আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল ও জোট মনোনিত প্রার্থীর বিরোধিতা করলে আজীবন বহিস্কার করার সিদ্ধান্ত রয়েছে অওয়ামী লীগের। এমন কঠোর হুশিয়ারির পরও অর্ধ শতাধিক আসনে দল-জোট মনোনিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন ও ঝাড়ু মিছিল কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। রবিবার মনোনিতদের মাঝে চিঠি দেওয়ার পর থেকে এমন কর্মসূচি পালন করছেন মনোনয়ন বঞ্চিত ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা। আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাখ্যান করে তা বাতিলের দাবিতে জেলায় জেলায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ হয়েছে। কেউ কেউ আবার বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীও হচ্ছেন। আবার কেউ হচ্ছেন এলাকায় অবাঞ্চিত। কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। দল ত্যাগ বা কেউ আবার রাজনীতি থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন। মনোনয়ন বঞ্চিত কেউ কেউ ঘোষণা দিচ্ছেন জীবনে আর রাজনীতি করবেন না।
এবার ৩০০ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন ৪ হাজার ২৩ জন। গত ১৪ নভেম্বর মনোনয়ন প্রত্যাশী সবার এক সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। এ সময় দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ নৌকার বিরোধিতা করলে বা বিদ্রোহী হলে তাকে সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিস্কার করা হবে। নৌকা প্রার্থীর পক্ষে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশনা দেন তিনি।’ তবে এমন সিদ্ধান্ত অনেকেই এখন আমলে নিচ্ছেন না। বিশেষ করে অর্ধ শতাধিক আসনে বেশি বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন নেতারা।
এদিকে নৌকার মনোনয়ন বঞ্চিত আওয়ামী লীগের চার প্রভাবশালী নেতাকে গণভবনে ডেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। গণভবনে ডাক পাওয়া নেতারা হলেন দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও বি এম মোহাম্মেল হক। মঙ্গলবার বিকাল চারটার দিকে এই চার নেতা গণভবনে যান। এ উপলক্ষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও নোয়াখালী থেকে দ্রুত ঢাকায় ফিরে এসে গণভবনে যান। এ ব্যাপারে নেতাদের ফোনে যোগাযোগ করা হলে কেউ ফোন রিসিভ করেননি। শেখ হাসিনা এই চার নেতার সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। সূত্র জানায়, এই চার নেতাকে দলের স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানান এবং আগামী নির্বাচনে সরকার গঠন করতে পারলে মূল্যায়ন করা হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, বৃহত্তর স্বার্থে সবার ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউ হারাতে পারবে না। ঐক্যবদ্ধভাবে দল-জোট মনোনিত প্রার্থীদের বিজয়ী করতে সবার ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন তিনি।
আগামী নির্বাচনে ফেনী-১ (পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া) আসনে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দিয়ে মহাজোটের প্রার্থী ঘোষণার দাবি জানিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। মঙ্গলবার এ দাবিতে আঞ্চলিক সড়ক দুই ঘণ্টা অবরোধ করেন তারা। এ আসনে ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাসদের সাধারণ সম্পাদক বর্তমান সংসদ সদস্য শিরিন আখতারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণাও করেন তারা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, মঙ্গলবার সকাল থেকে নির্বাচনী এলাকার ফেনী-পরশুরাম, ফেনী-ফুলগাজী ও ফেনী-ছাগলনাইয়া আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে দলীয় নেতা-কর্মীরা। একপর্যায়ে মানববন্ধন টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ, গাছ ফেলে সড়ক অবরোধ ও ঝাড়ু মিছিল করে। শিরিন আখতারের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের দাবি সংবলিত শ্লোগান দেন দলীয় নেতাকর্মীরা। নৌকার মনোনয়ন পেতে আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম ছাড়াও এ আসনে সাবেক মন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) জাফর ইমাম বীর বিক্রম, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবদীন হাজারী, ৯৬ সালের প্রার্থী ওয়াজি উল্লাহ ভূঞার ছেলে আবদুল কাদের ভূঞা ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল হারুন ভূঞা রাসেলসহ কয়েকজন দলীয় ফরম জমা দিয়েছিলেন।
জানা গেছে, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুর রহমান পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনায়ন সংগ্রহ করেছেন। তিনি ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। পিরোজপুর-৩ আসনের জন্য সোমবার রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জি.এম. সরফরাজের কাছ থেকে তার পক্ষে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার বাচ্চু মিয়া আকনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মনোনায়নপত্র সংগ্রহ করে। ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এমদাদুল হক নৌকা প্রতীকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তিনিও সোমবার পীরগঞ্জ উপজেলা নিবার্হী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার এম রায়হান শাহর কাছ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
এছাড়া কুমিল্লা-৪, পটুয়াখালী-৩, নেত্রকোনা-১, ফরিদপুর-২, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, সিলেট-২, ফরিদপুর-১, ঢাকা-২, নরসিংদী-৪, মেহেরপুর-১, মেহেরপুর-২, কুষ্টিয়া-১, নোয়াখালী-২, সিলেট-২, নীলফামারী-৪ আসনে মনোনয়ন নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ ও অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।