সড়ক শৃঙ্খলা ভাঙিয়া পড়িতেছে

রাজধানী ঢাকা কি ক্রমান্বয়ে একটি বসবাসের অযোগ্য নগরীতে পরিণত হইতে যাইতেছে? এই প্রশ্নটি ঢাকাবাসীর মনে উত্তরোত্তর প্রবলতর হইয়া উঠিতেছে। কারণ বিদ্যুত্, গ্যাস, নিরাপত্তা, সড়ক যোগাযোগ ইত্যাদি প্রায় সকল ক্ষেত্রেই যে ধরনের অব্যবস্থা লক্ষ্য করা যাইতেছে তাহাতে শহর ঢাকায় বাস করাই অসম্ভব হইয়া পড়িতেছে বৈকি! কাহারও কাহারও মতে ঢাকায় এক কোটি বিশ লক্ষ এবং কেহ কেহ মনে করেন দেড় কোটি লোক বসবাস করে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সকল প্রকার নাগরিক সুবিধার বন্দোবস্ত করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ—ইহাকেই বুঝিবা ইংরাজীতে ‘হিমালয়ান টাস্ক’ বলা হইয়া থাকে। বিদ্যুত্, গ্যাস, পানি, পয়ঃপ্রণালী ইত্যাদির নিশ্চয়তার পাশাপাশি যাতায়াত ব্যবস্থা তথা সড়ক যোগাযোগের উন্নত অবস্থা আর শিক্ষা-চিকিত্সার সুবন্দোবস্তসমেত সুস্থ কাজের পরিবেশ এবং আবর্জনামুক্ত একটি নগরী বিশ্বের সকল নগরের বাসিন্দাদের কাম্য। ঢাকাকে তিলোত্তমা নগরীতে পরিণত করার কত কেচ্ছা-কাহিনী যে নগরবাসীকে বিগত তিন-চার দশক ধরিয়া শোনানো হইয়াছে উহার ইয়ত্তা নাই। বাস্তবে উহার কিছুই হয় নাই, ফলে একেবারেই অপরিকল্পিতভাবে গড়িয়া উঠিয়াছে এই রাজধানী শহর। ইহাকে একটি আবর্জনায় ভরা কংক্রীটের নগরী বলাই শ্রেয়। নাগরিক সুবিধাদির বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সোনার পাথর বাটি। শহরের যানজট লইয়া বত্সরের পর বত্সর জুড়িয়া কত সভা বসিল, সমিতি হইল, কল্পনা-পরিকল্পনা, বিশেষজ্ঞদের অভিমত ইত্যাদিতে সয়লাব হইল মন্ত্রণালয়-দপ্তর-বিভাগ কিন্তু সবই শেষতক তাসের ঘরের মতো ভাঙিয়া পড়িল। মেট্রো বা পাতাল রেল ও মনোরেল নির্মাণ এবং নদীপথকে অধিক ও সুষ্ঠু ব্যবহারের কত কথার ফুলঝুরিতেই না নগরবাসীকে সিক্ত করা হইলো কিন্তু উহা এক্ষণে কেবল কথার কথা হিসাবেই দেখা গেল মাত্র। যানজট শুধু যে রাজধানীর সমস্যা তাহা নহে, দেশের সকল জেলা-উপজেলা শহরেও আজকাল যানজট এক সমস্যাই বটে! অবিশ্যি, বিশ্বের এমন দেশটি কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না যেখানে যানজট নাই। তবে এখানকার আর সেখানকার যানজটের মধ্যে চরিত্রগত স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। সেখানে যানবাহনের আধিক্যের জন্য যানজট হয় বটে তবে নিয়ম-শৃঙ্খলা, ট্রাফিক আইন এইগুলি সকলেই মানিয়া চলে। আর আমাদের এখানে নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান না মানার মধ্যেই যেন আত্মতৃপ্তির দেখা মেলে। ট্রাফিক আইন আছে, সিগন্যাল আছে, সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন আছে কিন্তু রিকশাচালক হইতে শুরু করিয়া সকল প্রকার যানবাহনের চালকেরা উহার থোড়াই পরোয়া করে। সকলেই আগে যাইতে চাহে, অন্য সকলকে পিছনে ফেলিয়া আগে যাইবার এমন এক উদগ্র তাড়না এইসব ড্রাইভারদের পাইয়া বসিয়াছে যে, তাহাদের কাণ্ডজ্ঞান ইহাতে ক্ষণিকের জন্য হইলেও যেন সম্পূর্ণভাবে লোপ পায়। আর উহার ফলে ভয়াবহ যানজটে নগরবাসীর ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা সৃষ্টি হয়। এমন নৈরাজ্য কোন সভ্য স্বাধীন দেশে কল্পনারও অতীত। কিন্তু এখানে সভ্যতা-ভব্যতার ধার কেহই ধারে না। ‘আমরা সবাই স্বাধীন সবাই রাজা’—এই ভাব লইয়াই চলে সকলে। এমন উচ্ছৃঙ্খলতা ও নৈরাজ্যকর অবস্থার মধ্যে যাহারা বাস করেন তাহারাই কেবল জানেন যে কত ধানে কত চাল। ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটার ধুম পড়ায় যানজটের তীব্রতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাইয়াছে, তবে অসহনীয় যানজট এখানে কোন উত্সব বা পার্বণ ছাড়াও নিত্যদিনের সমস্যা। সড়ক শৃঙ্খলা তাই সম্পূর্ণভাবে ভাঙিয়া পড়িয়াছে। এই দুরবস্থার সুযোগ লইয়া সংশ্লিষ্ট সকল মহলই যাত্রীসাধারণের উপর এমনভাবে হামলাইয়া পড়িয়াছে যে, অফিস-আদালত, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বা স্কুল-কলেজে যাইতে, বাজারঘাট ইত্যাদি করিতে রাস্তায় বাহির হওয়াটাই এক ধরনের জিল্লতি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তবে যানচালকদের মনে যদি আইনের প্রতি ও নগরীতে চলাচলকারী অন্য সকলের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও মমত্ববোধ তৈরি না হয় তাহা হইলে এই অব্যবস্থা বা যানজটকে অবনত মস্তকে মানিয়া নেওয়া ছাড়া নগরবাসীর আর উপায় কি!