প্র জ ন্ম আ ই ক ন

স্বপ্ন ছুঁয়ে চলা

ব্যবসায়ী বাবার ছোট ছেলে ইফতি; ব্যবসাপাতির দিকে তার ঝোঁক থাকাটাই স্বাভাবিক। মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিকেও তাই ব্যবসায় শিক্ষা বেছে নিলেন। শেষটায় স্নাতকও করেন ব্যবসায় প্রশাসনে। পুরোদস্তুর ব্যবসায়িক জগতে থাকা এই মানুষটা কাজের জগতে এসে হয়ে গেলেন কর্পোরেট জগতের বাসিন্দা। প্রথমে দেশের শীর্ষস্থানীয় টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিতে যাত্রা শুরু করে অভিজ্ঞতার ঝুলিটা সমৃদ্ধ করে যোগ দেন নোকিয়ায়। বিশ্বের নেতৃস্থানীয় এই মোবাইল উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপালের ত্রিদেশীয় কার্যালয়ে প্রোডাক্ট ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তিনি। তিনি ইফতেখার হোসেন, তরুণ প্রজন্মের কাছে একজন আইকন। অল্প সময়েই সাফল্যের পথ ধরে সামনে এগিয়ে চলেছেন অবিরাম। তার সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র, ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু বাবার ব্যবসার সুবাদে সীমান্তবর্তী বেনাপোল শহরে তার জন্ম। খুব শৈশবেই তাই পরিচিতি হন কর্মব্যস্ততার সাথে। তখন থেকেই হয়তো সব কাজ সময়মতো করার শিক্ষাটা পেয়েছেন তিনি। এখনও তিনি যেকোনো কিছুতে সময়ানুবর্তিতার উপর জোর দেন সবচেয়ে বেশি। আর এই জন্য অবশ্য তার প্রথম চাকরিটাকেও বাহবা দিতে হবে। গ্রামীণফোনে কাস্টমার সার্ভিস অফিসার হিসেবে তার যাত্রা শুরু। আর সেটা যেহেতু সরাসরি গ্রাহকের সাথে সম্পৃক্ত ছিল; সুতরাং সিদ্ধান্ত গ্রহণটাও কার্যকর আর সময়মতো হতে হতো। এ ক্ষেত্রে বৃহত্ প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করার কিছু সুবিধা পাওয়াই যায়। ইফতেখার হোসেন গ্রামীণফোনে সেলসে যোগ দেন তারপর। সেলস টিমে কাজ করার জন্য কর্তৃপক্ষ বরাবরই প্রাধান্য দিয়ে থাকে দক্ষদেরকে। আর সেই সুবাদেই সেলসের নানা বিষয়ে ব্যবহারিক জ্ঞানটা পাকা হয় তার। ডেপুটি ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতিও পান তিনি অল্প সময়েই। এরপর নোকিয়াতে কাজের সুযোগটা আসে বছর চারেক আগে। ভেবে দেখলেন দুটিই টেলিকমিউনিকেশনের কাজ। দুটিই সরাসরি গ্রাহকের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় কাজের পরিসরটাও বেশ বিস্তৃত। এই ভাবনা থেকেই ২০০৯ সালে তিনি যোগ দেন নোকিয়াতে। আর কাজের শুরুতেই ভিন্ন এক পরিবেশ তাকে আকৃষ্ট করে, সেই সাথে তিনটা দেশ বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল একই সাথে নিয়ন্ত্রণ করার কারণে অল্প সময়েই ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিংয়ের মতো বিশাল ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ হয় তার। এতে তার কাজের দক্ষতাই আর অভিজ্ঞতা দুটোই সমৃদ্ধ হতে থাকে। আর এখন প্রতিযগিতামূলক মার্কেটে চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজটা দারুণ উপভোগও করেন তিনি। ইফতেখার হোসেনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বিশ্বের প্রথম সারির এই প্রতিষ্ঠানটার প্রোডাক্ট ম্যানেজার হিসেবে কী কী দায়িত্ব পালন করতে হয় তাকে। তিনি বলেন, ‘এই তিন দেশে কোনো নতুন পণ্যের প্রচার থেকে শুরু করে ডিজিটাল মার্কেটিং পুরোটাই তার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। উদাহরণ দিয়ে বলতে গেলে একটা নতুন ফোন বাজারে এলে সেটার চাহিদা, উপযোগিতা, লাইফসাইকেল ব্যবস্থাপনা সবটাই যাচাইবাছাই করা লাগে আগে। আমাদের দেশে কোন পণ্যটার বেশি চাহিদা, কোনটা কেমন হলে চাহিদা বাড়বে, এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো বাজারে প্রভাব ফেলে অনেক। একটা পর্যবেক্ষণই যেমন পূর্বাভাস দিতে পারে না, তাই সার্বিক বাজারে প্রোডাক্ট পর্যবেক্ষণটা আমাকেই করতে হয়।’ আরও জানালেন, নতুন নতুন সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার, আর মোবাইল অ্যাপসের সাথে সারাটা দিন কাটাতে কার না ভালো লাগে! তাই বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই কাটছে এই তরুণ কর্পোরেটের। ইফতেখার হোসেনের কাছে প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশের টেলিকম সেক্টর কতটা চ্যালেঞ্জিং, আর তরুণ প্রজন্মের কাজের ক্ষেত্রই বা কেমন? তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করলে আমাদের এখানে কাজের সুযোগ প্রচুর, শুধু সম্ভাবনাটাকে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে, সেগুলো কীভাবে টপকে যাওয়া যায়, সেই লক্ষ্যে একত্রে কাজ করে যেতে হবে।’ ইফতেখার হোসেন নতুন প্রজন্মকে নিয়ে খুবই আশাবাদী, তিনি বলেন, ‘এখন যারা কাজ করছে, তারা অনেক বেশি টেকনোলজি গ্রহণ করছে। এটা খুবই ভালো। কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে—সৃষ্টিশীলতা নিজ থেকে তৈরি করতে হবে এবং তথ্যপ্রযুক্তি তাকে সাপোর্ট দিবে। কিন্তু শুধু টেকনোলজির সুবিধা বেশি নিতে গিয়ে নিজের সৃষ্টিশীলতাকে নষ্ট করা যাবে না। তবে আমি যা দেখেছি নতুনরা খুবই বুদ্ধিমান। তারা ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদিকে ব্যবহার করে অনেক অ্যাডভান্স কাজ করে। যা যেকোনো পেশার জন্য খুবই কল্যাণকর। তবে এর পাশাপাশি দেখা যায় অনেকের জ্ঞান অর্জনে আগ্রহ কম। বরং এ বিষয়ে আগ্রহ বাড়িয়ে বেশি বেশি বই পড়তে হবে। ব্যবহারিক জ্ঞান আহরণ করে তা ব্যবসার কাজে লাগাতে হবে। নতুন যারা সংক্ষিপ্ত রাস্তা ধরে এই পেশায় সাফল্য অর্জন করতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথা বলব, জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই এবং অনেক পড়াশোনা ছাড়া কোনো পেশায় সফলতার কোনো সংক্ষিপ্ত রাস্তা নেই। যেহেতু এই প্রজন্ম আগামীতে এ দেশের নেতৃত্ব দেবে এবং একুশ শতকের চ্যালেঞ্জটা তাদেরই মোকাবিলা করতে হবে তাই তাদের প্রতি আমার পরামর্শ রইল, জ্ঞান অর্জন এবং টেকনোলজির সুবিধা গ্রহণ করে তাদের প্রকৃত সমন্বয় ঘটাতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে।’ নতুনদের টেলিকমিউনিকেশন পেশায় স্বাগত জানিয়ে ইফতেখার হোসেন বলেন, ‘তরুণদের কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে এখানে। তারা নিত্যনতুন ভাবনা নিয়ে এখানে কাজ করতে আসছেন। তারা প্রযুক্তিগত দিক থেকেও অনেক বেশি এগিয়ে। তারা পরিবর্তনশীল সবকিছুর প্রতি সচেতন থাকার চেষ্টা করে। এক কথায় নতুনদের জানার আগ্রহটা বেশি, অনুধাবন ক্ষমতাও ব্যাপক। আর ব্যবস্থাপনা পেশায় এ গুণগুলো খুব জরুরি।’ এ কথার সূত্র ধরে নতুনদের জন্য তার পরামর্শ জানতে চাইলে ইরফান বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বহির্বিশ্বের সবকিছুর সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতে হবে। সাফল্য সুনিশ্চিত করতে শুধু নিজের পেশাগত ক্ষেত্র বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেই নয়, দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত সব প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন সম্পর্কে সজাগ থাকতে হয়। আর তাহলেই নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়। সেই সৃজনশীলতাটুকু ব্যবস্থাপনা পেশায় খুব বেশি জরুরি। তাই বলা যায়, শুধু নিজেকে নিয়ে নয়, নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়ে নয়, ভাবতে হয় সামগ্রিকভাবে। তাহলেই নিজের কাজের ক্ষেত্রে সফলতা আসবে।’ ইফতেখার হোসেনের শৈশব কেটেছে যশোরের বেনাপোল আর পটুয়াখালীতে। এরপর ঢাকায় চলে আসেন। বাবাকে হারিয়েছেন অনেকটা সময় হলো। মা-ই তাদেরকে অপার স্নেহে লালন করেছেন। দুই ভাইয়ের মাঝে তিনি ছোট। বড় ভাই প্রবাসে। ঢাকায় বসুন্ধরায় স্ত্রী-সন্তান আর মা’কে নিয়ে তার আপন নিবাস। স্ত্রী রোখসানা পারভীন পেশায় একজন চিকিত্সক। একমাত্র কন্যা ইনাইয়া হোসেন তাদের কাছে এখন যেন কথা বলা পুতুল। অবসরটা কেটে যায় তিন বছরের মেয়ের সাথেই। শত ব্যস্ততায়ও একান্নবর্তী পরিবার ছাড়েননি তারা। এতেই যেন প্রমাণ হয়, কর্পোরেট দুনিয়া কেবলই যান্ত্রিক নয়, এখানেও রয়েছে সুখ-দুঃখের অন্য এক জীবন। ইফতেখার হোসেনের স্বপ্ন—নিজেকেই নিজে ছাপিয়ে যাওয়ার, অনেক বেশি জানার আর কর্পোরেট দুনিয়ায় নিজেকে যোগ্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার। তিনি এ দেশের টেলিকম খাতের বিকাশে অনন্য ভূমিকা রেখে যাবেন, তার জন্য সেই শুভকামনা। ইফতেখার হোসেন ডাকনাম :ইফতি জন্মতারিখ ও স্থান :২৭ ডিসেম্বর, যশোর মায়ের নাম :হাফিজা আরা বাবার নাম :ফরহাদ হোসেন প্রথম স্কুল :সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডাড়ি স্কুল প্রিয় উক্তি :always put yourself in the other’s shoes. If you feel that it hurts you, it probably hurts the person too প্রিয় মানুষ :আমার মা প্রিয় পোশাক :জিন্স, টিশার্ট সাফল্যের সংজ্ঞা :পরিশ্রম, জ্ঞান আর সৃজনশীলতা অবসর কাটে যেভাবে :পরিবারের সাথে, মুভি দেখে