খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৫
বাংলাদেশ এমনিতেই অত্যন্ত জনবহুল। সেই তুলনায় মাথাপ্রতি চাষযোগ্য জমির পরিমাণ খুবই কম। তদুপরি, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে আশাব্যঞ্জক সাফল্য সত্ত্বেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি থামিয়া নাই। আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়া ফসলি জমির পরিমাণ হ্রাস পাইতেছে আশঙ্কাজনক হারে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই হার বত্সরে ৬৮ হাজার ৭ শত হেক্টর। আরও উদ্বেগের বিষয় হইল, ১৯৭৬ হইতে ২০০০ সাল পর্যন্ত কমার হার যেইখানে ছিল ০.১৩৭ শতাংশ, ২০০০ হইতে ২০১০ সময়কালে তাহা পাঁচগুণেরও অধিক হারে বৃদ্ধি পাইয়া ০.৭২৮ শতাংশে উন্নীত হইয়াছে। এই সময়ে হ্রাসপ্রাপ্ত ফসলি জমির পরিমাণ প্রায় ৭ লক্ষ হেক্টর। অন্যদিকে গত সাড়ে তিন দশকে গ্রামীণ আবাসন, শহুরে ও বাণিজ্যিক এলাকা এবং চাষের অযোগ্য পতিত জমিসহ অকৃষি জমির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাইয়াছে। জাতিসংঘের সহায়তায় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান (এসআরডিআই) পরিচালিত এক গবেষণায় এইসব তথ্য উদ্ঘাটিত হইয়াছে। কৃষিজমি লইয়া দেশে প্রথমবারের মতো পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল যে উদ্বেগজনক কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নাজমুল ইসলামও তাহা স্বীকার করিয়াছেন। বিশেষজ্ঞরা ফসলি জমি কমিয়া যাইবার এই প্রবণতাকে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলিয়াই মনে করেন। অবশ্য ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিপরীতে ফসলি জমি এই হারে কমিতে থাকিলে সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার উপর ইহার নেতিবাচক প্রভাব যে অনিবার্য—তাহা বুঝিবার জন্য বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন পড়ে না।
জনবহুলতা কিংবা নগরায়নই যে জমি হ্রাসের একমাত্র কারণ নহে—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। বস্তুত নানাভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হইতেছে ফসলি জমি। তন্মধ্যে নদীভাঙন, লবণাক্ততা এবং জমির উর্বরতা কমিয়া যাইবার বিষয়টিও উপেক্ষা করিবার মতো নহে। দেখা গিয়াছে যে, বিগত তিন দশকে (১৯৬০-৯০) এলাকাবিশেষে কৃষিজমিতে অত্যাবশ্যক জৈবপদার্থের উপস্থিতি ৯ হইতে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাইয়াছে। এই ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ও দূষণের অবদানই যে সর্বাধিক—তাহা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। পাশাপাশি, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও জলাবদ্ধতার সমস্যা তো আছেই। অবশ্য দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যার ঊর্ধ্বমুখীনতা, দারিদ্র্য, সম্পদে প্রবেশাধিকারহীনতা এবং অদূরদর্শী ও অস্থায়িত্বশীল ভূমি ব্যবস্থাপনার চর্চার মতো সমস্যাবলি সামগ্রিক পরিস্থিতিকে যে আরও নাজুক করিয়া তুলিতেছে—তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। এই অবস্থা অব্যাহত থাকিলে তাহা দেশের ভবিষ্যেক যেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন করিয়া তুলিতে পারে, তেমনি গুরুতর চাপ সৃষ্টি করিতে পারে খাদ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতার উপর।
সঠিক নীতি এবং কৃষিজমির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে এই বিপর্যয়ের লাগাম টানিয়া ধরা যে সম্ভব তাহা লইয়া কোন দ্বিমত নাই। গবেষক দলের প্রধানও সেই আশার বাণী শোনাইয়াছেন। তাহার মতে, দেশে এখন ৬ শতাংশের বেশি হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হইতেছে। এই অবস্থায় নগরায়ন ও শিল্পায়ন দিন দিন বাড়িতে থাকিবে—ইহাই স্বাভাবিক। তবে নগরায়ন ও শিল্পায়নের এই ধারার সাথে সঙ্গতি রাখিয়া কৃষি জমির একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তোলা গেলে ফসলি জমি হ্রাসের প্রবণতা অনেকাংশে কমিয়া আসিবে বলিয়া তিনি মনে করেন। এই আশাবাদ যে অমূলক নহে তাহার উদাহরণও আমাদের সামনেই আছে। স্বাধীনতাপরবর্তী গত চার দশকে এ দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হইয়াছে। সেই সাথে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাইয়াছে ফসলি জমির পরিমাণও। কিন্তু এই সময়ে আমাদের খাদ্য উত্পাদনই শুধু ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় নাই, একই সাথে বহুলাংশে হ্রাস পাইয়াছে খাদ্য ঘাটতিও। খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে আসিয়া পৌঁছিয়াছি আমরা। কৃষি ক্ষেত্রে উন্নত জ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগই যে এই অসম্ভবকে সম্ভব করিয়া তুলিয়াছে—তাহা না বলিলেও চলে। একইভাবে বর্তমান ও ভবিষ্যতের যাবতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রেও এই জ্ঞান ও প্রযুক্তিই যে আমাদের প্রধান ভরসা তাহা নিঃসন্দেহে বলা যায়। উচ্চ ফলনশীল, বাংলাদেশের আবহাওয়াপোযোগী ও পরিবেশবান্ধব ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং শস্যের বহুমুখিকরণ হইতে শুরু করিয়া ফসলি জমির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইহা প্রযোজ্য।