[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

কোন দিকে যাচ্ছে মিসরের পরিস্থিতি

ভিক্টোরিয়ান যুগের প্রতিনিধিত্বকারী কবি ররার্ট ব্রাউনিং তাঁর ‘দ্যা পেট্রিয়ট’ কবিতায় বলেছেন, মানুষ অধিকাংশ সময়ই আবেগের দ্বারা তাড়িত হয়ে কাজ করে, সেখানে যুক্তির স্থান কমই থাকে। কোন একজন নেতাকে মানুষ অভাবনীয়ভাবে স্বাগতম জানায়, তার জন্য অসম্ভব কিছু করতেও প্রস্তুত থাকে, যেমন আকাশ থেকে সূর্যকে এনে দেওয়ার মতো কাজও তারা করতে চায় । মানুষ জানে যে, একজন মানুষের পক্ষে কি করা সম্ভব, তারপরেও তারা গডের মতো একজন নেতাকে মনে করে। অথচ মাত্র এক বছর পরেই ঐ একই নেতাকে তারা আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে, বন্দী করে, তার দিকে থুথু মারে। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে তারা কেন এরূপ আচরণ করে তা তারা নিজেরাই জানে না অর্থাত্ আবেগের দ্বারা তারা পরিচালিত হয় বলেই মানুষ এ ধরনের কাজ করে থাকে। বিশ্বের অনেক দেশের নেতার ক্ষেত্রেই একই ঘটনা ঘটেছে । মিসরের জনগণ সারা জীবনই সামরিক বাহিনীর যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার পর স্বল্প সময়ের জন্য তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলো, কিন্তু রক্ষা করতে পারলো না। আমাদের দেশে একটি প্রবাদ আছে, ‘গরীবের পেটে ঘি-ভাত সহ্য হয় না।’ আরব কান্ট্রিগুলো, সেটি মধ্যপ্রাচ্যেই হোক আর আফ্রিকাতেই হোক, গণতন্ত্রের স্বাদ বা মূল্য তারা সম্ভবত বুঝে না বা বুঝার চেষ্টা করে না। রাজতন্ত্র আর উর্দি বাহিনীর হাতেই ক্ষমতা দিতে এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত হতেই যেন তারা স্বচ্ছন্দ বোধ করে বেশি। আর তাই মিসরীয়দের জীবনে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের পতন তারা ঘটিয়েছে সেনাবাহিনীর সহায়তায়। মুরসির বিরোধীরা ভাবছে সেনাবাহিনী তাদের বন্ধু, কিন্তু তারা মনে করে না এই সেনাবাহিনী জগদ্দল পাথরের মতো তাদের রাষ্ট্রক্ষমতাসহ পর্যটন, শিল্প, নির্মাণ, হাউজিংসহ রাষ্ট্রীয় মোক্ষম অর্থনৈতিক খাত নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। মিসরের প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থনীতি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার অবশ্যই সেনাবাহিনীর এই নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই শিথিল করবে আর সেনাবাহিনী তা কখনও চাবে না। তাই তারা মুরসি বিরোধীদের ক্ষেপিয়ে দিয়েছে এই বলে যে, মুরসি দেশে ইসলামতন্ত্র চালু করছে অর্থাত্ মিসরের জনগণকে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকতে হবে। বিশ্ববাসীকেও তাই বুঝিয়েছে। কিন্তু মিসরের জনগণ সেনাবাহিনীর এই চাল বুঝল না যে, তাদের গণতন্ত্র ছিনতাই করতে চাচ্ছে সেনাবাহিনী এবং করেছেও তাই আর তার বিনিময় হচ্ছে বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি, রক্তারক্তি, খুন, জখম, গণহত্যা প্রতিদিন। মিসরের জনগণ কি এটাই চেয়েছিলো? গত ৮ জুলাই ভোরে কায়রোয় প্রেসিডেনশিয়াল গার্ডের সদর দপ্তরে সংঘটিত হয়েছে সহিংসতা আর তা জানান দিয়ে গেল যে, দেশটির স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ সহজ নয়। ঐদিন নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মারা যায় সদ্য ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির ৫৩জন সমর্থক। মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থিত মুরসির পদত্যাগের দবিতে রাজপথে নামা বিরোধীদের পক্ষ নিয়ে অভ্যুত্থান ঘটায় সেনাবাহিনী। এতে মুরসি বিরোধীদের কাছে ব্যাপকভাবে নন্দিত হয় সেনাবাহিনী। কিন্তু ইসলামপন্থি মুরসি সমর্থকরা সেনাবাহিনীর ভূমিকাকে কোনভাবেই মেনে নিচ্ছে না। ফলে মুরসির সমর্থক এবং বিরোধীদের মধ্যে ক্রমশ সংঘাত বাড়ছে। মুরসিকে স্বপদে বহাল না করা পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার হুমকি দিয়েছে মুরসিপন্থিরা। এ অবস্থায় সেনাবাহিনী ও মুরসি বিরোধী উভয়ের ঘোষণা অনুযায়ী সব পক্ষের অংশগ্রহণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একটি ইসলামপন্থি দলও যদি সরকারে যোগ না দেয় তবে সরকার গঠন সম্ভব হবে না। যে পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন মুরসি তা নিয়ে তোলা আপত্তির বৈধতা আছে হয়তো, কিন্তু তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক অঙ্গনে সেনাবহিনীকে নাক গলানোর সুযোগ করে দেওয়ায়, মিসরীয়দের তার ফল ভোগ করতেই হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হাজেম আল-বেবলওয়ি বলেছেন, যোগ্য হলে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থীকেও মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়ার চিন্তা আছে তার। এর অর্থ হচ্ছে মুসলিম ব্রাদারহুডের মধ্যে ভাঙ্গন ধরানো, সেটি সেনাসমর্থিত সরকার এখনও পারেনি। এদিকে পুলিশ মুরসি সমর্থকদের ধড়-পাকড়ে মাঠে নেমেছে। ব্রাদারহুডের সর্বোচ্চ নেতা মোহাম্মদ বাদিসহ ২০০ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি করা হয়েছে। মিসরের চলমান অস্থিরতার মধ্যেই আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কায়রোকে এফ-১৬ মডেলের ৪টি যুদ্ধবিমান সরবরাহ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া চুক্তি অনুযায়ী মিসরকে জি ২০ যুদ্ধবিমান দেওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের। জানুয়ারিতে ৮টি পাঠানো হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় ৪টি পাঠানো হচ্ছে। বাকি ৮টি বছরের শেষে পাঠানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্পস্ট ভূমিকার কথা সহজেই বুঝা যাচ্ছে না। সরকারের হুমকি উপেক্ষা করে নিজেদের অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির সমর্থকরা। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে শতাধিক সমর্থকের মৃুত্যুর পরও গত ২৭ জুলাই রাবা আল আদাওইয়া সমজিদ চত্বরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমাতচ্যুত মুরসিকে পুনর্বহালের দাবিতে ওই মসজিদে টানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে তার সমর্থক তথা মুসলিম ব্রাদারহুডের কর্মীরা। তারা তাদের কষ্টার্জিত গণতন্ত্রকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিতে চাচ্ছে না কোনভাবেই। ২৭ জুলাইয়ের ঘটনার পর দেশের ভেতর এবং বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে মিসরের সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার। ঐদিন সংঘর্ষে কমপক্ষে ৭২জন মানুষ মারা গেছে। এ ছাড়া আলেকজান্দ্রিয়ায় গত ২৬ জুলাই মুরসি সমর্থক এবং বিরোধী দলের মধ্যে সংঘর্ষে ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ২৭ তারিখের ঘটনাকে ’নির্মম গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন মুসলিম ব্রাদারহুড। তারা রাতভর বিক্ষোভকারীদের মনোবল বাড়াতে বক্তৃতা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও ২৭ তারিখের ঘটনায় ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বনা জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ক্যাথরিন অ্যাশটন, ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউলিয়াম হেগও এতে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ এলবারাদিও এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা হচ্ছে বিরোধীদের প্রতি। এর অর্থ হচ্ছে সরকারের ভেতরেও এই ঘটনা নিয়ে বিভক্তি আছে। আল আযহার মসজিদের প্রধান ইমাম শেখ আহমেদ আল-তায়িব সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের আহবান জানিয়েছেন। ২০১১ সালের শুরুর দিকে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন হোসনি মোবারক। গত বছরের ২ জুন তার যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। তিনি তোরাহ কারাগারে আছেন। মুরসিকেও সম্ভবত সেখানে হস্তান্তর করা হতে পারে। তবে বর্তমানে তিনি কোথায় কি অবস্থায় আছেন তা এখনও সঠিক করে বলা হচ্ছে না। প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সিদ্ধান্তকে সঠিক হয়েছে বলছেন সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ এল সিসি। তার দাবি জনগণের ভোটের অমর্যাদা করেছেন ইসলামপন্থি মুরসি। তাই জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে তাকে সরিয়ে দিতে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করেছে। তিনি বলেন, ৩০ জুন গণবিক্ষোভের জনগণের দাবি আমলে নিয়ে গণভোট দিতে অস্বীকৃতি জানান মুরসি। সিসি বলেন, ‘জনগণের আদেশ মান্য করা সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব, জনগণকে আদেশ দেওয়া নয়। সশস্ত্র বাহিনী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে কারণ সেনাবাহিনীর কাছে জনগণ তাই দাবি করেছিলো।’ তিনি আরও বলেন মিসরের জনগণের এই উপলব্ধি আছে যে, বিচ্যুতি থেকে কোন কিছুকে সঠিক অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে পারে একমাত্র সেনাবাহিনী। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করবে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি না সেনাবাহিনী? এত বছর দেশটি কারা শাসন করতো? সেনাবাহিনী না নির্বাচিত প্রতিনিধি? ১৬ জুলাই মুরসির সমর্থকদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে ৭ জন মারা গেছে, আহত হয়েছে ২৬১। ৪০১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মুরসির অপসারণের পর গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থায় উত্তরণে মিসরের সামনে ‘দ্বিতীয় সুযোগ’ এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্র বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারী বিল বার্নস। দেশটির চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিভাজিত রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে আলোচনায় বসার আহবান জানিয়েছেন তিনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রথম করণীয় হবে অবশ্যই সহিংসতা বন্ধ করা। জেল-জুলমের পথ পরিহার করা এবং রাজনৈতিক সব পক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে দরকার আন্তরিক ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা। কিন্তু সংঘাত বেড়েই চলছে। সেনাসমর্থিত সরকারের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহম্মদ মুরসির সমর্থকেরা। তারা কায়রোতে সেনা গোয়েন্দা সদর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিমানবন্দর অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলে নিয়ে যান। তারা দেশ জুড়ে নিরাপত্তা ভবন ঘেরাও করতেও সমর্থকদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। এদিকে সেনাসমর্থিত সরকার বলেছে সীমা লংঘন করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বেসরকারি নাগরিকদের গ্রেফতার করতে প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা দিয়েছে। সেনাবাহিনী এবং জনগণকে একেবারে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। কোন পক্ষ এখানে জয়ী বা লাভবান হবে? নিশ্চয়ই সেনাবাহিনী। মুরসি বিরোধীদের কৌশলে কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনী তাদের স্বার্থ উদ্ধার করছে, মিসরের জনগণ এই সত্য যত তাড়াতাড়ি বুঝবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবে ততই দেশ ও জনগণের জন্য মঙ্গল। তাদের বুঝতে হবে ‘তেল এবং জল’ কখনও মিলে না। লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ইমেইল: masumbillah65@gmail.com