নির্বাচনী প্রচারণায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা প্রটোকল নয়, প্রটেকশন পাচ্ছেন
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০১৩, ২৩:২৭
বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় থেকে প্রস্তাবিত সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালায় প্রচারণার ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান ও তার মনোনীতদের জন্য বিস্তর সুযোগ রাখা হচ্ছে। এমনকি নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা প্রটোকল না পেলেও তাদের প্রটেকশন দেয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশনের বিদ্যমান বিধিমালার ১৪ (১ক) ধারা সংশোধন করে এবার প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ গ্রহণের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এ প্রস্তাবনায় দলীয় প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে অনধিক ২০ জনকে ‘স্টার ক্যাম্পেনার’ হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণায় সুযোগ দেয়া হচ্ছে। তবে তারা নির্বাচনে কি ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন তা এখনো স্পষ্ট করেনি ইসি। এতে করে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘নির্বাচনকালীন ভারত ও যুক্তরাজ্যে মন্ত্রীরা কোন প্রকোটল পান না। ভারতে প্রধানমন্ত্রী পার্টি প্রধান থাকেন না। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী সাধারণ প্রটোকল পান। প্রচারণার সময়ে বেসরকারি নিরাপত্তা নিতে পারেন তারা। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তবে বাংলাদেশে এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রস্তাবনা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। কারণ স্বৈরাচার সরকারের সময়ে এমনটা ছিল না। তাই কমিশনকে অবিলম্বে এ বিষয়ে স্পষ্ট করতে হবে।’
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে (দলীয় অধীনে সরকারের মেয়াদ শেষের তিন মাস আগে নির্বাচনের বিধান) নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে গত রবিবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮ সংশোধন করে কমিশনের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। প্রস্তাবনা ২২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সংসদের সাধারণ নির্বাচন বা সংসদের শূন্য আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবার ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ এবং সরকারের কোন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা তাহার সমমর্যাদা সম্পন্ন সরকারি সুবিধাভোগী কোন ব্যক্তি, সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচন পূর্ব সময়ে নির্বাচনী প্রচারণায় বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করিতে পারিবেন না। তবে উল্লেখিত পদধারীগণ প্রার্থী হইলে তাহার নির্বাচনী এলাকার প্রচারণার ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হবে না। এছাড়াও দলীয় প্রধান এবং তাহার মনোনীত অনধিক ২০ (বিশ) জন নেতা বা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ উপ-বিধি প্রযোজ্য হইবে না।’ ফলে বাংলাদেশে দলীয় প্রধান যেহেতু প্রধানমন্ত্রী নিজেই সেহেতু তিনি তার মন্ত্রীসভার ২০ জনকে মনোনীত করতে পারবেন। প্রস্তাবিত বিধিমালায় শুধু সার্কিট হাউজ, ডাক-বাংলো বা রেস্ট হাউজ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া ধর্মীয় উপসানালয় প্রচারণা এবং উস্কানীমূলক বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রেও আছে বিধিনিষেধ। তবে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা কি ধরনের সুযোগ পাবেন তা পরিষ্কার নয়। ফলে নির্বাচনে প্রভাবের যথেষ্ট সুযোগ থাকছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের প্রটোকল স্পষ্ট না হলে এটি নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণায় কোন মন্ত্রীর অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।
অথচ ভারতের মডেল কোড অব কন্ডাক্টে বলা আছে, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী সাধারণ সুযোগ-সুবিধা পাবেন এবং মন্ত্রীরা কোন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না। অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন, তেমনি সুবিধা পাবেন বিরোধী দলীয় নেতা।’ ভারতের সাধারণ নির্বাচনে আচরণ বিধির ৭ ধারার (১) উপধারা (ক) তে বলা আছে, ‘নির্বাচনের আগ পর্যন্ত মন্ত্রীরা দাপ্তরিক সফরে নির্বাচনী কাজকে সম্পৃক্ত করতে পারবে না। একইসঙ্গে দাপ্তরিক সুযোগ-সুবিধা নেয়া ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনী কাজে ব্যবহার করা যাবে না।’ (খ) বলা আছে, সরকারিভাবে কোন বিমান, যানবাহন, দপ্তর এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনৈতিক দলের স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না’। আচরণ বিধিতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বিমান, হেলিকপ্টার, রেস্ট হাউজ, ডাক বাংলোসহ সরকারি অন্যান্য অফিস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এছাড়া বলা আছে, নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা কোন উন্নয়ন বরাদ্দ ছাড় করতেও পারবেন না। পাশাপাশি কোন ভোটকেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী যেতে পারবেন না। সরকারি অর্থায়নে কোন অনুষ্ঠানে কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরাও অংশ নিতে পারেন না। শুধুমাত্র মুখ্য সচিব বা অন্যান্য কর্মকর্তারা অংশ নিতে পারেন। এভাবে নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বিষয়ে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার হতে পারে এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।’ একইমত আছে যুক্তরাজ্যের নির্বাচনী আচরণ বিধিতে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ প্রকোটল পান আর মন্ত্রীরা থাকেন সাধারণ প্রার্থীর মতো।
এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের প্রস্তাবিত আচরণ বিধিতে সরকারি গাড়ী, বাসস্থান ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আছে। প্রস্তাবনাটি প্রাথমিক অবস্থায় আছে। প্রস্তাবনার কোথাও প্রধানমন্ত্রীর প্রচারণার কথা বলা হয়নি।’
তিনি বলেন ভারতের সাধারণ নির্বাচনে আচরণ বিধির আলোকে বাংলাদেশেও নির্বাচন আচরণ বিধি করা হচ্ছে। ভারতে রাজনৈতিক দলীয় প্রধানসহ ৪০ জন ‘স্টার ক্যাম্পেনার’ নির্বাচনী প্রচারণায় সুযোগ পান। সেভাবে বাংলাদেশেও দলীয় প্রধান এবং তার মনোনীত ২০ জনকে প্রচারণায় রাখার সুযোগ দিয়ে প্রস্তাবনা করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ ইত্তেফাককে বলেন, ‘নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের কি ধরনের প্রটোকল থাকবে তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে।’ তিনি বলেন প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীরা প্রটোকল না পেলে তাদেরকে প্রটেকশন দেয়ার চিন্তা ভাবনা রয়েছ।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের আচরণবিধি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের জন্য আচরণ বিধি পরিবর্তন ও চূড়ান্ত করা হয়েছে। আমরা এখনও জাতীয় নির্বাচনের আচরণবিধি নিয়ে কোন বৈঠক করিনি বা এর খসড়া চূড়ান্ত হয়নি। তবে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নির্বাচনের আচরণবিধি পরিবর্তন হয়েছে। আমরাও পরিবর্তন করছি। কিছু ভুল ত্রুটি আছে, কিছু সংযোজন বিয়োজন আছে। চূড়ান্ত হলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।