[ আ লো ক পা ত ]
আইন প্রণেতার দুর্বৃত্তপনা ও দলের ভূমিকা
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০১৩, ২১:২১
আওয়ামী লীগ দলটি ক্ষমতা গ্রহণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত হামলা-মামলা, হত্যা-গুম, নির্যাতন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতিতে সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছে। মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে মুখে সফলতার দাবি করলেও বাস্তবে জনগণ তার প্রমাণ দিয়েছে চার সিটিতে। দেশবাসী বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছে এরকম লুটেরা দলটি ক্ষমতায় থাকলে দেশের বারোটা বেজে যাবে। একদিকে তাদের ছাত্রলীগের তান্ডবে এমনিতেই সবাই অতিষ্ঠ, অন্যদিকে শেয়ার বাজার, ব্যাংক কেলেংকারি, হলমার্ক ইত্যাদিতে এই দলের নেতারা দেশকে লাটে তুলেছে। যার ফলে চার সিটিতে জনগণ হলুদ কার্ড দেখিয়ে সতর্ক করলেও আমলে নিচ্ছে না এই দলের এমপি-মন্ত্রীরা। তার প্রমাণ রেখেছেন দলের কীর্তিমান সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি। শুরুতেই পাঠকদের বলে রাখা ভালো যে, ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই আওয়ামী লীগ সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। যেগুলো নিয়ে আসতে পারেনি সেগুলো বন্ধ করার পায়তারাও করেছিল। নিজ মতাদর্শের না হওয়ায় সম্পাদকদের কারাগারে রেখে নির্যাতন করছে। কিন্তু সাংবাদিকদের উপর হিংস্র হামলা, মামলা, হত্যা, নির্যাতন এটা কোনো নতুন ঘটনা নয়। তার ধারাবাহিতকতায় ক্ষমতাসীন দলের কীর্তিমান সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনিও ব্যতিক্রম নন। তিনি শুধু একজন জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিই নন, বরং আরও একটি বড় পরিচয় হলো টক শোর নীতিবাগীশ বক্তা। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের দুই সাংবাদিকের উপর এ ধরনের হিংস্র হামলা একজন সংসদ সদস্যের পদকে কলঙ্কিত করেছে। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই কিছু সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্বেষী লোক দেশের ক্ষতি করে। সরকারের সাড়ে চার বছরে জনগণ এতটাই বিব্রত সেটা গ্রামাঞ্চলে না গেলে বুঝা যাবে না। এই দলটি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তার বিপরীতে এখন জনগণ বলছে ভিক্ষা চাই না কুত্তা সামলাও। বর্তমানে এই সরকারের দেশ ও দেশের বাইরে যেভাবে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে এর জন্য এ ধরনের সাংবাদিক পেটানো এমপিরাও কম দায়ী নন। তারা যে জনগণকে সুশাসন দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের দলের রাজকীয় মন্ত্রী-এমপিদের কথা শুনলে বুঝতে কারোর বাকি থাকার কথা নয়। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবার পর তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ী্ত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দোষীদের গ্রেফতার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা তো দূরের কথা, দেড় বছর অতিবাহিত হলেও খুনিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। কখনো তারা আইনের আওতায় আসবে কিনা তা নিয়ে সকলের সন্দেহ রয়েছে। আর সামান্য এই ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের দুই সাংবাদিকের উপর হামলার বিচার হবে কি না তা দলের অতীত কর্মকাণ্ড বলে দিচ্ছে। সামান্য বললাম এজন্য যে, যেখানে হত্যাকাণ্ডের বিচার হয় না, সেখানে এই নিরীহ দুই সংবাদকর্মীর বিচার কি আদৌ হবে? সংবাদ সংগ্রহ করতে আসা এই দুই সংবাদকর্মীকে বেধড়ক পেটানোর খবর পেয়ে যখন অন্য সাংবাদিক ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ততক্ষণে সেই লোক আবার নিপাট ভদ্রলোক। সেখানে পুলিশ কিছু করেনি। কারণ করবে কিভাবে? ভদ্রলোকটি যে একজন আইন প্রণেতা। আইন কার হাতে থাকবে না থাকবে সেটা আইন-শৃংখলা বাহিনী নিশ্চয়ই একজন আইন প্রণেতাকে শেখাতে পারে না। ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ হিসেবে সাংবাদিকদের উপর তিনি যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তা গুণ্ডামি-দুর্বৃত্তপনা ছাড়া কিছুই নয়। তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগের মামলা হবার পরও সঙ্গে সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরে অবশ্যই তিনি জামিন নিয়েছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দুই সাংবাদিককে তিনি সদলবলে নির্মমভাবে প্রহার করেছেন তা ভদ্র মানুষের কর্মকাণ্ড হতে পারে না। তবে গোলাম মাওলা নিজে সাংবাদিকদের প্রহার করেননি বলে দাবি করেছেন। কিন্তু ঘটনাটি তার অফিসের সামনে ঘটেছে—এমন কথা বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং ভাঙা ক্যামেরা মেরামত ও আহত সাংবাদিকদের চিকিত্সার যাবতীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন। দেশের জনগণ মনে করে, এ ধরনের একজন আইন প্রণেতা হয়ে দৃর্বৃত্তপনা করে তিনি জাতীয় সংসদেরও অবমাননা করেছেন। এই অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া একান্ত জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে আর কারোর দ্বারা এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আর তার সম্পর্কে দলকেও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। দলে এরকম এমপি-মন্ত্রীদের স্থান দেয়ার অর্থ হচ্ছে দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ে পদক্ষেপ গ্রহণের পরিবর্তে তা আরও ছড়িয়ে পড়ায় সহায়তা করা। এ ধরনের ঘটনায় কি বিচার হয়, তা দেশের জনগণ আবারও দলের ভূমিকা দেখার আশায় রইলো।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়