এবারও পাহাড় ধসে মানুষ মরলো
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০১৩, ২১:২৯
পাহাড় ধসে প্রাণ হারানোর ঘটনা বেশ পুরোনো। যারা লেখালেখি করেন তারা তাদের লেখনির মাধ্যমে সতর্ক করে থাকেন। হরদম হচ্ছে লেখালেখি। গুরুত্বের সঙ্গে তা ছাপছেও জাতীয় এবং আঞ্চলিক পত্রিকাগুলো। কে শোনে কার কথা! তাই যা হওয়ার তাই হয়। গত কয়েক বছরে পার্বত্য জেলাগুলোতে পাহাড়ের নিচে দখল আর বসতি এত বেড়েছে যে, এ নিয়ে আর শঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। পাহাড়ের নিচের অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে না। তারা এখনো আছে বেশ বহালতবিয়তে। যত্সামান্য তত্পরতা ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবারও উদাসীন। কানে তুলা দিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমে বিভোর। তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে, হবেও।
দেশবাসীকে পাহাড় চাপা পড়া লাশ দেখতে হবে আরও। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তা ঠেকানো যাচ্ছে না। আসলে ঠেকানো যায়; ঠেকানো হয় না কেন? চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেছে, নগরীর ৬৫টি স্থানের প্রায় অর্ধলক্ষ বস্তিবাসী পাহাড়ের ঢালে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছে। এর মধ্যে লালখান বাজারের মতিঝর্ণা, বাঘঘোনা এবং ফয়’স লেকের কনকর্ড ও দক্ষিণ খুলশি এলাকার মানুষ সর্বাধিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কয়েক বছর ধরে নগরীর এসব এলাকায় পাহাড় ধস ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ফি বছরই গরিব বস্তিবাসীর মাথার উপর বিশাল পাহাড় ভেঙে একে একে লাশ হয় বৃদ্ধ, যুবক, নর-নারী, শিশু-কিশোর। প্রতিটি ঘটনাই মর্মান্তিক। ইচ্ছা করলেই এসব প্রতিরোধ করতে পারে দায়িত্বশীল বিভাগ। কিন্তু কেন করে না তা বোধগম্য নয় কারো। কি মর্মান্তিকই না এ ঘটনা! নিশ্চিত মৃত্যু উপত্যকায় বসবাসকারী মানুষের তরতাজা চাপা লাশ যে কোনো পাষণ্ডেরও মন গলাবে। পাহাড়ি ভূমিধসের পর সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ, বিশেষজ্ঞদের নানা বক্তব্য ও উদ্যোগ অবশ্যই লক্ষণীয়। বিশেষ করে সরকারের নানা উদ্যোগের পর সংশ্লিষ্ট অনেকেই আশ্বস্ত হয় এই ভেবে, ভবিষ্যতে এমন করুণ পরিণতি আর হবে না। এসব উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম ছিল একটি টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে পাহাড় ধসের কারণ ও প্রতিকারের বিষয়ে মতামত গ্রহণ এবং সার্বক্ষণিক তদারকি করা। সেইসঙ্গে অনিরাপদ বসতি সরিয়ে ফেলা। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সরকার গঠিত এক কমিটি ৫ বছর আগে পাহাড়ি ভূমিধসের সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখসহ সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা পেশও করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য এর অধিকাংশই মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোকে জরুরিভিত্তিতে চিহ্নিত করার সুপারিশ ছিল, যা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তেমনিভাবে বাস্তবায়িত হয়নি পাহাড়ের পাদদেশে বিপদসংকুল অবস্থায় বসবাসকারী বস্তিবাসীদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের কর্মসূচি। বাস্তবায়িত হয়নি পাহাড় কাটার আশঙ্কা কিংবা বন উজাড়ের ঘটনা। পাহাড় হন্তারকদের পাহাড় কাটা থেকে বিরত করা যায়নি। অন্যদিকে প্রশাসন, সিটি করপোরেশনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর লোভাতুর হস্ত গুটিয়ে না নেয়ায় অশিক্ষিত এ জনগোষ্ঠী টুপাইস দিয়ে পাহাড়ের পাদদেশেই ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস অব্যাহত রাখে।
আর বিলম্ব নয়, এখনই পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ করা না হলে পাহাড়ের দুর্ঘটনা অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পত্রিকায় পড়েছি চট্টগ্রাম নগরীর মতিঝর্ণার জিলাপির পাহাড়, টাংকির পাহাড়, গণপূর্ত অধিদফতরের পাহাড়, বাটালি পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বস্তি। উত্তরদিকে টাংকির পাহাড়, একে খানের পাহাড় হয়ে দক্ষিণ দিকে জিলাপির পাহাড়, বাটালি পাহাড় হয়ে সোজা পশ্চিম দিকে টাইগার পাস রেলওয়ে কলোনি পর্যন্ত প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বস্তিটি ছড়িয়ে আছে। মতিঝর্ণার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বাঘঘোনা এলাকার মুছার পাহাড়। প্রায় ৯০ ফুট উঁচু পাহাড়টির পাদদেশে বসতি গড়ে উঠেছে। মুছার পাহাড় ছাড়াও ফয়’স লেকে কনকর্ড পুনর্বাসনের নামে গড়ে তুলছে মৃত্যু উপত্যকা। পাহাড়গুলোর মধ্যখানে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে প্রায় ১০ হাজার লোক বাস করছে। অতিবর্ষণে যে কোনো সময় এ ধরনের পাহাড় ধসে মানুষের জীবন্ত কবর হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও সিটি করপোরেশন বা সিডিএ বস্তিগুলো উচ্ছেদে তত্পর নয়। ফয়’স লেক ছাড়াও কুসুমবাগ আবাসিক এলাকা, দক্ষিণ পাহাড়তলির সেকান্দরপাড়া, কাইচ্যাঘোনা, লেবুবাগান প্রভৃতি এলাকায় আরও প্রায় হাজারো মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে। ধারণা করা হচ্ছে, নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এ স্থানগুলোতে প্রায় অর্ধলক্ষ লোক বাস করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের গবেষণায় দেখা যায়, মহানগরীর ৬৫টি স্থানে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসতি রয়েছে। এসব স্থানে প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড় ধস ছাড়াও ভূমিকম্পেও ধসে পড়তে পারে। পাহাড় কাটার ফলেই প্রতি বছর পাহাড় ধসে মানুষ মারা যাচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও কতিপয় মাস্তান সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় পাহাড়ের পাদদেশের জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করায় পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও নিম্ন আয়ের মানুষ বসবাস করায় মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে পাহাড় ধসে মৃত্যু ঠেকাতে ১৬ দফা সুপারিশ দেয়া হয়েছে। এসব সুপারিশ অনুসরণ করা হলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেত।
১৬ দফা সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, পাহাড়ের মালিক (রেলওয়ে, ওয়াসা, গণপূর্ত) লিজ দেয়ার বিভিন্ন শর্ত খতিয়ে দেখবে এবং শর্ত না মানা হলে তা বাস্তবায়ন করবে। রেলওয়ে, গণপূর্ত ও ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থার অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একের পর এক পাহাড় চাপা পড়ে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় পাহাড় ব্যবস্থাপনায় আমাদের অক্ষমতাকেই প্রকাশ করছে। বিগত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজারসহ অন্যান্য পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসে প্রায় সহস্রাধিক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর আমরা পত্রিকা মারফত জেনেছি। ফি বছর ধরে ভয়াবহ নিশ্চিত দুর্ঘটনায় এমন করুণ মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়া যায় না। এর আগে একটি শক্তিশালী টিম গঠন করা হয়েছিল। এ টিম মাঠ পর্যায়ে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পাহাড়ি ভূমিধসের আশঙ্কার উপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করবে। কিন্তু সে টিমের হদিস আছে কী? তবে এসব সুপারিশের অধিকাংশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ব্যর্থ হলেও পাহাড়ি ভূমিধসে চাপা পড়া লাশ উদ্ধার কিংবা লাশের মিছিলে ছুটে গিয়ে সরকারি দায়িত্বশীলদের অতিমাত্রায় লম্পঝম্ফ ও প্রতিশ্রুতির কোনো অনত্ম থাকে না। বিষয়টি এখন অনেকটা হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাই এখন সময় এসেছে প্রতিশ্রুতি ও লম্পঝম্ফ বন্ধ করে কিছু কাজ করে দেখানোর।
পরিশেষে মিনতি একটাই, দয়া করে নিরাপদে পাহাড়ি বস্তিবাসীদের জীবন রক্ষা করুন। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করুন। এ ধরনের দায়িত্বহীনতার কারণে মৃত্যুর দায়-দায়িত্ব আপনাদের উপরেই বর্তায়। আপনারা এসব জানমাল রক্ষায় আর দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেবেন না। পাহাড়ে বসবাসকারী অসচেতন অশিক্ষিত মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে আপনারাই রক্ষা করতে পারেন। আর তা করবেন এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক
ই-মেইল-newsstore09@yahoo.com