দুশ্চিন্তার নাম মাশরাফি

ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে একটু সময় মাঠের দিকে চেয়ে রইলেন। মাঠে তখন ব্যাট-বলের প্রবল লড়াই চলছে। সে লড়াইয়ে নেই তিনি। মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে হেঁটে চললেন অ্যাকাডেমি মাঠের দিকে; ফিটনেস বাড়ানোর অনুশীলন করবেন। এই হেঁটে যাওয়ার পথেই গ্যালারি থেকে তার উদ্দেশে একটা চিত্কার উড়ে এলো—মাশরাফি ভাই, আপনি কবে খেলবেন? এটা এখন পুরো ক্রিকেটাঙ্গনের প্রশ্ন—কবে আবার ম্যাচ খেলবেন মাশরাফি বিন মুর্তজা! গত প্রায় ছয় মাস ধরে এই একটা প্রশ্ন অস্থির করে রেখেছে জাতীয় দলের নির্বাচকদেরও। প্রধান নির্বাচক আকরাম খান পরিষ্কার করেই কাল নিজের বিস্ময়ের কথা জানালেন। বললেন, ‘মে মাসেই যে মাশরাফির মাঠে ফেরার সম্ভাবনা ছিল এখনো কেন তার ম্যাচ ফিটনেস ফিরছে না?’ ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করে করে মাঠে ফেরাটা এখন মাশরাফির অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু এবার সেই ফেরাটা যেন একটু বেশিই বিলম্বিত হয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ এশিয়া কাপ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজে খেলেছিলেন বাংলাদেশ দলের হয়ে। তারপর বিপিএল খেলতে গিয়ে আবার ইনজুরিতে পড়েন। সেই থেকে মাশরাফির ফেরার অপেক্ষায় আছে ক্রিকেট সমর্থকরা। আর তার ফেরার অপেক্ষায় এখন অনেকটা মরিয়াই হয়ে গেছেন নির্বাচকরা। মে মাসে জিম্বাবুয়ে সফরেই মাশরাফিকে দলে চেয়েছিলেন নির্বাচক কমিটি। সেবার না পারলেও আসছে নিউজিল্যান্ড সিরিজে তাকে অবশ্যই মাঠে চান তারা। আর সে জন্যই ম্যাচ অনুশীলন করাতে অন্তত মাশরাফিকে ইংল্যান্ডে ‘এ’ দলের সঙ্গে পাঠাতে চায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। আর এখানেই তৈরি হয়েছে প্রশ্নটা, মাশরাফি কী আদৌ ইংল্যান্ড যেতে পারবেন? মাশরাফি বলছেন, তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত এই সফরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মাশরাফি মনে করছেন, সেটা একটু ঝুঁকি হয়ে যায়। ক্যারিয়ারের এই প্রান্তে এসে আর ঝুঁকি নিতে মন সায় দেয় না দেশের অন্যতম সেরা এই পেসারের, ‘আকরাম ভাই আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমাকে বললে আমি খেলার জন্য তৈরি আছি। ইংল্যান্ডে খেলতে পারলে তো সেটা আমার জন্যই ভালো। কিন্তু আমি এখনো ফুল রান আপে বল করতে শুরু করিনি। আমার হাঁটুরও একটা ব্যাপার আছে। তারপরও আমি চেষ্টা করছি। তবে সেই সঙ্গে আমার চিন্তা করতে হবে যে, আমি এমন একটা সময়ে আছি যে এখন আর কোনো ইনজুরিতে পড়লে আর ক্রিকেটে ফিরে আসাটা আমার জন্য খুব ডিফিকাল্ট হবে।’ অনেকেই বলছেন, মাশরাফির মনে এখন এই ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়টা ঢুকে যাওয়াটাই তার মাঠে ফেরা পিছিয়ে দিচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাইলেন না চিকিত্সক বা নির্বাচকরা। তবে নির্বাচকরা মাশরাফির ইংল্যান্ডে যাওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন। আকরাম খান বললেন, ‘মাশরাফি যে অটোমেটিক চয়েস, সে ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ নেই। কিন্তু যে কাউকে একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে হলে ন্যূনতম ম্যাচ প্র্যাকটিস করে নেয়া জরুরি। ফলে আমরা চিকিত্সককে বলেছি, ইংল্যান্ডে ‘এ’ দলের ২২, ২৪ ও ২৬ তারিখের তিনটি ম্যাচ যেন অন্তত সে খেলতে পারে, তার ব্যবস্থা যেন করা হয়।’ এই সময় মাশরাফির মাঠে ফেরাটা অযৌক্তিক বলেও মনে করছেন না আকরাম। কারণ চিকিত্সকই বলেছিলেন, ২৯ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া প্রিমিয়ার লিগে খেলতে পারবে সে। সেক্ষেত্রে ৭ দিন আগে ইংল্যান্ডে খেলাটা অসম্ভব মনে করেন না প্রধান নির্বাচক। সেই সঙ্গে জিম্বাবুয়ে সফরের সময় থেকে এতো সময় পার করেও ম্যাচ ফিটনেস ফিরে না পাওয়া নিয়েও আছে বিস্ময়। তবে এই বিস্ময়ের জবাব নিজের মতো করে দিলেন মাশরাফি, ‘আসলে জিম্বাবুয়ে যেহেতু যেতে পারলাম না, তখন আমি পুরোপুরি বিশ্রামে চলে গিয়েছিলাম। সে সময়টাতেও আমার অনেক ব্যথা ছিল। তখন খেললে ব্যথা সহ্য করেই খেলতে হত। তাই দেড় দুই মাস ফুল রেস্টে ছিলাম। এরপর ব্যথা কমল। কিন্তু ফিটনেসটা ওই রেস্টের ফলে আবার খারাপ হল।’ ফলে মাশরাফিকে এখন তিনটি লড়াই লড়তে হচ্ছে ফেরার আগে। প্রথমত সেই ফিটনেস লেভেল ফিরে পাওয়া, দ্বিতীয়ত ল্যান্ডিংয়ের সময় গোড়ালির ব্যথাটা কমানো এবং সর্বোপরি সবসময়ের সঙ্গী হাঁটুর ইনজুরিটার দেখভাল করা। এতোকিছু করেও মাশরাফি আবার ফিরতে পারবেন কি না, সে নিয়ে অনেকে হয়তো সন্দিহান থাকতে পারেন। কিন্তু মাশরাফির কোনো সন্দেহ নেই। একটু সতর্কতার সঙ্গে এগোতে চান; তবে সেই সতর্কতার মধ্যেও টেস্ট খেলার পরিকল্পনা ঠিকই আটছেন মাশরাফি, ‘টেস্ট খেলার চিন্তা আমার এখনো আছে। আমার চিন্তা হল আগামী জাতীয় লিগে যদি পারফরম করতে পারি তাহলে নির্বাচকরা হয়তো বিবেচনা করবেন। হুট করে চাইলে তো আর আমাকে টেস্ট খেলাতে পারবে না। আমাকে আসলে প্রমাণ করতে হবে যে, আমি ১৫ ওভার ২০ ওভার বল করতে পারছি।’ সেটাই মাশরাফির কাছ থেকে চায় ক্রিকেট।