অর্থনীতি

ব্যাংকের অলস অর্থ ও স্থবির বিনিয়োগ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে দেশের ব্যাংক গুলোতে ৭২,০০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য অর্থাত্ অলস টাকা পড়ে আছে। (দৈঃ ইত্তেফাক, ২৩/০৭/১৩)। ব্যাংকের প্রধান কর্মকান্ড আমানত সংগ্রহ , ঋণ প্রদান এবং সুদ অর্জন করা। আমানতের ওপর সুদ পরিশোধ করে যদি সে আমানত বিনিয়োগ করতে না পারে তাহলে ব্যাংকের মুনাফার বদলে লোকসান গুনতে হয়। অন্যদিকে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা তাদের প্রয়োজনের সিংগভাগ অর্থ ব্যাংক থেকে ঋণ হিসাবে গ্রহণ করেন। ঋন না নেয়ার অর্থ হচ্ছে শিল্প ও ব্যবসাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না এবং বিনিয়োগ না হলে ব্যবসায়িক কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফলে জাতীয় প্রবৃদ্ধির ওপরও এর কু প্রভাব পড়বে। এ দুরাবস্থা সৃষ্টির প্রথম কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। এরপর আছে গ্যাস বিদ্যুতের অভাব এবং ঋনের উচ্চ সুদ হার। ব্যাংকগুলোতে এখন অস্থির এবং অস্বচ্ছ অবস্থা বিরাজ করছে। একদিকে অলস আমানত পড়ে আছে কিন্তু ঋনের সুদ হার কমানো হচ্ছে না, অন্যদিকে কু ঋণের পরিমাণ, অবলুপ্ত ঋণের পরিমাণ, সরকারকে প্রদত্ত ঋণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ ইত্যাদি গ্রুপের কেলেঙ্কারীর পর ঋণ বিতরণে ব্যাংকসমূহ অতি সাবধানতা অলম্বন করতে বাধ্য হচ্ছে। এভাবেই চর্তুমুখী বাধা বিপত্তি ব্যাংকিং সেক্টরের ব্যবসাতে স্থবিরতা ঘটিয়েছে, এর পরিনামে সাধারণ আমানতকারীগণ ব্যাংক থেকে কম মুনাফা পাচ্ছে বলে তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা হ্রাস পাচ্ছে। এবিবির চেয়ারম্যান বলছেন ৭২,০০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য নয়, এর মধ্যে থেকে ব্যাংক সমূহ ৫০,০০০ কোটি টাকা ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু বিল ও বন্ডের সুদের হার ৬% থেকে ৮% মাত্র। ঋণ প্রদান করলে একই বিনিয়োগের ওপর ১৫% থেকে ২০% সুদ পাওয়া যেতো। সুতরাং প্রকৃত অর্থে ৭২,০০০ কোটি টাকা না হলেও প্রায় ৫০,০০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য বিরাজমান আছে। বাংলাদেশের মত ক্ষুদ্র অর্থনীতির জন্য এ বিশাল পরিমাণ অর্থ থাকাও ক্ষতিকারক। বিনিয়োগ হলেই উত্পাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান হবে, কর্মচারীদের সঞ্চয় ও কর্মকান্ড বাড়বে যা শেষ পর্যন্ত জিডিবি প্রবৃদ্ধি বাড়াবে। এই স্থবির পরিস্থিতিতেও ব্যাংকের কু ঋণ, খেলাপী ঋণ, মওকুফকৃত সুদ, ক্রমবর্ধমান সরকারী ঋণ, সব মিলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ঝুকিপূর্ণ করে তুলেছে। সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে জানা যায় ৪৭টি ব্যাংকে মোট ঋণ-খেলাপির সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজার। তন্মধ্যে ২৬ হাজার ৫৭৯ ঋণ খেলাপি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৪,৪০৩ কোটি টাকা। আরও আছে মূলধন এবং খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি। সোনালী, জনতা, অগ্রনী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৯,৬৪৫ কোটি টাকা, প্রভিশন ঘাটতি ৭,৪৯৪ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংক দু’দিকেই সবচেয়ে এগিয়ে আছে। ২০০৯ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ২,১৭,৯৯২ কোটি ঋণের বিপরীতে ৪,৬৮০ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করা হয়েছে। প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা সঠিকভাবে প্রতিফলিত করে না, ফলে আমানতকারী ও শেয়ার হোল্ডারদের ঝুকি বাড়ে। মূলধন ঘাটতি ব্যাংকের দেউলিয়াত্ব ডেকে আনতে পারে। মওকুফ করা সুদ ব্যাংকের সামষ্টিক ক্ষতি, এতে গুটি কয়েক গ্রাহক লাভবান হয, কিন্তু শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতি এবং আমানতকারীদের ঝুকি বাড়ে। সবকিছু মিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরের আর্থিক অবস্থা খুব ভাল নেই। একই কারণে ২০১৩ সালে প্রায় প্রত্যেকটি ব্যাংকের অর্ধবার্ষিক পরিচালন মুনাফা ২০১২ সালের অনুপাতে হ্রাস পেয়েছে। সুতরাং অর্থনীতির এ গুরুত্বপূর্ণ খাতটির আর্থিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দক্ষ নীতিমালা এবং নজরদারী আরও বাড়াতে হবে। সদ্য ঘোষিত মুদ্রা নীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসরকারী খাতে ঋণ প্রবাহ সংকোচিত করেছে যা এই অলস অর্থ বিনিয়োগে বাধাঁ সৃষ্টি করবে। সরকারকে আরও ঋণ দেয়ার জন্য যদি এ নীতি গ্রহন করা হয়ে থাকে তবে এটা কাম্য নয়। সংশোধিত ব্যাংকিং আইনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, তাই এখনই সময় ব্যাংকিং খাতকে ঝুঁকিমুক্ত ও দক্ষ করে তোলার জন্য্ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সংশোধন ও সমস্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করা। হরতাল, অবরোধ ,সহিংসতা, এক কথায় রাজনৈতিক অস্থিরতা ,তত্সংগে নির্বাচন অনিশ্চয়তা ব্যংকিং খাত সহ অর্থনীতির প্রতিটি সেক্টর বাধাগ্রস্থ করছে, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। তাই সরকারেরও উচিত এ অবস্থার অবসান ঘটিয়ে অথনীতিকে চাঙ্গা করা। লেখক :এফসিএ ও কথাশিল্পী