দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির লবণাক্ততা প্রসঙ্গে
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০১৩, ২১:৪৬
জীবন ধারণের জন্য পানি জীবন নামেরই সমার্থক। জীবনরক্ষার এই পানি যদি বিশুদ্ধ না হয়, তবে তাহাই মরণের কারণ হইয়া ওঠে। আমাদের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদ এক্ষণে সেই মরণের কারণ হইয়া উঠিয়াছে। তাহার মূল অনুষঙ্গ লবণ। এই সকল অঞ্চলে পানির লবণাক্ততা এতোটাই বাড়িয়া গিয়াছে যে, সেখানে অর্ধেকের বেশি রোগব্যাধির প্রভাবক হিসাবে দায়ী করা হইয়াছে পানির এই লবণাক্ততাকে। এই অঞ্চলের ১৮টি জেলার ৯৩টি উপজেলায় লবণাক্ততাজনিত যে ভয়াবহ চিত্র সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছে তাহা বৃহত্তর বিপন্নতার প্রাথমিক সতর্ক সংকেত দিতেছে মাত্র।
লবণ হইল ওষুধের মতো, মাত্রা কম হইলেও বিপদ, বেশি হইলেও বিপদ। মাত্রা বেশির কারণে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতা, লিভারের নানা অসুখ, ডায়রিয়াসহ বিবিধ রোগের মারণ জনপদে পরিণত হইয়াছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। এই অঞ্চলে অগভীর নলকূপসহ অসংখ্য মিঠা পানির জলাশয় বহুলাংশেই লবণাক্ত হইয়া পড়িয়াছে। ফলে যেখানে প্রতিদিন মাত্র ৫ গ্রাম লবণ আমাদের শরীরের জন্য স্বাভাবিক, সেখানে এই অঞ্চলের মানুষ প্রায় ১৬ গ্রাম লবণ গ্রহণ করিয়া থাকে পানীয় জলের ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে। শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নহে, আমাদের পুরো উপকূলীয় অঞ্চল কমবেশি এই সমস্যায় আক্রান্ত।
এই ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার বড় একটি কারণ জলবায়ুর পরিবর্তন। উপকূলীয় অঞ্চলে অস্বাভাবিক জোয়ার ও তুলনামূলক অধিকহারে সংঘটিত ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হইয়া উঠিতেছে। বিশ্বের কার্বন নি:সরণের পরিমাণ বর্তমানে যে হারে বাড়িতেছে, তাহা অব্যাহত থাকিলে ২০৯০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা চার ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়া যাইবে। ইহার ফলে আমাদের উপকূলের ৪০ শতাংশ ফসলি জমি শুধু বিলীন হইবে না, বিদম্যান মাটি ও পানির লবণাক্ততা এমন পর্যায়ে উপনীত হইবে যে, ক্ষতিগ্রস্ত হইবে এই অঞ্চলের কৃষিকাজ। লবণসহিষ্ণু জাতের বীজসমূহও লবণের ওই তীব্র মাত্রা সইতে পারিবে না। বিপন্ন হইবে কয়েক কোটি মানুষের স্বাস্থ্য। সেই বিপন্নতার প্রাথমিক চিত্র এইক্ষণে আমরা এক ঝলক দেখিতেছি মাত্র।
গভীর নলকূপ বসাইয়া অনেক ক্ষেত্রে মিঠা পানির সংস্থান মেটানো সম্ভব, কিন্তু তাহা সর্বব্যাপী, সাশ্রয়ী ও স্থায়ী সমাধান নহে। সাধারণ সচেতনতার মাধ্যমে সহজ ও সাশ্রয়ী উপায়ে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ঘরে ঘরে গড়িয়া তোলা যাইতে পারে। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় আমরা এর আদর্শ উদাহরণ দেখিয়াছি। সেইখানে মাটির নিচে নিরেট পাথর থাকায় গভীর অগভীর—কোনো নলকূপই বসানো সম্ভব হয় না। বৃষ্টির পানি বড় একটি ভরসা সেইখানে। দুইটি টিনের চালের মধ্যিখানে পাইপ দিয়া বৃষ্টির পানি বড় আধারে জমা করা যায়। তারপর সাধারণ ফিল্টারের তিনটি স্তর পার করিয়া বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণ করা যায় আড়াই হইতে তিন হাজার লিটার পর্যন্ত। তাহাছাড়া আরো সহজ উপায় উদ্ভাবন করিবার চেষ্টা দরকার।
আমাদের দেশে জনসংখ্যাকে জনসম্পদ রূপে ব্যবহার করিতে হইলে তুলনামূলক সহজে সমাধানযোগ্য স্বাস্থ্যবিপন্নতা হইতে মুক্তি পাইবার দিকটি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হইবে। সেই কারণে আরো একটি বিষয়ে সচেতনতা বাড়াইতে হইবে লবণাক্ততা-প্রবণ অঞ্চলের মানুষকে। তাহা হইল, খাদ্যের সহিত বাড়তি লবণ গ্রহণ। ইহা যথাসম্ভব হ্রাস করিতে হইবে। একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জানা গিয়াছে, অধিক লবণ গ্রহণ এক ধরনের নেশা। পানীয় জলের মাধ্যমে এমনিতেই শরীরে লবণ প্রবেশ করিতেছে, সুতরাং, রান্না কিংবা অন্য কোনোভাবে বাড়তি লবণের ব্যবহার কমানোর সহজ সচেতনতাও ওই অঞ্চলে লবণ-জনিত রোগের প্রাদুর্ভাব কমাইতে সাহায্য করিবে নিঃসন্দেহে।
বিপুল জনগোষ্ঠীর এই সমস্যা হইতে মুক্তি পাইতে হইলে সরকার, এনজিও ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এক্ষণে অতি জরুরি।