মেধাবী মঞ্চ বনাম কোটা পদ্ধতি
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০১৩, ২২:০৩
৪২ বছর ধরে চেপে থাকা ক্ষোভ সেদিন বহিঃপ্রকাশ হল। পৃথিবীর ইতিহাসে এতটা চরম বৈষম্যের শিকার আর হতে হয়নি কাউকে। আমরা বাঙালি, আমরা সব করতে পারি, প্রতিবাদ যেমন পারি তেমনি পারি ধন্যবাদ ও সহমর্মিতা। ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে পিএসসি যে হোলি খেলা দেখালো তা পৌরাণিক কাহিনীকেও হার মানায়।
বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় একটা মেধাবী ছাত্রের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করতে ২৭ বছর লেগে যায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি আরো ভয়ংকর। এই অল্পসময় নিয়ে তাদের মোকাবিলা করতে হয় স্বল্প পদের চাকরির বাজারে। এই বাজারে আছে মনোপলি, ডুওপলি, নেপুটিজম ও মামা খালু সর্বোপরি রুই-কাতলাদের প্রভাব। ফলে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে আজ চাকরির বাজারে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আবার আছে নিয়োগ কর্তাদের ইচ্ছা মাফিক আচরণ। ব্যাংক ড্রাফট, পে অর্ডার ইত্যাদি সার্ভিস চার্জ দিনে দিনে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তাতে বেকার জীবন হয়ে যাচ্ছে হায় হায় অবস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী কোন ব্যাংক পরীক্ষার ফি নিতে পারবে না, তবে নিলেও তা সাধ্যের মধ্যে, কিন্তু দেখা যায় নির্ধারিত ফির চেয়ে দ্বিগুণ হারে বেকারদের পকেট কাটা যাচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আবার আছে স্পেশাল রিক্রুইটমেন্ট পলিসি। সবচেয়ে বঞ্চিত হয় মানবিক ও সামাজিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন ব্যাংকে একই বিভাগের সমজাতীয় বিষয়ের ডিগ্রিধারীদের বৈষম্য করে পদের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। ফলে একই মানের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীদের আবেদন-যোগ্যতা হারাতে হয়।
আমরা শতকরা ৭৫ নম্বর পেয়েও উত্তীর্ণ হতে পারি না শুধুমাত্র এই কোটা পদ্ধতির জটিলতার জন্য। পিএসসির ইতিহাসে কখনও এতবেশি নাম্বারে প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়া হয়নি বা মনাদন্ড ধরেনি। পর্যালোচনা করে দেখা যায় কোটা পদ্ধতির জন্য অধিকাংশ মেধাবী বাদ পড়ে যায়, যেখানে অতীতে ৬০% নাম্বার পেলে যোগ্যতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট ছিল। আমরা ৪২ বছর কোটা নিয়ে রাস্তায় কোন প্রতিবাদ করি নাই। কিন্তু এবার এতটাই চরম বৈষম্যের শিকার হলাম যে, আমাদের ঘর হতে রাস্তায় আসলাম, শাহাবাগ স্কয়ারে তৈরি করলাম মেধাবীর মুক্ত মঞ্চ।
আমরা কি দোষ করেছি সেখান হতে আমাদের সরকারের লালিত বাহিনী দ্বারা প্রতিরোধ করা হচ্ছে। আমাদের দাবি-দাওয়া কি এতটাই অযৌক্তিক? আমরা ইতিপূর্ব মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের আমলে প্রতিবাদ করেছি কিন্তু কোন লাভ হয়নি, এবার কি হবে তা অনুমেনয়। হুজুরের বিরুদ্ধে কথা বললে হয়ে যায় নাস্তিক, মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে বললে হয়ে যায় রাজাকার, আমরা কোথায় যাব? আমাদের সহজ আন্দোলনকে ব্রান্ড লাগিয়ে দমন করা হচ্ছে।
আমরা মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান করি এবং নারী শিক্ষায় নারীর অবস্থানে পরিবর্তন আসুক-এটাও চাই। আমাদের কোন আক্ষেপ নেই। ৩০% মুক্তিযোদ্ধা, ১০% নারী, ১০% জেলা, ৫% উপজাতি, ১% প্রতিবন্ধি কোটাসহ আরো অদৃশ্য কোটাও আমরা মেনে নিয়েছি। কিন্তু তুমুল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এদের ফ্লাশ লাইট দিয়ে খুঁজে না পেলে অর্থাত্ কোটার সদস্য না পাওয়া গেলে, আমরা যারা সাধারণ তাদের নিয়োগ দিলে কি হয়, এর সদুত্তর অজানা। বছর বছর পদগুলো খালি না রেখে চাকরি প্রদান করলে এতটা অভিযোগ আমাদের ছিল না। আজ আমাদের দাবি উঠছে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের। কোন সরকার কি আমাদের দায়িত্ব নিবে? জানি, নিবে না। বাংলাদেশ জন্মের পর হতে আজও কোন গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি হয়নি। তাই ফি বছর নির্বাচনের সময় সুষ্ঠু নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে চলে দর কষাকষি, আর আমরা বেকার, আমাদের কণ্ঠস্বর তাদের কর্ণকুহরে পৌঁছাবে বৈ কি? একটি জাতির সর্বোচ্চ নিয়োগ পরীক্ষায় যদি কোটায় যায় ৫৬% আর মেধায় ৪৪% তাহলে এই জাতির কি প্রত্যাশা থাকতে পারে।
এদিকে কিছু মহল দাবি করছে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য অতিউত্সাহী কিছু কর্মকর্তা পদলেহী ব্যক্তি দায়ী। কোটার ব্যাপারে কিছু আমলা এতটাই ব্যতিব্যস্ত যেখানে গল্পকাহিনী হার মানায়। রুশো, প্রখ্যাত দার্শনিক, তার জেনারেল উইল থিওরিকে আমরা বাদ দিতে পারি না। সর্বসাধারণের ইচ্ছার প্রতিফলন না ঘটিয়ে কিছুসংখ্যক লোকের চাহিদা মেটানো যেমন গণতন্ত্রের জন্য কাম্য নয়, তেমনি সংখ্যালঘুদের মতামত উপেক্ষা করাও আধুনিক গণতন্ত্রের বা কল্যাণ রাষ্ট্রের লক্ষ্য নয়। তাই আমরা চাই ভারসাম্যমূলক অবস্থা, সঠিক পদ্ধতি। যার যা প্রাপ্য তাকে তা দিয়ে সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
বাংলা একাডেমী যেমন জাতীয় মননের প্রতীক, পিএসসি তেমনি চাকরি প্রার্থীর মননের শ্রেষ্ঠ প্রতীক। এই ব্যবস্থায় যদি মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি আষ্টেপৃষ্ঠে থাকে তাহলে জাতির চালিকা শক্তি ধ্বংস হবে। এক সময় রাষ্ট্র তার নিজস্ব শক্তি হারিয়ে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাম্য নয়। আসুন আমরা ৫৬% কোটা সংস্কার করে মেধাবীকে মূল্যায়ন করি। মুক্তিযুদ্ধকে অবহেলা করছি না, রাষ্ট্র তাদের অনেক সুবিধা দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাদের কোটা এতটা হওয়ার কথা নয়। যা আমাদের আরেক লজ্জা। লালিত বাহিনী দিয়ে কখন দমন সম্ভব নয়, কালের যাত্রায় বৈষম্য বেড়ে গেলে তা গণতন্ত্রের জন্যই হুমকি স্বরূপ।
লেখক :রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, কবি জসিমউদ্দীন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Email: imamhalan511@gmail.com