মৃত্যুর সাথে বসবাস

পাহাড় ধসিয়া মৃত্যুই যেন নিয়তি হইয়া দাঁড়াইয়াছে তাহাদের। মৃত্যুর এই মিছিলে এইবার শরিক হইয়াছেন একই পরিবারের হতভাগ্য দুই নারী। সম্পর্কে মা ও মেয়ে। ঘুমন্ত অবস্থায় জীবন্ত সমাধি হইয়াছে তাহাদের। বড়ো করুণ, বড়োই মর্মান্তিক এই মৃত্যু। চট্টগ্রামের লালখান বাজারে ওয়াসার মালিকানাধীন পাহাড়ের পাদদেশে মৃত্যুফাঁদতুল্য সারি সারি ঝুপড়ি বানাইয়া যাহারা রমরমা বাণিজ্য চালাইয়া যাইতেছেন—তাহারা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টাও নাকি করিয়াছিলেন। কিন্তু সফলকাম হন নাই। তবে অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, এই মৃত্যু অপ্রত্যাশিত ছিল না। প্রশাসন সতর্ক ছিল। যথাসাধ্য চেষ্টাও চালাইয়াছিল তাহারা। বর্ষা মৌসুমের শুরু হইতেই ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ে বা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত পরিবারগুলিকে সতর্ক করা হইয়াছে। অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রও নির্মাণ করা হইয়াছিল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ হইতে। কিন্তু খুব একটা সাড়া পাওয়া যায় নাই। অল্প কিছু পরিবার আশ্রয় কেন্দ্রে আসিলেও অতিদ্রুত তাহারা আবার ফিরিয়া গিয়াছে সেই মৃত্যুপুরীতে। প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা যে ঘটিতে পারে ইহা তাহারা জানিতেন। আবার সরকারি জমি দখল করিয়া কিংবা নিজের জমিতে বৈধ বা অবৈধভাবে যাহারা মৃত্যুর কারখানা খুলিয়া বসিয়াছেন—তাহাদেরকেও নির্বোধ ভাবিবার কোনো অবকাশ নাই। অতএব, সকলের জ্ঞাতসারেই যে অনভিপ্রেত মৃত্যুর এই মিছিল দীর্ঘ হইয়া চলিয়াছে— তাহা অনস্বীকার্য। তবে উভয়ের মধ্যে তফাত্ দুস্তর। অনেকটা শিকার ও শিকারীর মতো। এক পক্ষ চরম দারিদ্র্যের কারণে অনন্যোপায় হইয়া মৃত্যুর সাথে বসবাস করিতেছেন, অন্যপক্ষ তাহাদের অসহায়তাকে পুঁজি করিয়া বিত্তের পাহাড় গড়িতেছেন। বস্তুত অন্য সকল মৃত্যুর মতো পাহাড় ধসিয়া মৃত্যুও আমাদের গা-সহা হইয়া গিয়াছে। তবে পাঁচ বত্সর আগে চট্টগ্রামে একসাথে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনাটি না ঘটিলে হয়তো ইহা লইয়া কেহই মাথা ঘামাইত না। মর্মান্তিক সেই পাহাড় ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রাণ হারাইয়াছিল ১২৬ জন মানুষ। তাহাদের অধিকাংশ ছিল নারী ও শিশু। ইহার পর যথারীতি ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ শুরু হইয়াছিল। গঠিত হইয়াছিল একাধিক তদন্ত কমিটি। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত শক্তিশালী একটি কমিটি এই বিপর্যয়ের জন্য সরাসরি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে দায়ী করিয়াছিল। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছিল যে, তাহারা নিজেরা যেমন নির্বিচারে পাহাড় নিধন করিয়াছে, তেমনি ভূমিদস্যুদেরও সুযোগ করিয়া দিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, পাহাড় নিধন করিয়া সেইখানে অবৈধভাবে যেইসব ঝুপড়ি নির্মিত হইয়াছে—তাহার নেপথ্যে কাহারা কলকাঠি নাড়িতেছে তাহাও অস্পষ্ট ছিল না সেই প্রতিবেদনে। বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি রোধে তদন্ত কমিটি ৩৬ দফা সুপারিশও পেশ করিয়াছিল। কিন্তু বেশিরভাগ সুপারিশই বাস্তবায়িত হয় নাই। ফলে যাহা হইবার তাহাই হইতেছে। নিয়মিতই ঘটিতেছে দুর্ভাগ্যজনক প্রাণহানির ঘটনা। সর্বশেষ গত বত্সরের জুনে পাহাড় ধসিয়া আবারও ৮৫ জনের মৃত্যু হইয়াছে চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজারে। অবস্থা এমন দাঁড়াইয়াছে যে, গুরুতর বিপর্যয় ঘটিলেই কেবল নীতিনির্ধারকরা নড়িয়া-চড়িয়া বসেন। নানা প্রতিশ্রুতির ফানুস উড়ান। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। আর কর্তৃপক্ষের এই উদাসীনতার বলি হইতে হয় ফাতেমা-কুলসুমার মতো নিরপরাধ ও অসহায় মানুষকে। ঐতিহ্যগতভাবে এই দেশের মানুষ সংগ্রামী। বংশপরম্পরায় বৈরী প্রকৃতির সাথে লড়াই করিয়াই টিকিয়া আছে তাহারা। কদাচিত্ হয়তো সরকারি সহায়তা জুটিয়াছে, কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই নিজেদের শক্তি, সাহস ও সামর্থ্যের উপর ভরসা করিয়াই তাহাদের জীবনধারণ করিতে হইয়াছে। স্বাধীনতাপরবর্তীকালে সরকারি সহায়তা বাড়িয়াছে সত্য, কিন্তু উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষকে যে এখনও নিরন্তর মৃত্যুর সাথে বসবাস করিতে হয়—তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। কার্যকরভাবে দারিদ্র্য বিমোচন ও জীবনমান উন্নয়ন করা না গেলে এই অবস্থার খুব একটা হেরফের হইবে বলিয়া মনে হয় না। আর হতদরিদ্র মানুষের এই অসহায়তার সুযোগে জীবন লইয়া যাহারা ব্যবসা ফাঁদিয়া বসিয়াছে তাহাদের আইনের আওতায় আনা না গেলে আইনের শাসনই প্রশ্নবিদ্ধ হইয়া পড়ে। নীতিনির্ধারকেরা যে বিষয়টি জানেন না এমনও নহে। কিন্তু সরিষার মধ্যেই যদি ভূত থাকে—সেই ভূত তাড়াইবে কে?