ঐতিহ্য

ঐতিহাসিক নিদর্শন মমিন মসজিদ

মমিন মসজিদ ফরায়েজী আন্দোলনের ফসল। ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হাজী মো. শরীয়তুল্লার দৌহিত্র, পীর মহসিন উদ্দীন দুদু মিয়ার পুত্র ফরায়েজী আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষক তৃতীয় গদ্দীনশীন পীর বাদশা মিয়ার অনুসারী ছিলেন মরহুম মৌলভী মমিন উদ্দীন আকন। ঔপনিবেশিক শাসনামলের শেষের দিকে মুসলমানদের কৃষ্টি-কালচার ইতিহাস ঐতিহ্য যখন হুমকির সম্মুখীন, তখন দুই বাংলার আলেম সমাজ কলকাতার গ্রীয়ার পার্কে ১৯১২ সালের শেষের দিকে এক সম্মেলনের আয়োজন করেন। উক্ত সম্মেলনে পীর বাদশা মিয়া উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে আনজুমানে ওয়েযীন নামে একটি সমিতি গঠন করা হয়। সমিতির সভাপতি ছিলেন মাওলানা আবুবকর সিদ্দিক। উক্ত সমিতিতে সিদ্ধান্ত হয় প্রতিটি গ্রামে গ্রামে ধনাঢ্য মুসলমানদেরকে উত্সাহ দিয়ে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা নির্মাণ করতে হবে। আনজুমান ও ওয়েযীন-এ সিদ্ধান্ত মোতাবেক গ্রামে-গঞ্জে প্রচার করার জন্য ১২/১৩ জন বেতনভুক্ত স্থায়ী প্রচারকও ছিল। তাদের প্রেরণায় উত্সাহিত হয়ে বর্তমান পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলাধীন ২নং ধানীসাফা ইউনিয়নের উদয়তারা বুড়িরচর গ্রামের সম্ভ্রান্ত আকন বাড়ীতে ফরয়েজী আন্দোলনের গাঁও খলিফা তথা তুষখালীর কৃষকবিদ্রোহের অন্যতম প্রতিনিধি মৌলভী ইব্রাহীম আকনের পুত্র মরহুম মৌলভী মমিন উদ্দীন আকন এই মসজিদ নির্মাণ করেন। কিশোরবেলায় মমিন উদ্দীন আকন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আগত এক নোয়াখালীর মাওলানার কাছে আরবী ও ফার্সী ভাষা শিখেন। মাওলানা সাহেব আকন বাড়ীতে মক্তব চালাতেন। তাই ধর্মীয় চেতনাবোধ পূর্বেই তার অন্তকরণে উপস্থিত ছিল। ধর্মীয় প্রণোদনা, রুচিবোধ এবং আর্থিক সামর্থ্য ধর্মীয় উপসনালয় নির্মাণে অনেক বেশি সৌকর্যমন্ডিত করে তোলে। মমিন মসজিদের শৈলী বিচারে তা স্পষ্ট হয়। বাইশজন কাঠ খোঁদাই মিস্ত্রি ১৯১৩ সাল থেকে কাজ শুরু করে শাল, সেগুন ও লোহা কাঠ ব্যবহার করে লোহাবিহীন এই অপূর্ব শিল্প কর্মটির কাজ ১৯২০ সালে শেষ করেন। চারপার্শ্বের বেড়া তিনটি অংশে বিভক্ত। উপরে ও নিচে কাঠের কারুকাজ দিয়ে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে দুইটি পার্ট দিয়ে ডাবল বেড়া। ভিতরে এক রকম ও বাইরে অন্য রকম। ভিতরে কারুকাজ করা বেড়াটি খুলে আলাদা করা যায়। ইট দিয়ে নির্মিত অনুচ্চ নিরেট মঞ্চের উপর আয়তাকার পরিকল্পনায় কাঠের জোড়াবদ্ধ বেড়া ও খুঁটি সমর্থিত টিনের আটচালাকার ছাউনি বসিয়ে স্বল্প পরিসরে মমিন মসজিদ নির্মিত হয়েছে। কাঠের বেড়ার মধ্যে আকর্ষণীয় কারুকাজ বিধৃত হয়েছে। সে কারুকাজের মটিফ ‘রূপচিহ্ন’-এ ঠাঁই পেয়েছে জ্যামিতিক বিন্যাসে ক্ষুদ্রাকার ফোকর, বরফি, ফুলদানি Stylised ‘রূপান্বিত’ কলিসহ বিরুদের ডাটা, নাস্তালিক Calliography ‘হাতের শৈল্পিক লেখা’ প্রভৃতি। সবকিছুই ধারণ করছে এ দেশের লোকজ ঐতিহ্যিক ধারার সর্বশেষ উপাত্ত। ২০০৮ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটি সংস্কার করেন। বর্তমানে মসজিদটি দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র কাঠের তৈরি শিল্পসমৃদ্ধ দৃষ্টিনন্দন মুসলিম স্থাপত্যকলা। কাঠের তৈরি মসজিদ ভারতের কাশ্মীরেও একটি ছিল। ১৮৮৫ সালের অনুকম্পাহীন ভূকম্পনে সেটি ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। কিছু বেড়া কাশ্মীর জাদুঘরে এখনো সংরক্ষিত আছে। উল্লেখ্য যে, সারা বাংলাদেশে সংরক্ষিত পূরাকীর্তি হিসাবে তালিকাভুক্ত শুধু মসজিদের সংখ্যাই আছে শতাধিক। তার মধ্য থেকে যেগুলো বেশী গুরুত্ব বহন করে, সেই সব মসজিদের ছবি উক্ত গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়েছে যেমন— ষাট গম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট। মমিন মসজিদ, পিরোজপুর। বিবি বেগনীর মসজিদ, বাগেরহাট। কুসুম্বা মসজিদ, রাজশাহী। রাজবিবি মসজিদ গৌর, রাজশাহী। বায়তুল মোকাররম মসজিদ, ঢাকা। লালবাগ দূর্গ মসজিদ, ঢাকা। বাঘা জামে মসজিদ, বাধা, রাজশাহী। চুনাখোলা মসজিদ, বাগেরহাট। ছোট সোনা মসজিদ, গৌর রাজশাহী। সাদীর মসজিদ, এগারসিন্ধুর, ময়মনসিংহ ও আটিয়া জামে মসজিদ, আটিয়া টাংগাইল-এছাড়াও হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কিছু প্রত্নসম্পদ কিছু আলোকচিত্র উক্ত গ্যালারীতে প্রদর্শিত আছে। মমিন মসজিদের আলোকচিত্র জাতীয় জাদুঘরে রাখার জন্য আমি জাতীয় জাদুঘরের সকল বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের, কলাকৌশলীদের অন্তরের অন্তস্থল দিয়ে সাধুবাদ জানাই। লেখক :অধ্যক্ষ, দি ইউনিভার্সেল প্রি-ক্যাডেট স্কুল, দক্ষিণ জুনিয়াবাজার, ভান্ডারিয়া, পিরোজপুর