বড় ইনিংসের সন্ধানে
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৩, ২১:৩৬
ছুটির দিনগুলোতে মিরপুর স্টেডিয়াম এক রহস্যপুরীতে পরিণত হয়। জনশূন্য, নীরব বিশাল স্টেডিয়ামে ঢুকলে বুকটা হঠাত্ ধক করে ওঠে। এর মাঝেও যদি একটু উদ্যম নিয়ে খুঁজতে শুরু করেন কোথাও না কোথাও দুই একজন ক্রিকেটার পেয়ে যাবেন। কোনোদিন তামিম ইকবাল, কোনোদিন ইলিয়াস সানি, কোনোদিন মাশরাফিকে পেয়ে যাবেন একাকী অনুশীলনে।
তবে আর কাউকে খুঁজে পান আর নাই পান ছুটির দিন, বৃষ্টির দিন, হরতালের দিনও একজন খেলোয়াড়কে পাওয়া নিশ্চিত—জহুরুল ইসলাম অমি। কেউ না এলেও অ্যাকাডেমি বা ইনডোরের কোনো এক নির্জন নেটে একাকী একটার পর একটা শট করে চলেন জাতীয় দলের এই ওপেনার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাটিং করে মাথা নাড়তে নাড়তে মাঠ ছাড়েন—যেন কিছুতেই সন্তুষ্ট না।
কেন? কেন এই অসন্তুষ্টি?
অমি মাথা নাড়তে নাড়তেই বলেন, ‘আমি যা চাচ্ছি, তা ঠিক হচ্ছে না। আমার পারফরমেন্সে আমি সন্তুষ্ট নই। আমার কোনোকিছুই নিজের ভালো লাগে না। নেটে ব্যাটিংটা ঠিকঠাক করে নিতে চাচ্ছি। কিন্তু সবকিছু ঠিকঠাক হলে তো নেটে আমি বুঝতে পারবো। সেটাই করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
অথচ অমির ক্যারিয়ার ঘুটে দেখলে অসন্তুষ্ট হওয়ার মতো কিছু খুঁজে পাওয়াই কষ্ট হবে।
এমনিতেই বাংলাদেশের ক্রিকেট অং্গনের অতিশয় বিনয়ী, ভদ্র ছেলে হিসেবে জহুরুল ইসলাম অমির আলাদা একটা পরিচিতি আছে। রাজশাহীর ছেলে অমি ২০০২-০৩ মৌসুমে প্রথম শ্রেণীর ক্যারিয়ার শুরু করেছেন। তারপর থেকে এই ক’বছর ধরে যেভাবে পারফরম্যান্স করে এসেছেন, তাতে অমির পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ কখনোই হয়নি। মূলত ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠা তার। কিন্তু প্রয়োজন পড়লে দিব্যি অফস্পিন বল করতে পারেন। আবার উইকেটরক্ষক হিসেবে তো প্রায় নিয়মিতই দস্তানা হাতে দাঁড়িয়ে পড়েন উইকেটের পেছনে।
আসল পরিচয় যে ব্যাটসম্যান হিসেবে, সেখানে প্রথম শ্রেণীর রেকর্ডটাও বলার মতো। ৯০টি ম্যাচে ৩৬.৩৪ গড়ে ৫৪৫২ রান তার; এই রান সংগ্রহ করার পথে ৩১টি ফিফটি আর ১০টি সেঞ্চুরি আছে।
এই রেকর্ডের পরেও কেন ‘অসন্তুষ্ট’ অমি?
কারণ, এই প্রথম শ্রেণীর পারফরম্যান্সটাই তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে করতে পারছেন না। বার বার পেছন ফিরে দেখেন আর নিজের আন্তর্জাতিক রেকর্ড দেখে যেন আরও অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন অমি, ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে, বিশেষ করে টেস্টে আমার একটাও ফিফটি নেই। অথচ টেস্ট ওয়ানডে মিলিয়ে অনেকবার চল্লিশের ঘরে আউট হয়েছি। এটা তো খুব খারাপ। এর মধ্যে চার-পাঁচটা ফিফটি হলেও অন্যরকম হত ব্যাপারটা। আমি জাতীয় লিগে রান করতে পারছি, ঘরোয়া ক্রিকেটে পারছি; তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কেন পারব না? আমি চল্লিশ রান যাদের বিপক্ষে করছি, তাদের বোলারদের তো একশ’র মতো বলও খেলছি; তাহলে আরও বড় ইনিংস কেন খেলতে পারছি না?’
এই প্রশ্ন; এই প্রশ্নই আসলে অমিকে এখন ভাবাচ্ছে। ২০১০ সালে শুরু হওয়া ৭ টেস্ট ও ১৪ ওয়ানডের ক্যারিয়ারে একটি ওয়ানডে ফিফটি আছে; বিপরীতে ৮ বার আউট হয়েছেন তিনি চল্লিশের ঘরে। আর এই চল্লিশের গেরো নিয়েই খুব বিরক্ত মনে হল অমিকে, ‘আমি এমনিতে ফিফটিকে তেমন কোনো ল্যান্ডমার্ক মনে করি না। জাতীয় লিগে তো স্টার্টটা পেলে ভাবি দেড়শ’ রানের ইনিংস খেলতে হবে। আর ইন্টারন্যাশনালে সম্ভবত অবচেতন মনেই এটা ঢুকে গেছে যে, ফিফটিটা হলে রিল্যাক্স হয়ে খেলতে পারবো। তাই ওই সময় কেমন একটা শট করে আউট হয়ে যাচ্ছি।’
নিজেই বোঝেন এভাবে বেশি বেশি ভাবা মানে নিজের ওপর আরও চাপ তৈরি করে ফেলা। নিজেকেও আরও কঠিন অবস্থায় ঠেলে দেয়া। তারপরও অমি একটা বড় ইনিংসের জেদেই আছেন এখন, ‘আমি বুঝি, এ নিয়ে বেশি ভাবলে সেটাই আবার চাপ হয়ে যায়। তারপরও বড় একটা ইনিংস খেলতেই হবে। আমার আর একজন তারকার মধ্যে পার্থক্যই হল একটা বড় ইনিংস। আমারই যদি নামের পাশে বড় একটা ইনিংস থাকে, সব বদলে যাবে। জাতীয় লিগে খেলতে গেলে যেমন আগের বড় বড় ইনিংসগুলোর কথা ভেবে আরো ভালো খেলার অনুপ্রেরণা পাই। টেস্টে, ওয়ানডেতেও এরকম দরকার। একটা ইনিংস। যে ইনিংস আমার ভবিষ্যত্ বদলে দিতে পারে।’
বয়স মাত্র ২৬; আক্ষরিক অর্থে কৈশোর পার করেছেন কিছুদিন আগে। ফলে অমি এমন ইনিংস যে ঢের উপহার দিতে পারবেন, তাতে সন্দেহ থাকার কথা নয়।