আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বা মার্কার প্রভাব কতটুকু, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ২০-৩০ বছর আগে জাতীয় নির্বাচনে মার্কা সাধারণ মানুষের মনে যথেষ্ট আবেগ সৃষ্টি করতে পারত। প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতার চেয়েও মার্কার প্রতি মানুষের একটা অন্যরকম আগ্রহ ছিল। এছাড়া দলীয় কর্মকাণ্ড, দলীয় আদর্শ বা প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগও ছিল কম। বর্তমানে শুধু দলীয় মার্কা সাধারণ মানুষের মনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে হয় না। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক প্রসারে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষও এখন অনেক বেশি রাজনীতি সচেতন। তারা বিভিন্ন দলের নীতি-আদর্শ, কর্মকাণ্ড ও প্রার্থীর যোগ্যতা সম্পর্কে অনেক বেশি জানার সুযোগ পাচ্ছে। দলীয় মার্কা বা জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের আকৃষ্ট করা গেলেও সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়। কাজেই প্রতিটি দলের কর্মকাণ্ড, বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যত্ কর্মসূচি এবং প্রার্থীর যোগ্যতাকে বিবেচনায় নিয়েই মানুষ ভোট দেবে।
বর্তমানে দেশে দুটি প্রধান দলের নেতৃত্বে দুটি প্রধান জোট গঠনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিও প্রধান দুটি ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে কোন জোট কার নেতৃত্বে সরকার গঠন করবে, কার নেতৃত্ব দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে, কার নেতৃত্বে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অর্থাত্ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, কার নেতৃত্বে দেশে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের অপতত্পরতা নিয়ন্ত্রণে থাকবে ইত্যাদি বিষয় মানুষ অবশ্যই বিবেচনা করবে। এছাড়া দেশের চলমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাও তাদের মনে প্রভাব ফেলবে।
সম্প্রতি আমাদের দেশের অনেক রাজনীতিককেই দেখা যাচ্ছে, নিজেদের দলীয় আদর্শ ও মার্কা ত্যাগ করে কোনো বড় দল বা জোটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছেন শুধু ঐ দলের মার্কা ব্যবহার করে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য। তাঁরা ভাবছেন, নিজেদের যোগ্যতা বা জনসমর্থন যথেষ্ট না থাকলেও শুধু মার্কা পেলেই নির্বাচনে জয়ী হতে পারবেন। বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দলীয় মার্কা ব্যবহার করা হচ্ছে। গত কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ মার্কার পরিবর্তে যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দিয়েছে। নীতি-আদর্শহীন রাজনীতিকদের মনে রাখতে হবে, ময়ূরের পুচ্ছ পরলেও কাক ময়ূর হয়ে যায় না। অর্থাত্ যার চেহারা যেমন আছে তেমনই থাকবে।
সবসময়ই বলা হয়ে থাকে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। অর্থাত্ একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে যে কোনো সময় প্রত্যাশিত বা অপ্রত্যাশিত যে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত যেমন আসতে পারে, ঠিক একইভাবে যে কোনো নেতা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবেই দল পরিবর্তনও করতে পারেন। এজন্যই রাজনীতিতে দল বদল ও পদ বদলসহ অনেক রকমের রদ-বদল ঘটে। এভাবেই শত্রু বদলায়, মিত্রও বদলায় কিন্তু দল ও নেতার নীতি-আদর্শ বদলে গেলে আর তাকে রাজনীতি বলা যায় না। নীতি ও আদর্শহীন রাজনীতিই অপরাজনীতি আর যারা এই অপরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তারা অপরাজনীতিক। অপরাজনীতিক ও অপরাজনীতি উভয়ই বিপজ্জনক। এছাড়া স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি, খুনি ও দুর্নীতিবাজরা যতদিন রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকবে, ততদিন দেশে অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আশা করা যায় না। আগে নিজেকে বদলাতে হবে এবং রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তাহলেই দেশে অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
ফরিদপুর