ওদের স্বপ্ন আলোকচিত্রে
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৩, ১৮:১৬
ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলোজির (আইইউটি) লাল বিল্ডিংগুলো যেন ইঞ্জিনিয়ার তৈরির কারখানা। বাংলাদেশে একই শিক্ষাবর্ষের সবগুলো প্রকৌশল বিদ্যালয়ের মধ্যে নাকি এখানের ছেলেরাই সবচেয়ে আগে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হয়। এখানে সবাই যখন ডিগ্রি নিয়ে ব্যস্ত, যোবায়ের হোসেন শুভ তখন ব্যস্ত এক নতুন স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্নমাখা চোখে ক্যামেরাবন্দী করতেন তিনি দারুণ সব দৃশ্য। একসময় জমানো টাকায় ক্যামেরা কিনে শুরু করলেন পুরোদস্তুর ছবি তোলার কাজ। সেই দলে যোগ দিলেন ইমরান শাহেদ, নাফিস ফুয়াদ শুভ আর রাফি। নিজের আলোকচিত্র দলটার নাম হয়ে গেল ড্রিম ওয়েভার। শুভ আর তার ড্রিম ওয়েভারের কথা লিখেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
আইইউটির বিভিন্ন প্রোগ্রাম, কনসার্টের ফটো তোলেন তিনি। বিভিন্ন প্রদর্শনীতে তার ছবি প্রদর্শিত হয়, প্রশংসা করে সবাই। পড়াশোনা, পরীক্ষা, ল্যাব আর অবিরাম স্বপ্ন বুনে দিন যেত তার। কিছু ফটোগ্রাফার বন্ধুও ছিল তার সাথে। একদিন মনে হলো তাদের এই গ্রুপের একটা নাম দরকার। অনেক ভেবে নাম দেওয়া হলো ‘ড্রিম উইভার’। দিন-রাত যারা স্বপ্ন বুনে চলেন তাদের জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত নাম আর কী হতে পারে? সেই থেকে শুরু শুভর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে এই ফটোগ্রাফিক যাত্রা।
একদিন এক বড় ভাইয়ের ফোন এল শুভর কাছে, ‘আমার বিয়ে। তোরা কি আমার বিয়ের ফটোগ্রাফির দায়িত্বটা নিবি?’ ওরা রাজি হয়ে যায়। এটা তাদের প্রথম ইভেন্ট। সবার মধ্যে উত্তেজনা, নিজেদের সবচেয়ে ভালোটা দিতে হবে। প্রথম ইভেন্টেই ড্রিম উইভারের ফটোগ্রাফি সবাইকে মুগ্ধ করে। সবার প্রশংসায় আর উত্সাহে কাজের প্রতি ওদের ভালোবাসাও বেড়ে যায়।
শুভর স্বপ্ন তিনি বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন ফটোগ্রাফার হবেন। ইভেন্ট ফটোগ্রাফি আর শৌখিনতা নয়, বরং এটা যে একটি প্রয়োজনীয় সেবা সেটাই সবাইকে বুঝিয়ে দেওয়া চাই। উপলব্ধি করলেন এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে চাই আরও ইভেন্ট, চাই আরও প্রচার। কিন্তু কিভাবে? তখনই শুরু হয়—ড্রিম ওয়েভার :অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ। ফেসবুক ড্রিম উইভারকে পৌঁছে দেয় শত শত মানুষের কাছে। তাদের ছবিগুলো সবাইকে এতটাই মুগ্ধ করে যে, অনেকেই নিজের ওয়ালে ড্রিম উইভারের ছবি শেয়ার করেন আর তা পৌঁছে যায় নতুন নতুন বন্ধুদের ওয়ালে। এভাবেই তাদের পরিচয়টা পৌঁছে গেল সবার কাছে।
সেই সময়টায় শুভর সাথে যোগ দিয়েছিলেন বিথী, আলিফা, অদ্রিকা আর রাইসা। বিথী আর আলিফা মেডিকেল শিক্ষার্থী, পড়ছেন যথাক্রমে বারডেম আর বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে। রাইসা আহসানুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে আর অদ্রিকা বিজিএমইএ-এর ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের শিক্ষার্থী। তাদের চেষ্টায় অল্প কয়েক দিনেই ড্রিম উইভার অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পাশাপাশি তাদের দলটিও বড় হতে লাগল। দলে যোগ দিলেন আনিক, রাফিউ, রাইসা, সায়ীদ, ইমতিয়াজ, এস এইচ শুভ। পহেলা বৈশাখে তাদের এক বছর পূর্তির আগেই পেইজে লাইক সংখ্যা পৌঁছে গেল এক লাখের ঘরে। এত দ্রুত বাংলাদেশের আর কোনো ফটোগ্রাফি পেইজ লাখের ঘরে পৌঁছাতে পারেনি। আর এখন দেড় লাখের উপর ফ্যানদের ভালোবাসা নিয়ে বাংলাদেশের সর্ববৃহত্ ফটোগ্রাফি গ্রুপ—ড্রিম উইভার।
এক বছরে ড্রিম উইভারের প্রাপ্তি কী জানতে চাইলে যোবায়ের হোসেন শুভ বলেন, ‘বিয়ের মতো পবিত্র এবং পারিবারিক একটি আয়োজনে বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে একদম অচেনা একটি পরিবার যখন ড্রিম উইভারকে তাদের পরিবারের অংশ করে নেন, তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আয়োজনটি ফ্রেমবন্দি করার সুযোগ দেন, সে অনুভূতি সত্যি অসাধারণ। এই পেশায় না এলে কখনোই এত মানুষের ভালোবাসা পেতাম না।’ পাঁচ শতাধিক ইভেন্ট কাভারের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রথম স্টোরি বেজড ওয়েডিং ভিডিওগ্রাফি তাদের তৈরি।
ড্রিম ওয়েভারের স্বপ্নদ্রষ্টা শুভ বলেন, ‘যেকোনো কাজই যদি মন দিয়ে, নিষ্ঠা ও সততার সাথে করা যায় সেখানে সাফল্য অবশ্যই আসবে। আর ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে নিতে চাইলে আমি মনে করি এখন সে সময় এসেছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে অবশ্যই একটি পেশাদারী মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রচুর পরিশ্রমের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। অন্য যেকোনো পেশার মতো এখানেও এগিয়ে যাওয়ার জন্য পড়াশোনা করতে হবে, স্বকীয়তা বজায় রাখতে হবে।’
ড্রিম উইভারকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন শুভ। বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে ফটোগ্রাফির মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরতে চান তিনি।