বসন্ত পরবর্তী মিসর পরিস্থিতি

মিসর আবারও অগ্নিগর্ভ। সামরিক অভ্যুত্থানের পর গত শনিবার মিসরে সবচাইতে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়াছে। সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও অভ্যুত্থান সমর্থনকারী এই ত্রিশক্তির সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুড কর্মীদের সংঘর্ষে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দেড় শতাধিক ব্যক্তি প্রাণ হারাইয়াছেন এবং আহত হইয়াছেন চার সহস্রাধিক। গত বুধবার সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি তাহার সমর্থকদের ঘোষিত ‘সন্ত্রাসী’ ব্রাদারহুড কর্মীদের বিরুদ্ধে রাজপথে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানোর পর এই ব্যাপক রক্তপাতের ঘটনা ঘটিল। কায়রোর পূর্ব অংশে অবস্থিত রাবা আল আদাউইয়া মসজিদে অবস্থান গ্রহণকারী ইখওয়ানুল মুসলিমিন সদস্যদের উপর গভীর রাতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করা হইলে সেখানেই অধিকাংশ হতাহতের ঘটনা ঘটে। মিসরের এই পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। ২০১১ সালে শুরু হওয়া আরব বসন্ত মিসরের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর মাধ্যমে ফ্যাকাশে হইয়া গিয়াছে। এখন যাহা চলিতেছে তাহাকে আমরা আরব আষাঢ় বা বর্ষাকাল হিসাবে অভিহিত করিতে পারি। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক ও লৌহমানব হোসনি মোবারকের পতনের পর অনেক নাটকীয়তার মধ্য দিয়া মিসরে বহু কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের শুভ যাত্রা শুরু হয়। পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পশ্চিমাদের নিকট উদার ইসলামপন্থি বলিয়া সাময়িক সার্টিফিকেট অর্জনকারী মুসলিম ব্রাদারহুড বিজয়ী হয়। গণতান্ত্রিক উপায়ে মিসরের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তাহাদের নেতা মোহাম্মদ মুরসি। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক এক বত্সরের মাথায় কার্যত সামরিক হস্তক্ষেপে তাহার পতন হইল। আপাতত দৃষ্টিতে তাহার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি হইল, বিচার বিভাগকে পাশ কাটাইয়া ডিক্রি জারিপূর্বক নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি, সংবিধানকে ইসলামীকরণের চেষ্টা, অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যর্থতা ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে পররাষ্ট্রনীতিতে তথাকথিত ভারসাম্য বজায় রাখিবার জন্য মুরসি রাশিয়া, ইরান, ভারত প্রভৃতি দেশের সহিত সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমে মিসরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের একক প্রভাব বলয়ের বিরুদ্ধে কাজ করিয়াছিলেন। শুরু হইতে তাহার সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করিলেও এমনকি নীতিনির্ধারকদের একটি মহল তাহাকে আজও বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসাবে মানিলেও শক্তিশালী ইসরাইলি লবি তাহার উপর ভরসা রাখিতে পারে নাই। কেননা ফিলিস্তিনের লড়াকু বা জঙ্গি হামাসের সহিত ব্রাদারহুডের সম্পর্কের উষ্ণতা বৃদ্ধি সেই মহলটি সহ্য করিতে পারে নাই। জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের শাসকদের পতনে ব্রাদারহুড উচ্চাভিলাষী ষড়যন্ত্র করে বলিয়া অভিযোগ পাওয়া যায়। ইহার প্রেক্ষিতে ক্ষিপ্ত ও বলবান আন্তর্জাতিক মহল মিসরের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইসলামী দল সালাফাপন্থি আল নূর পার্টি, বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে হাত করিয়া শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সাহায্যে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটাইতে সক্ষম হয়। মোহাম্মদ মুরসির বড় ব্যর্থতা হইল, তিনি তুরস্কের এরদেগান সরকারের ন্যায় বিচক্ষণতা ও প্রকৃত ক্ষমতা হস্তগত করিতে ধৈর্যের পরিচয় দিতে পারেন নাই। এখন প্রতিরোধের শক্তি নিঃশেষ হইয়া গেলে তাহাদেরকে অতীতের ন্যায় বড় ধরনের ধড়-পাকড় ও নির্যাতনের শিকার হইতে পারে। মিসর ইরাক বা আলজেরিয়ার মত গৃহযুদ্ধেরও পরিণতি বরণ করিতে পারে। কিন্তু ভূ-কৌশলগত কারণে এতদঞ্চল অস্থিতিশীল হইলে তাহাতে ক্রীড়নকদের কোন উপকার হইবে না। সুতরাং এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে যে, যাহাতে অনতিবিলম্বে আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সংবিধান দ্রুত সংশোধন করা যায়। এসব প্রক্রিয়ায় ব্রাদারহুডকে শামিল না করা গেলে অশান্তি আরও বাড়িবে বৈকি। মিসরের রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই আরব বসন্তের সূতিকাগার তিউনিসিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়াছে। সেখানেও ব্রাদারহুডপন্থি আল নাহদা ইসলামী সরকার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে পড়িতে পারে। লিবিয়ার রাজনৈতিক অবস্থাও ভাল নহে। মোট কথা, আরব বসন্তের মধ্য দিয়া যে পরিবর্তন আসিয়াছে, তাহা সেইসব দেশে গণতান্ত্রিক শান্তি ও স্থিতির নিশ্চয়তা দিতে পারিতেছে না।