মারেতে মুগ্ধ ব্রিটেন
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০১৩, ২১:৪০
অ্যান্ডি মারে উইম্বলডনের সেন্টার কোর্টে নোভাক জকোভিচকে হারানোর পর একটি বাক্যেই পরিষ্কার করে দিলেন শিরোপাটির মূল্য তার কাছে কতটা। ব্রিটিশদের সুদীর্ঘ ৭৭ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কোর্টে দারুণ আগ্রাসী হয়ে খেলা এ তারকাটি আবেগময় কণ্ঠে বললেন, ‘উইম্বলডন জেতাটা হচ্ছে টেনিসের সর্বোচ্চ শিখরে পা রাখার মতো।’
নোভাক জোকোভিচকে ৬-৪, ৭-৫, ৬-৪ গেমে হারিয়ে একই সাথে ফ্রেড পেরির ভূতকে কাধ থেকে ঝেরে ফেললেন মারে। তিনি স্কটিশ নাকি ব্রিটিশ সেই প্রশ্ন ভুলে গিয়ে সমগ্র ব্রিটেন এখন আক্রান্ত মারে জ্বরে। দাবি উঠেছে মারেকে নাইটহুড দেয়া হোক।
দুর্দান্ত সব প্রত্যাবর্তনের জন্য জোকোভিচ সব সময়ই বিখ্যাত। তাই প্রথম দু’টি সেট জেতার পরেও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছিল না কিছু। কিন্তু এই দিনটি যে টেনিস বিধাতা মারের জন্যই লিখে রেখেছেন সেটা হয়তো জানতেন না এই সার্বিয় খেলোয়াড়। এ কারণেই দুই সেট জয়ের পর তৃতীয়টিতে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নিতে কোন সমস্যাই হয়নি স্বাগতিক খেলোয়াড়টির। জয় করায়াত্তের পর আবেগে মুখ ঢেকে ফেলেন তিনি। এরপরেই গ্যালারিতে ছুটে গেলেন কোচ টেনিস কিংবদন্তি ইভান লেন্ডল আর পরিবারের কাছে। উল্লাসে মাতলো গ্যালারি ভর্তি মানুষ। ডেভিড ক্যামেরন তার প্রধানমন্ত্রীর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে বাতাসে ছুঁড়লেন মুষ্টিবন্ধ হাত। মারের জয়কে সমগ্র ব্রিটেনের জন্য অভূতপূর্ব এক মুহূর্ত আখ্যায়িত করে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘(এই জয়) পুরো দেশকে অনুপ্রাণিত করবে।’ শুধু তাই নয় ক্যামেরন অ্যান্ডি মারেকে ‘স্যার অ্যান্ডি মারে’ হিসেবে ঘোষণা করার কথাও ভাবছেন। জাতীয় এই বীরকে নাইটহুড দেয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সম্মাননা জানানোর বিষয়টি আসলেই পুরোপুরিই ভিন্ন। তবে এই মুহূর্তে এটার জন্য (নাইটহুড) তার চেয়ে বেশী যোগ্য আর কাউকে আমি দেখছি না।’ মারে নাইটহুড পান কিনা সেটা ভবিষ্যত্ই বলে দেবে। তবে ব্রিটিশদের হূদয়ে যে তিনি বীরের আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন সে বিষয়ে সন্দেহ নেই মোটেই। সেন্টার কোর্টের টিকেট না পেয়ে সকাল থেকেই অল ইংল্যান্ড ক্লাবের বাইরে জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে ভীড় জমাতে থাকে হাজার হাজার মানুষ। সেই ১৯৩৬ সালে ফ্রেড পেরির পর প্রথম ব্রিটিশ পুরুষ হিসেবে উইম্বলডন শিরোপা জয়ের আনন্দে মারে যখন ভেঙ্গে পড়েন বাঁধ ভাঙ্গা কান্নায়, সেসময়ে পুরো দেশ আনন্দে উদ্বেল। মারের এই জয়কে ক্রীড়া জগতের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করে বিবিসিসহ অন্যান্য খ্যাতনামা ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলো। একই সাথে তাদের জিজ্ঞাস্য ব্রিটেনের ক্রীড়াঙ্গনে এটিই সবচেয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত কিনা। মারেকে নিয়ে তার দেশবাসীর উন্মাদনা দেখলে এ প্রশ্ন তোলা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। শিরোপার আনন্দ উদযাপন করতে গিয়ে এক মারে ভক্ত তার বন্ধুর প্রমোদতরী থেকে ঝাপ দেন সমুদ্রে! বেকায়দায় পড়ে আঘাত পান ডান কাধেও। তবে তাতে মোটেই দুঃখ নেই তার। মারের জয়গানে এখন ব্রিটিশরা এমনই বুদ হয়ে আছে! আর সমর্থকদের এমন পাগলাটে ভালবাসাই ফাইনালে তাকে এগিয়ে রাখবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন টেনিস কিংবদন্তি বরিস বেকার। এবার মারেও বললেন সেটাই।
সমর্থকদের আকুণ্ঠ সমর্থনকে কুর্নিশ করে মারে বলেন, ‘পুরো সপ্তাহ ধরেই আমি এটা বলে আসছি। এটা আসলেই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। আপনি যখন এভাবে সমর্থকদের ভালবাসা পাবেন তখন সেটা আসলেই আপনাকে এগিয়ে দেবে। এরকম কঠিন একটা ম্যাচের ক্ষেত্রে এটা দারুণ গুরুত্বপূর্ণ।’ মারে অবশ্য স্বীকার করেছেন সমর্থকদের এই ভালবাসাই কিছুটা হলেও চাপ হয়ে দেখা দিয়েছিল। শিরোপা জয়ের খুব কাছে চলে এসেছেন, এমন অনুভূতি শেষ দিকে তাকে কতটা ঘোরের মধ্যে নিয়ে গিয়েছিল জানিয়ে মারে বলেন, ‘প্রথম গেমগুলো ছিল ক্ষেপাটে। কিন্তু শেষ দিকেরগুলো খুব মানসিক চাপ সৃষ্টি করছিল। আর শেষ গেমটাকে আমি বলবো আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন গেম।’ মারের সেই ঘোর যে এখনো কাটেনি গতকাল সকালে তার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি নিজেই। আগের রাতের চ্যাম্পিয়নশিপ ভোজের পর পুরো রাতে ঘুমাতে পেরেছেন মাত্র এক ঘন্টা। সকাল বেলা চোখে ঘুম নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে মারে জানালেন না ঘুমানোর কারণটা। তিনি বলেন, ‘আমি ঠিক আছি কিন্তু দারুণ ক্লান্ত। কেউ হয়তো বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু গত রাতে আমরা কেউই ঘুমাতে পারিনি। আমাদের ভয় ছিল যদি ঘুম থেকে উঠে দেখি এগুলো (শিরোপা জয়) আসলে কিছুই ঘটেনি!’ গার্ডিয়ান/বিবিসিঅনলাইন