সাংবিধানিক তাগিদ ও বৈষম্য প্রতিরোধ

বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, নানা বাধাবিপত্তি ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এর প্রবৃদ্ধি হারের প্রবণতা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠছে (২০০৮-০৯ থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত বিগত ৫ বছরে গড়ে ৬.১৭ শতাংশ) এবং এর চেয়েও বড় কথা হচ্ছে যে, স্বল্প মেয়াদে শুধু পরিবেশের বৈরিতাটুকুকে একটি চলনসই মাত্রায় নিয়ে আসতে পারলে প্রবৃদ্ধির এ হার সহসাই ৭ শতাংশকে ছাড়িয়ে যাবে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। আর সার্বিক বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে ২০২১ সালের আগেই সেটিকে ১০ শতাংশের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলেও অনেকেই মনে করেন। অর্থনীতির এরূপ একটি পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধি হারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় পরিতৃপ্ত না হলেও অতীত অভিজ্ঞতার বিবেচনায় আপাতদৃষ্টে সন্তোষ ব্যক্ত করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে এই উচ্চতর প্রবৃদ্ধি হারের বিপরীতে একটি বড় ধরনের সঙ্কটের আশঙ্কাও কিন্তু দেশে দিনে দিনে প্রবল হয়ে উঠছে এবং সেটি হচ্ছে সমাজে আয় বৈষম্যের ধারা ক্রমাগতভাবে স্ফীত হয়ে উঠা। এখন কথা হচ্ছে, গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির উপায় কী ? জবাবে সাধারণভাবে হয়তো বলা হবে বা অনেকে তা বলেও থাকেন যে, শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও যেহেতু এ শিল্পের প্রসারের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে, সেহেতু গ্রামাঞ্চলে বাড়তি ঋণ ও বিপণন সুবিধা সৃষ্টি করতে পারলেই সেখানে এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। এটি একটি খুবই সরলীকৃত ধারণা এবং এর বাস্তব কার্যকারিতাও অত্যন্ত নগণ্য। পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অকৃষি খাতে, তা সেটি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কিংবা অন্য যা কিছুই হোক না কেন, লাভজনক বিনিয়োগের জন্য পুঁজি ও বিপণন সুবিধার চেয়েও এখন অধিক জরুরি হচ্ছে অবকাঠামোগত পরিস্থিতির উন্নয়ন। বিদ্যুতের শতভাগ নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না হোক (যা হয়তো সহসা সম্ভবও নয়) রাজধানীর সমপর্যায়ে সেটিকে নিয়ে আসতে হবে। নইলে অসম উত্পাদন খরচের ধকল কাটিয়ে ঐসব শিল্পে উত্পাদিত পণ্যের পক্ষে বাজার প্রতিযোগিতায় কিছুতেই টিকে থাকা সম্ভব নয়; এমনকি তা যদি শুধু দেশের বাজার হয় তবুও নয়। কারণ বাজারের অবস্থানটি দেশে হলেও অর্থনৈতিক উদারীকরণের বৈশ্বিক বাস্তবতায় এখানে এখন সব দেশের পণ্যেরই অবাধ বিচরণ। ফলে প্রতিযোগিতাটি আসলে প্রকারান্তরে বিশ্ব বাজারের সংগে, যা মোকাবিলা করতে পারাটা সহজ নয় মোটেও, গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পক্ষে তো নয়ই। তবু আশার কথা যে, এরপরও আমাদের নতুন উদ্যোক্তাদের অনেকেই সেখানে নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করছেন। কিন্তু এই ভালো করাটাকে ধারাবাহিকভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে বর্তমানের বৈষম্যমূলক প্রণোদনা কাঠামোর ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার সাধন খুবই জরুরি। দেশে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিস্তার ঘটানোর ক্ষেত্রে পণ্য বাছাই, পণ্যের বহুমুখীকরণ ও এসবের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরের মানোন্নয়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত শুধু গতানুগতিক ধারার পণ্য উত্পাদন করলেই চলবে না, এসব পণ্যের ব্যাপক বহুমুখীকরণও ঘটাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ জামদানিকে শুধু শাড়িবস্ত্রের সীমানার মধ্যে আটকে রাখা যাবে না, এটিকে নারী-পুরুষ সকলেরই ব্যবহারোপযোগী নানা মাত্রার পরিধেয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অন্যদিকে এটি এখন মূলত দক্ষিণ এশীয় দেশকেন্দ্রিক বস্ত্র। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে এটিকে একটি সমৃদ্ধ খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হলে দেশ বা অঞ্চলের সীমানা পেরিয়ে একে বিশ্বজনীন ব্যবহারোপযোগী পণ্যের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে এবং অন্য ক্ষেত্রের প্রমাণিত অভিজ্ঞতার আলোকে বলি, এটি খুবই সম্ভব। আর তা সম্ভব বলেই প্রস্তাব করতে চাই যে, কোন্ জাতীয় পণ্যের কি কি ধরনের বহুমুখীকরণ হতে পারে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানই সে ব্যাপারে উদ্যোক্তাদেরকে ধারণা ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করবে। তাদের পক্ষে একসাথে হয়তো সব পণ্যের জন্য এ ধরনের পরামর্শমূলক তালিকা প্রণয়ন করা সম্ভব হবে না। কিন্তু অগ্রাধিকারভিত্তিতে ও ক্রমান্বয়ে এ ধারণাটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অবশ্যই সম্ভব বলে মনে করি। তৃতীয়ত পণ্য বাছাই ও তার বহুমুখীকরণের পাশাপাশি এসবের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরের একটি মানোন্নয়ন ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে, যেটি গড়ে তোলার সামর্থ্য ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের অধিকাংশ উদ্যোক্তারই নেই। এক্ষেত্রেও উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যেতে পারে। গ্রামের যে কুমার এতকাল ধরে মিষ্টি ও দইয়ের হাঁড়ি হিসেবে ব্যবহারের জন্য মৃত্পাত্র তৈরি করে আসছিল, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় সেটিকে আর কিছুতেই প্রচলিত ধাঁচে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তবে এর মানোন্নয়ন ঘটিয়ে একে যদি চাকচিক্যময় Glazed Potteryতে রূপান্তর করা যায়, তাহলে সে কুমারকে পেছনে ফেলে রাখতো সে সাধ্য কার! বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের গুরুত্বের বিষয়টি নিয়ে নানাভাবেই কথা হয় এবং এ গুরুত্বের বিষয়টিকে কেউই অস্বীকার করেন না। রাষ্ট্রের নীতি- নির্ধারণীমূলক দলিলপত্রেও এর স্বীকৃতি পাওয়া যায়। সরকারের শিল্পনীতি থেকে শুরু করে বাজেটের প্রণোদনা কাঠামো হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা উপদেশ ও নির্েদশনা পর্যন্ত সর্বত্রই এ খাতের প্রতি এক ধরনের সহানুভূতির সুর খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে দলিলপত্রের এসব ঘোষণা ও নীতি-নির্দেশনা বাস্তবে কতটা প্রয়োগ হয় সেটাই দেখার বিষয়। লক্ষণীয় যে, বহুক্ষেত্রে সে প্রয়োগ তো হয়ই না, বরং এসব ঘোষিত সুবিধা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা যাদের উদ্দেশে করা, তাদের অজান্তেই সেগুলো ভাগ হয়ে যাচ্ছে চতুর সুবিধাভোগীদের দ্বারা। আর এতে করে দেশে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেও পাশাপাশি বাড়ছে বৈষম্যও, যেটি মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনার শুধু পরিপন্থিই নয়, একই সঙ্গে এ পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতিকে সেই আঙ্গিকে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও ঝুঁকিপূর্ণ এবং সে ঝুঁকি এড়াতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে দক্ষ ও সমপ্রসারিত সেবাদান ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেমন জরুরি, তেমনি এটি আমাদের একটি সাংবিধানিক দায়ও। আর সংবিধানের দায়ের সাথে নৈতিকতার দায় যুক্ত হলে এ খাতই যে বাংলাদেশের নিকট ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে নেতৃত্বদানে সক্ষম হবে, তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। লেখক:পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন atkhan56@gmail.com