ঈদে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য

চাঁদাবাজি একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু ঈদ যত নিকটে আসিতে থাকে, ততই হরেক রকমের চাঁদাবাজরা সংযমের মাসে সংযমের বাঁধ ভাঙিবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এই চিত্র চিরাচরিত, বত্সর ভেদে একটু উনিশ-বিশ হয় মাত্র। এইবারও আমরা দেখিতে-শুনিতে পাইতেছি চাঁদাবাজদের চাঁদের হাট বসাইবার কাহিনী। রাজধানীসহ সারাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে এক রমরমা উত্সব চলিতেছে এই চাঁদাবাজি লইয়া। সড়ক- মহাসড়ক-ফুটপাত, মার্কেট, কাঁচাবাজার, লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, বাস টার্মিনাল—কোথায় নাই এই চাঁদের হাটের দৃশ্য? পাড়ার ছিঁচকে সন্ত্রাসী হইতে শুরু করিয়া কোথাও-কোথাও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙাইয়াও চাঁদাবাজি চলিতেছে। অভিযোগের খড়্গ হইতে পিছাইয়া নাই পুলিশ এবং পলিটিক্যাল ক্যাডাররাও। ক্ষুদ্র দোকানীদের নিকট হইতে ‘তোলা’ আদায়ের লক্ষ্যে রমজান শুরুর পূর্বেই প্রায় শত কোটি টাকায় বিক্রি হইয়াছে রাজধানীর ফুটপাত। পলিটিক্যাল ক্যাডারদের সঙ্গে এইখানে ভাগ বসাইয়াছে ফুটপাত দেখভালের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশনের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তাও। বড় মূল্যবান ও তাত্পর্যময় চাঁদার এই লেনদেন। চাঁদাবাজি শুনিলেই আমরা চাঁদাবাজদের ব্যাপারে একপেশে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করি। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই চাঁদাবাজি হয় এক ধরনের ‘গিভ এন্ড টেক’ অথবা অন্যায় অনিয়মের বাড়তি মাশুল হিসাবে। ফুটপাতে বসিবার নিয়ম নাই, যাহারা এইখানে বসিবার ‘সিস্টেম’ করিয়া দেন কোনো ক্ষুদ্র বিক্রেতাকে, তাহারা ওই সকল বিক্রেতার নিকট হইতে নির্দিষ্ট ‘তোলা’ নেন। তাহা বিক্রেতার জন্য কখনই আপত্তির নহে। কেননা, এই ‘সিস্টেম’ই তাহাকে ব্যবসার সুযোগ দিয়াছে। সুতরাং সিস্টেমের জন্য কিছু খরচ তো করিতেই হইবে। এই ক্ষেত্রে চাঁদাদাতা ও গ্রহীতা উভয়ই অবৈধ ও নিয়ম বর্হিভূত কাজ করিতেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই চাঁদাদাতা অপরাধের দোসর নহেন। আপনি হয়তো ব্যবসায় অধিক মুনাফা করিয়াছেন, এবং আপনি নিপাট ভদ্রলোক—এই তথ্য চাঁদাবাজের নিকট গোপন নাই আর। সুতরাং সেই মুনাফায় অল্পবিস্তর ভাগ বসাইতে তাহারা তত্পর হইবে, ইহা বিচিত্র নহে। এইখানে চাঁদাবাজকে শিকারী বলিলে চাঁদাদাতা হইলেন শিকার। শিকার-শিকারীর চিরন্তন নিয়ম এইখানেও দৃশ্যমান। কোনো রক্ষকবচ কাজ না করিলে নিরূপায় হইয়া তিনি চাঁদাবাজের সহিত একটি সমঝোতায় আসেন। ঈদে তাহার মাত্রা ও ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পায় মাত্র। যেমন গত দুই সপ্তাহে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় চাঁদা দাবির অভিযোগে দুই শতাধিক সাধারণ ডায়েরি হইয়াছে। ব্যবসায়ী, সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবী, কণ্ঠশিল্পীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব সাধারণ ডায়েরি করিয়াছেন। এইসব ঘটনায় পুলিশও প্রায় অর্ধশত চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করিয়াছে। তবে অভিযোগ রহিয়াছে, পুলিশের কাছে জানাইলে ক্ষেত্রবিশেষে হিতে বিপরীত হয়, চাঁদার অঙ্ক আরো বাড়িয়া যায়। অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশও কোনো সুরাহা করিতে পারে না। আবার মহাসড়কে বিভিন্ন পয়েন্টে পণ্যবাহী ট্রাকগুলো হইতে চাঁদা আদায় করে স্বয়ং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রশ্ন হইল, চাঁদা চাহিলেই কেন ট্রাকগুলোকে টাকা দিতে হইবে? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর কোনো না দোষত্রুটি কিংবা দুর্বলতা রহিয়াছে। হয়তো নিয়মের বাহিরে অধিক পরিমাণ পণ্যবহন করা হইতেছে, কিংবা কাগজপত্র ঠিক নাই, অথবা পণ্যের ভিতরেই ‘সমস্যা’ রহিয়াছে, কিংবা পণ্যের আড়ালে রহিয়াছে কোনো মাদকদ্রব্য। সুতরাং উভয়পক্ষ একটি সমঝোতায় আসে এই চাঁদার মাধ্যমে। কোনো সরকারি স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রেও নানা প্রভাবশালী সংগঠনের কর্মীদের চাঁদাবাজি করিতে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ওই নির্মাণ বাজেটের ২ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয় চাঁদা প্রদানের কাজে। তবে সেই টাকা ঠিকাদার সংস্থা ঠিকই ম্যানেজ করিয়া লয় ভবনের মান ও নির্মাণসামগ্রীর সহিত আপস করিয়া, যেমনটি আমরা দেখি পণ্যবাহী ট্রাকের উপর চাঁদাবাজির ক্ষেত্রেও। সেখানে চাঁদার পরিমাণ বাড়িয়া গেলে তাহার প্রভাব পড়ে পণ্যদ্রব্যের মূল্যের উপর এবং তাহার মাশুল দিতে হয় সাধারণ ক্রেতাদেরকেই। তাহা হইলে মুক্তির উপায় কী? আমরা মনে করি আইনের শাসন যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা হইলেই একমাত্র এই চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য হ্রাস পাইতে পারে, নচেত্ এই সিলসিলা চলিতেই থাকিবে।