অনিবার্য সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দেশ

সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়ার পর থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচনের ন্যায় বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে এ ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন রকম আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। সরকারি ও বিরোধী দলের এমন দ্বিমুখী অবস্থানের ফলে ইতোমধ্যে দেশে হরতাল, অবরোধসহ নানারকম কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে অগণিত মানুষের রক্ত ঝরেছে, জীবন দিতে হয়েছে অনেককে। দেশের এমন পরিস্থিতিতে কূটনীতিকগণের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করাসহ এর থেকে উত্তরণের জন্য উভয় দলকে সংলাপে বসে সমাধানে পৌঁছার আহবান জানানো হয়। সর্বশেষ জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে অস্কার ফার্নান্দেজের বাংলাদেশ সফরে সংলাপের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বও পায়। কে কাকে সংলাপের বিষয়ে আগে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাবে সে বিষয়টিও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অস্কার ফার্নান্দেজ বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়ার পর উভয় রাজনৈতিক দলের সংলাপের ব্যাপারে আচরণে পরিবর্তন আসে। তারা পুনরায় নিজ নিজ দলের পক্ষ থেকে পূর্বের বিতর্কে ফিরে যায়। সংলাপের পথটিও আপাতত রুদ্ধ হয়ে যায়। গত কয়েকদিন যাবত্ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আবারো বলা হচ্ছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে হবে এবং তা গণতান্ত্রিক নিয়মেই অনুষ্ঠিত হবে। অপরদিকে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এবার একটু শক্ত অবস্থান নিয়ে সরকারকে হুমকি দিয়ে বলা হচ্ছে যে, এই সরকারের অধীনে কোন নির্বাচন হতে দেয়া হবে না এবং করার চেষ্টা করা হলে তা প্রতিহত করা হবে। বিরোধী দলীয় নেত্রী গত কয়েকদিন বিভিন্ন দলের ইফতার মাহফিলে অংশ নিয়ে এ ব্যাপারে আসন্ন ঈদের পর দুর্বার আন্দোলনেরও ঘোষণা দেন। সুতরাং এটি খুবই স্পষ্ট হয়ে আসছে যে, আগামী দিনে অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় হরতাল, অবরোধের মত কর্মসূচি কঠোরভাবেই পালন করা হবে। আর এতে করে দেশে রক্ত ঝরবে, অনেকের প্রাণহানি ঘটবে এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেড়ে যাবে। দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও বাড়বে। মোটকথা এমতাবস্থায় সবমিলিয়ে এক অস্বাভাবিক অবস্থার যে সৃষ্টি হবে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি চরিতার্থ করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর এমন বিপরীতমুখী অবস্থান কেন? কেন জনগণকে জিম্মি করার জন্য জেনে বুঝেও সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির পথ সুগম করা হচ্ছে? জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি বিষয় নিয়ে কেন ছেলেমানুষি খেলা? গণতন্ত্রের নামে জনগণের রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতার স্বাদ নেয়ার এত আহলাদ কেন? বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল বর্তমান বিরোধী দল বিএনপি আর এর সুফল পরবর্তীতে উভয় দলই গ্রহণ করে। একটি বিষয় এখানে মনে রাখা দরকার যে, বিগত চার দলীয় ঐক্যজোট সরকারের সময় বর্তমান ক্ষমতাসীন দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিপক্ষে ছিলেন না কিংবা তারা নির্বাচিত হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করবেন এমন প্রতিশ্রুতিও তাদের ছিল না। সে কারণে তত্কালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ যে সকল বিষয়ে তাদের আপত্তি ছিল পরবর্তী সময়ে তা পূরণ হলে সেই তত্ত্বাবধায়কের অধীনেই আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং তাতে বিপুলভাবে বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে সত্য; কিন্তু এই ব্যবস্থার অধীনে দেশে যে আরো নির্বাচনের সুযোগ রয়েছে সেটিও চাপা পড়া এক অপ্রিয় সত্য। সুতরাং আশার দিক হলো, উভয় দলের সমাধানের একটি পথ এখনো খোলা রয়েছে। কিন্তু, যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে ইতোমধ্যে দেশে একটি তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে ও ব্যবস্থাটি কোর্টের মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে এবং একই সাথে আগামী দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে তা নিয়ে একটি সংকটাপন্ন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে সেহেতু এই বিষয়টির একটি স্থায়ী সমাধান হওয়া এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যদি কোন রকম স্থায়ী সমাধান না করে গোঁজামিলের আশ্রয় নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনক্ষমতার হস্তান্তর করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যে এটি নিয়ে আরো বড় রকমের রক্তপাত ঘটবে তা বলাই বাহুল্য। আমরা সে রকম কোন পরিবেশ আর দেখতে চাই না। আমরা আশা করি, দেশের সব রাজনৈতিক দল জনগণের সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে বিষয়টির একটি টেকসই, কার্যকরী ও সবার নিকট গ্রহণযোগ্য সমাধানে উপনীত হবেন। লেখক : স্নাতক শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়