রাজনৈতিক সমঝোতাই বাঁচাতে পারে বিপদাপন্ন দেশকে

জাতীয় নির্বাচনের সময় কেবলই ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু সাধারণ জনগণ এখনো এক মহারহস্যের মাঝেই আছে নির্বাচন প্রশ্নে। নির্বাচন কী সব দলের অংশগ্রহণে হবে, নাকি আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্ররাই করবে, নাকি তৃতীয় পক্ষের আবির্ভাব ঘটবে এ নিয়ে এখন চারিদিকে নিরন্তর প্রশ্ন। সংশয়েরও কোনো শেষ নেই। নানা মুখে নানান কথাও শোনা যাচ্ছে। দেশের সার্বিক রাজনীতি এখন এক মহাজটিল সমীকরণের মধ্যে আবর্তিত। এককথায় গোলকধাঁধাময় বললেও ভুল হবে না। আর এ কারণেই রাজনীতির গতিপথ এবং ঈদ পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে কমবেশি সবাই এখন চিন্তিত। রাজনীতি যেভাবে এবং যে পথে এগুচ্ছে তাতে করে কোনো শুভ সংবাদের দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। বরং পরিস্থিতি কেবল জটিল থেকে জটিলতরই হচ্ছে। এই জটিল অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা এখন চারিদিকে। জনমনে তৈরি হচ্ছে নানা আশংকা। বুঝা যাচ্ছে ঈদের পর রাজনীতির মাঠ আরো উত্তপ্ত এবং সংঘাতময় হয়ে উঠবে। এক নিঃশ্বাসে বলা যায়, যদি প্রধান দুই দলের মাঝে কোনো সমঝোতার পথ তৈরি না হয়, যদি দুই দলই তাদের নিজ নিজ সিদ্ধান্তে অনঢ় অবস্থানে থাকে তাহলে সত্যি সত্যিই দ্রুতই দেশ এক ধ্বংসাত্মক অবস্থায় পতিত হবে। অনুমিত হয় প্রতিহিংসার অনলে পুড়ে ছাই হবে সারাদেশ। জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রক্তাক্ত হবে রাজপথ। বহু মায়ের কোল খালি হবে। সবমিলিয়ে এক দুর্বিষহ বিপদাপন্ন অবস্থার মুখোমুখি হবে দেশবাসী। বর্তমান অবস্থায় রাজনীতিতে যে জটিল রূপ ধারণ করেছে তার প্রাসঙ্গিক ইস্যুটি জাতীয় নির্বাচন। রাজনীতিতে এখন মূল আলোচ্য বিষয় এটিই অর্থাত্ ক্ষমতার পালাবদল কীভাবে বা কী প্রক্রিয়ায় হবে সেটাই এখন প্রধানতম বিষয়। বলা প্রয়োজন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরেই এখন রাজ্যের জট তৈরি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে এখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবং প্রধান বিরোধীদল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। অনেক কথা চালাচালি হলেও এ বিষয়টি নিয়ে এখনো দুই দলের মাঝে কোনো ধরনের একমত্য গড়ে ওঠেনি। দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি বারবার বলেছে কোনো অবস্থাতেই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া কোনো দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বলছে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে—এর বাইরে অন্যকিছু ভাবার অবকাশ নেই। কয়েকদিন আগে বিএনপির পক্ষ থেকে সরাসরি রাজনৈতিক সমঝোতার কথা উল্লেখ করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। ২০ জুলাই শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে বিএনপির সংসদীয় দলের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘পাঁচ সিটিতে হারার পর সরকারের সামনে এখন দুটি পথ খোলা—একটি সমঝোতা এবং অন্যটি সংঘাত। আমরা মনে করি সংকট নিরসনে সমঝোতাই একমাত্র পথ। সমঝোতার পথে না এসে সংঘাতের পথে গেলে সরকারের জন্য সেটা করুণ পরিণতি হবে। মওদুদ আহমেদ আরো বলেন, সংসদ ভেঙে দেয়ার আগেই একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এদিকে মওদুদ আহমদের বক্তব্যের একদিন পরই খালেদা জিয়া মিত্রদের ইফতার মাহফিলে যোগ দিয়ে এমনটিই ঘোষণা দেন। সর্বশেষ ২১ জুলাই এলডিপির ইফতার মাহফিলে যোগ দিয়ে তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘অবিলম্বে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসুন।’ একই সাথে এও বলেন, ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের বাইরে অন্য কারো অধীনে নির্বাচন হবে না, হতে দেয়া হবে না।’ এর আগেও আমরা দেখেছি খালেদা জিয়া অনেকবারই কোনো শর্ত ছাড়াই আলোচনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এইতো কিছুদিন আগে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব বাংলাদেশে এলে তার সাথে সাক্ষাত্কারেও খালেদা জিয়া বলেছিলেন চলমান সংকট নিরসনে তার কোনো আপত্তি নেই। সে সময় তিনি বলেছিলেন, সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার কারণেই যত সংকট সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা হলেই কেবল এই সমস্যার সমাধান হবে। যে কেউ হয়তো স্বীকার করতে বাধ্য হবেন রাজনীতির বাতাস এখন মোটেও সরকারি দলের পক্ষে নেয়। পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে এর যথার্থ প্রমাণ মিলেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাই বলেছেন জনমত একেবারেই সরকারের বিপক্ষে এবং এ কারণেই সরকারি দলের সমর্থনপুষ্ট নেতাদের কেউ কেউ এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করলেও সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ব্যাপক ভরাডুবি হয়েছে। ভোট বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো সিটিতেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারেননি। সর্বশেষ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্ররা সর্বশক্তি প্রয়োগ করলেও আজমত আলী খানের মতো বহুল পরিচিত নেতা লক্ষ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। হারের চুলচেরা বিশ্লেষণ আওয়ামী লীগ কীভাবে করেছে জানি না, তবে জনমত যে সম্পূর্ণ আওয়ামী শিবিরের বিপক্ষে তা বলাইবাহুল্য। ঠিক এমনটিই কিন্তু ঘটেছিল পশ্চিমবঙ্গেও। মমতা ক্ষমতায় আসার আগে প্রায় সমস্ত পৌর এলাকাতে জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। সর্বশেষ মমতার জয় জয়কারের মধ্য দিয়ে বামফ্রন্টের লালদুর্গের পতন ঘটেছিল। পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের এখানেও সেই লক্ষণ স্পষ্টত ফুটে উঠেছে। ক্ষমতাসীন দলও সেটা বুঝতে পেরেছে বলেই মনে হচ্ছে। আগেই বলেছি জাতীয় নির্বাচনের সময় কেবলই ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু সাধারণ জনগণ এখনো এক মহারহস্যের মাঝেই আছে নির্বাচন প্রশ্নে। নির্বাচন কী সব দলের অংশগ্রহণে হবে, নাকি আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্ররাই করবে, নাকি তৃতীয় পক্ষের আবির্ভাব ঘটবে এ নিয়ে এখন চারিদিকে নিরন্তর প্রশ্ন। সংশয়েরও কোনো শেষ নেই। নানা মুখে নানান কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে এখন রাজনীতি যেভাবে এগুচ্ছে বা রাজনীতির যে হালহকিকত তাতে করে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর এককথায় নেই। এই প্রশ্নের উত্তর দেয়াটাও ভীষণ রকম দুরূহ। আপাতত সেরকম কোনো ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে না যে আসলেই বর্তমান পরিস্থিতির সমাপ্তি কীভাবে ঘটবে। এদিকে দুই নেত্রী ইতিমধ্যেই নির্বাচনী প্রস্তুতি নেয়ার জন্যও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতি অনুরোধও জানিয়ে যাচ্ছেন। তবে এই প্রক্রিয়ায় অবশ্য বিএনপি আওয়ামী লীগের চেয়ে একধাপ এগিয়ে আছে। বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে জয়লাভের পর বিএনপি অনেকটাই সুসংহত ও ভালো অবস্থানে রয়েছে। সেই তুলনায় আওয়ামী লীগ এখন গোছানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সিটি কর্পোরেশনগুলোতে একের পর এক পরাজয়ের পর দলের নেতাকর্মীদের মাঝে চরম এক হতাশা অবস্থা বিরাজ করছে। রমজানের পর রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হবে বলে অনেকেই আশাবাদী। সমঝোতার পথও উন্মুক্ত হবে এমনটি ভাবছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। এদিকে প্রকাশ্যে না বললেও দুই দল যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সমঝোতা কামনা করেন সেটি অসত্য নয়। তার প্রমাণ পাওয়া যায় সম্প্রতি লন্ডনে অনুষ্ঠিত ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানদের উদ্যোগে আয়োজিত বাংলাদেশের মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র বিষয়ক এক সেমিনারে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কতিপয় নেতার অংশগ্রহণ। ১৭ জুলাই হাউস অফ লর্ডসের একটি কক্ষে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক সর্বদলীয় কমিটির চেয়ারম্যান লর্ড অ্যাভবেরি। আওয়ামী লীগের পক্ষে এই সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমান; অন্যদিকে বিএনপির পক্ষে অংশ নেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, শমসের মবিন চৌধুরীসহ শীর্ষ এবং নতুন প্রজন্মের কতিপয় নেতা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই এই প্রশ্নও তুলেছেন যে, দুই দলের নেতারা যদি দেশের বাইরে আলোচনায় এক টেবিলে বসতে পারেন তাহলে দেশে বসতে অসুবিধা কোথায়? দুইদলের শীর্ষ নেতারা দেশে বসেইতো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে একটি শান্তিপূর্ণ পথ খুঁজে নিতে পারেন। এটা ঠিক যে, শান্তিপূর্ণ পথে ক্ষমতা হস্তান্তরের একমাত্র গ্রহণযোগ্য এবং বৈধপন্থা হলো নির্বাচন। এর বাইরে অন্য কোনো উপায়ে ক্ষমতা ধরে রাখা বা ক্ষমতা পরিবর্তনের আর কোনো সুযোগ নেই। জনগণও তার মত প্রকাশের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে নির্বাচনকেই দেখে। কিন্তু সরকারের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার দিকে যত ধাবিত হচ্ছে ততই সবকিছু জটিল হয়ে আসছে। শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের বিষয়টিও যেনো ফিকে হয়ে আসছে। আর এ কারণেই জনগণের মনে এখন শত সংশয়ের উঁকি। তবে সব পরিস্থিতির আলোকে বুঝি রাজনীতি এখন যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পতিত হয়েছে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে হলে শাসক দলকে কঠোর হওয়ার অভ্যাস বদলে আরো উদার হতে হবে। রাজনীতিতে কঠোর হলেই তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। ৯৬ সালে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার কারণেই বিএনপি জনমতের কাছে পর্যদস্ত হয়েছিল। সেই একই ধারায় খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে এখন আওয়ামী লীগ-২০০৮ সালের নির্বাচনে যারা ব্রুট মেজোরিটি পেয়ে ক্ষমতায় আসে। সোজা সাপটা বুঝি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ যত প্যাঁচাবে ততই প্যাঁচে পড়বে এবং একই সাথে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কেবলই কমবে। আওয়ামী লীগ গত পাঁচ বছরে দুর্নীতি আর দুঃশাসন উপহার দিয়ে সাধারণ জনগণের কাছে যে রাজনৈতিক মর্যাদা হারিয়েছে তা খানিকটা উদ্ধার হতে পারে কেবলই বিএনপির রাজনৈতিক সমঝোতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। নইলে রাজনীতির যুদ্ধে আওয়ামী লীগের জন্য আরো বড় পরাজয়ই অপেক্ষা করছে। রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা না হলে দেশ আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, গণতন্ত্র বিপন্ন হবে—সে দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারবে না ক্ষমতাশীন দল আওয়ামী লীগ। অন্যকিছু নয়, একমাত্র সমঝোতাই এখন সংঘাতময় রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার উত্তম পন্থা। লেখক:চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি kirondebate@gmail.com