ধর্ম

রমজান ও সংযমের দর্শন

গতবছর রমজানের বেশ কিছুদিন বিশেষ প্রয়োজনে আমি দেশের বাইরে ছিলাম। সফরের ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তে রোজার বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রোজা পালনে বাধা নেই। কষ্ট করে হলেও তাই রোজা পালন করেছি। তবে রোজার সময় মুসলিম নাগরিক প্রধান দেশগুলোতে যে রকম সংযমী হবার অনুকূল পরিবেশ থাকে সেই আমেজ সেখানে ছিলো না। আমাদের দেশে রমজান মাসে দিবালোকে প্রকাশ্যে পানাহার বর্জনের সংস্কৃতি বিদ্যমান। কর্মক্ষেত্র, রাস্তা-ঘাটসহ সকল স্থানে মানুষ কথা ও কাজে যথেষ্ট সংযমী হতে চেষ্টা করে। যদিও বাজারদর এবং কেনাকাটার দিক থেকে সংযমী হবার সংস্কৃতি এদেশে বিদ্যমান নেই। রজমান মাসে দ্রব্যমূল্য যেমন বাড়ে মানুষের কেনাকাটাও বোধ হয় তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলে। এটা সংযমের আদর্শের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। রোজা পালনের মূল উদ্দেশ্য সংযম সাধনের প্রশিক্ষণ নেয়া। পরমসত্তা আল্লাহর ভয়ে দেহ-মন সবকিছুকে সংযত রাখাই হলো রোজা বা সিয়াম সাধনা। তাই অশুভ কামনা-বাসনা, লোভ-লালসা তথা ভোগস্পৃহা দমন এবং বৈধ বাসনা ও ইন্দ্রিয়সুখকেও নিয়ন্ত্রণ করতে না শিখলে সিয়াম সাধনার সার্থকতা থাকে না। অথচ একশ্রেণির মানুষ রোজা থাকা অবস্থায় মাত্রাতিরিক্ত কেনাকাটা করেন। তাদের এই ধরনের উগ্র ভোগবাদিতার প্রভাবে বা কারণেই অনেক ক্ষেত্রে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই সুযোগে কোন কোন ব্যবসায়ী অতিমাত্রায় মুনাফা অর্জনের বাসনা থেকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে থাকে। তাদের এই আচরণও সংযমের খেলাপ। তাই তারা যদি রোজাদারও হন তাহলে তারাও সিয়ামের মূল শিক্ষা সংযমের আদর্শ থেকে সরে যান বলা চলে। সংযমী হওয়া নৈতিকতার একটি পূর্ব শর্ত। যে সংযমী হতে পারে না তার পক্ষে নৈতিক হওয়াও সম্ভব নয়। তাই একমাত্র স্থূল আত্মসুখবাদী তথা উগ্র ভোগবাদীগণ ছাড়া সকল নীতিদার্শনিকগণই সংযমী হবার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন জীব। জীববৃত্তির দিক দিয়ে মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মত ক্ষুধা, তৃষ্ণাসহ নানারকম প্রবণতার ধারক। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তির কারণে অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষ শ্রেষ্ঠ। তবে বুদ্ধি বিবেক দিয়ে জৈব প্রবৃত্তিগুলোকে পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাকে না। দার্শনিক প্লেটো মানবাত্মাকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন : ক্ষুধা আত্মা, সাহস আত্মা এবং বুদ্ধি আত্মা। তার মতে, আত্মার এই তিনটি অংশ সমন্বিতভাবে কাজ করার মধ্যেই মানবজীবনের পূর্ণতা বা সার্থকতা নির্ভর করে। তিনি আত্মার বুদ্ধিময় অংশ দ্বারা অন্য দু’টো অংশকে পরিচালিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ইসলামেও আত্মার প্রধান তিনটি ভাগ স্বীকার করা হয়, তা হলো: নাফেস আম্মারা, নাফেস লাওয়ামা ও নাফেস মোতমাইন্না। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) মানুষকে একই সাথে ইন্দ্রিয়ের জগতের এবং বুদ্ধির জগতের সদস্য বলে অভিহিত করেন। ইন্দ্রিয়ের জগতের সদস্য হিসেবে মানুষ নানারকম বাহ্যিক প্রবণতার দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু বিশুদ্ধ বুদ্ধির জগতের সদস্য হিসেবে মানুষ তার নিজের মধ্যে নৈতিক আদর্শ উপলব্ধি করে। এই বুদ্ধি প্রসূত আদেশ বা নৈতিক নির্দেশ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ যখন কাজ করে তখনই তার কাজকে ভালো বলা যায়। তখন তার আচরণ হয় সংযমী। কান্টীয় নীতিদর্শনে নৈতিক জীবনের যে তাত্ত্বিক দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায় সে রকম নৈতিক জীবনের প্রায়োগিকতা আমরা পেতে পারি রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে। কেননা রোজা বা সিয়াম আমাদের ইন্দ্রিয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনার প্রশিক্ষণ প্রদান করে, আমাদের সংযমী করে তোলে। সংযম ছাড়া নৈতিক জীবন সম্ভব নয়। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে যে নৈতিক আচরণের প্রশিক্ষণ মেলে তার আলোকে বছরের বাকি দিনগুলোও আলোকিত হওয়া কাম্য। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই যদি তেমনটি দেখা না যায় তাহলে বুঝতে হবে রমজানের সিয়াম সাধনা যথার্থভাবে করা হয়নি। যথার্থভাবে মাসব্যাপী সিয়াম পালন করা হলে তার প্রভাবে মানুষের জীবন অধিকতর নৈতিক মানে উন্নীত হবে— এমনটিই আশা করা যায়। লেখক:দর্শনের শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রাকটিক্যাল এথিক্স sowkot.hossain@yahoo.com