এই অব্যবস্থা ও অপচয় কি চলিতেই থাকিবে

সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, অব্যবস্থা ও অপচয়ের খবর শুনিয়া বা পাঠ করিয়া আজকাল কেহই বিস্মিত হন না। কারণ অবস্থা এমন যে, ঠগ বাছিতে গেলে গাঁ উজাড় হইয়া পড়ার আশঙ্কা রহিয়াছে। তথাপি এই ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অবস্থান যে সম্মুখ সারিতে তাহাও সুবিদিতই বলা চলে। এমনিতেই সরকারের এই দপ্তরটির বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, দরিদ্র এই দেশটির সীমিত সম্পদের অব্যবস্থা ও অপচয় কোন্ পর্যায়ে পৌঁছাইতে পারে—সেই ক্ষেত্রেও নূতন দৃষ্টান্ত স্থাপন করিতে চলিয়াছে তাহারা। ভাবিতে অবাক লাগে যে, যেই দেশে অর্থাভাবে জরুরি চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হইবার অভিযোগ ভূরি ভূরি, সেই দেশেই কোটি কোটি টাকা ব্যয় করিয়া কেনা ৫৮৫টি যন্ত্র বাক্সবন্দী অবস্থায় অযত্নে-অবহেলায় পড়িয়া আছে বত্সরের পর বত্সর। তন্মধ্যে আছে বেশকিছু বৈদ্যুতিক জেনারেটরসহ চিকিত্সা-সম্পর্কিত বহু মূল্যবান যন্ত্রপাতি। বিভিন্ন সরকারের আমলে এইসব যন্ত্রপাতি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ, জেলা ও সদর হাসপাতাল এবং উপজেলা হাসপাতালে পাঠানো হইয়াছিল। ইতিমধ্যে কিছু কিছু যন্ত্রের মেয়াদোত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে বা উত্তীর্ণ হইবার পথে। অনেক যন্ত্র নষ্ট হইয়া গিয়াছে বাক্সবন্দী অবস্থায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) এক জরিপেই এইসব তথ্য উদঘাটিত হইয়াছে। সামগ্রিক চিত্রটি শিহরিত হইবার মতো। সিএমএসডি ২০০৩ হইতে ২০১১ সালের মধ্যে ২৪টি বৈদ্যুতিক জেনারেটর বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে পাঠাইয়াছিল। তন্মধ্যে একটিও চালু অবস্থায় নাই। কেন নাই—তাহার উত্তর আছে নেত্রকোনার সিভিল সার্জনের বক্তব্যে। তিনি খোলাখুলিই বলিয়াছেন যে, নেত্রকোনা জেলা সদর হাসপাতালের জন্য ৬০ কেভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জেনারেটর পাঠানো হইয়াছিল কয়েক বত্সর আগে। কিন্তু জেনারেটরটি বসানোর মতো জায়গা সেইখানে নাই। তদুপরি দেওয়া হয় নাই জেনারেটর চালানোর জন্য জ্বালানি তেল ক্রয়ের কোনো বরাদ্দও। বারবার লিখিতভাবে তাগাদা দিয়াও কোনো কাজ হয় নাই। ফলে জেনারেটরটি বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়িয়া আছে। অন্যসব জেনারেটরের অবস্থাও তথৈবচ। বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া এই অবস্থা চলিয়া আসিতেছে। প্রসঙ্গত লক্ষণীয় যে, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে পানি বিশুদ্ধ করার জন্য একটি ডিস্টিল্ড ওয়াটার প্ল্যান্ট পাঠানো হইয়াছিল ১৯৮৭ সালে। দীর্ঘ ২৬ বত্সর পরও তাহা চালু হয় নাই। সমস্যার চিত্রও প্রায় অভিন্ন। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নাই। ক্ষেত্রবিশেষে নাই জনবল ও বরাদ্দ। বিষয়টি যে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের অজানা—তাহাও নহে। বিশ্বব্যাংকসহ একাধিক দাতা সংস্থার সহায়তায় নেদারল্যান্ডসের একটি প্রতিষ্ঠান ২০০৮ সালে ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট সার্ভে’ নামে একটি জরিপ চালাইয়াছিল। সেই জরিপেও দেখা গিয়াছিল যে, নানা কারণে স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা কর্মসূচির আওতায় কেনা যন্ত্রপাতির প্রায় ৫০ শতাংশই অব্যবহূত পড়িয়া থাকে। এই অব্যবস্থা ও অপচয় রোধে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশও করিয়াছিল তাহারা। কিন্তু তাহা গ্রাহ্য করা হয় নাই। বরং অভিযোগ আছে যে, অসাধু উদ্দেশ্যে সিএমএসডি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের একটি চক্র দীর্ঘদিন যাবত্ এইসব অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সাথে জড়িত। অভিযোগটি ভিত্তিহীন হইলে দরিদ্র জনগণ স্বস্তিবোধ করিত। কিন্তু সেই সুযোগইবা কোথায়? প্রয়োজনীয় অর্থ ও সম্পদের অভাবে বহু জনগুরুত্বপূর্ণ কাজই যেইখানে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না, সেইখানে প্রতিটি পয়সারই সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা হইবে—ইহাই প্রত্যাশিত। ইহা নিশ্চিত করিবার অন্যতম প্রধান উপায় হইল, স্থানীয় চাহিদা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতেই যন্ত্রপাতি ক্রয় ও সরবরাহ করা। কিন্তু একাধিক হাসপাতালের পরিচালক ও সিভিল সার্জন বলিয়াছেন যে, তাহাদের চাহিদা বা চাহিদাপত্রের তোয়াক্কা না করিয়াই কেন্দ্রীয়ভাবে যন্ত্রপাতি ক্রয় ও সরবরাহ করা হইতেছে। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাহা বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়িয়া থাকিতেছে। কোনো অজুহাতেই এই অব্যবস্থা ও অপচয় মানিয়া লওয়া যায় না। অবিলম্বে ইহা বন্ধ করিতে হইবে। নিশ্চিত করিতে হইবে ইতিমধ্যে ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতির যথাযথ ব্যবহার। সর্বোপরি, উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয়ের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে গ্রহণ করিতে হইবে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা।