতো পারফেক্ট। সেটাই করার জন্য মুখিয়ে আছি।’
ড্রেসিংরুমে বসে কথাগুলো বলছিলেন আর হাতে লাল একটা বল অস্থির ভাবে ঘোরাচ্ছিলেন; যেন পারলে এখনই বলটা নিয়ে দৌড় দেন!
দলের আর সবার মতোই ফিটনেস ট্রেনিং দিয়ে এই দফা ক্যাম্প শুরু করেছেন। গতকাল অ্যাকাডেমির নেটে ক্যাম্পের বাকী পেসারদের সঙ্গে বেশ খানিক্ষণ ছোট রান আপে বলও করলেন। মাঝে মাঝেই ট্রেনার এসে জিজ্ঞেস করছিলেন, সব ঠিক আছে কি না। মাশরাফিকে নিয়ে ম্যানেজমেন্ট যে বাড়তি ভাবিত, সেটা বোঝা গেল অনুশীলন শেষ হয়ে যাওয়ার পর আবার তাকে নিয়ে শেন জার্গুসেন কাজ শুরু করায়।
পুরো রানআপ মেপে মূল মাঠে অনেক্ষণ বল করলেন মাশরাফি। জার্গুসেন বার বার রানআপের দৈর্ঘ্যটা ঠিকঠাক করে দিচ্ছিলেন, অ্যাকশন নিয়ে ধরে ধরে কথা বলছিলেন। বোঝাই যায়, এই এতোসব মনোযোগের কারণ একটাই—আবার যেন ইনজুরি এসে কামড় বসাতে না পারে।
এই যে বার বার ইনজুরির কামড়, বার বার ছিটকে যাওয়া; এ নিয়ে আফসোস আছে, বেদনা আছে মাশরাফিরও। তারকাস্বত্বার দেয়াল ভেঙে নিজেই বলে উঠলেন, ‘মাঝে মাঝে ভাবলে খুবই কষ্ট লাগে। শুধু ওয়ানডের কথাই ধরেন না; প্রায় ১০০ ওয়ানডে মিস করেছি। ১২৮ ওয়ানডে খেলে আমার ১৬২ উইকেট এখন। আর একশ’ ওয়ানডে খেললে হয়তো আড়াইশ’ বা তিনশ’ উইকেটের মালিক থাকতাম। শুধু উইকেট সংখ্যার কারণেই লোকেরা গ্রেটদের সঙ্গে আমার নাম উচ্চারণ করত।’
একটু মাথাটা নিচু করে ফেললেন মাশরাফি। তাহলে কী ভেঙে পড়ছেন? প্রশ্নটা শুনেই আবার সেই চকচকে চোখ নিয়ে ফিরে তাকালেন, ‘কখনোই না। আমি এভাবে আসলে খুব একটা ভাবিই না। আমি বরং উল্টোটা বলি নিজেকে। এমনও হতে পারত, প্রথম ইনজুরির পরই আর ফিরতে পারিনি। তাহলে? তাহলে কয়টা উইকেট থাকত আমার? সে হিসেব করলে তো অনেক ভালো আছি, তাই না? এখনও তো লড়াইটা করার শক্তি আছে আমার।’
এই হল মাশরাফি বিন মুর্তজা। সামান্য একটু মন খারাপ করার মেঘকে যিনি এই মনের জোর দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারেন। হো হো করে হেসে বলতে পারেন, ‘সবচেয়ে বড় ব্যাপার কী জানেন, সেই অভিষেকের মতো থ্রিল টের পাই প্রতিবার ফেরার আগে। ক্রিকেট তো খুবই উপভোগ করি। আর এরকম ফেরার আগে আগে প্রতিবারই মনে হয়, কবে মাঠে নামবো? এটাই মনে হয় টিকিয়ে রেখেছে আমাকে। যতোদিন এই আগ্রহ আছে, ততোদিন আমিও আছি।’
আমরা প্রার্থনা করি, এই আগ্রহটা যেন অটুট হয়ে টিকে থাকে অনন্তকাল।