এ কী ঘটছে দেশে
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩০
দিনবদলের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে দেশ, জাতি, জনগণের সেবা প্রদানের নিশ্চয়তা বিধানের কথা বলে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও পুরো জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া ছিল তাদের অঙ্গীকার। কিন্তু দিনবদলের পরিবর্তে আমরা কি দেখছি! দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন আজ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েকদিনের ঘটনায় সারাদেশের মানুষ আজ স্তম্ভিত, আতংকিত। সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতি যেখানে ঈদ উত্সব পালনের জন্য ব্যস্ত, তখন আমাদের সামনে এক ভয়ংকর ঘটনা সংঘটিত হলো! আমরা দেখলাম রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত এক বিপণী বিতানের সামনে মধ্যরাতে সোডিয়াম লাইটের উজ্জ্বল আলোর মধ্যে নিজ দলীয় বন্ধুই ফিল্মি স্টাইলে প্রকাশ্যে গুলি করে মারল যুবলীগের নেতা রিয়াজ উদ্দিন খান মিল্কীকে। দলীয় কোন্দলসহ ঠিকাদারী কাজে আধিপত্য বিস্তার ও কোটি কোটি টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে সৃষ্ট বিবাদেই মিল্কীকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগে জানা গেছে। একই রাতে পুরান ঢাকার হাজারীবাগে জসিম উদ্দিন নামে এক বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ীকে তার বাসার সামনে খুন করা হয়েছে। রাজধানীতে পর পর দুটো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। শুধু কি তাই, ওই রাতেই পাবনায় পায়ের রগ কেটে এক বিএনপি কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ইতোপূর্বে চট্টগ্রামে রেলওয়ে ভবনে টেন্ডারবাজি নিয়ে যুবলীগের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে এক শিশুসহ দুজন নিহত হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের ক্যাডাররা কুপিয়ে হত্যা করেছে নিরীহ দর্জি কারিগর বিশ্বজিেক। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হাতে অনুরূপ প্রকাশ্যে দিবালোকে খুন হয়েছে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান বাবু। এছাড়াও সরকারি দলের দলীয় কোন্দলে খুন হয়েছেন নরসিংদী জেলার জনপ্রিয় পৌর চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন। এভাবে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু এ দায়ভার কার? সরকার কি এ দায়ভার এড়াতে পারে ?
মোদ্দাকথা দেশের সর্বত্রই সন্ত্রাসীদের হাতে কেউ না কেউ হতাহত হচ্ছে; অপমান-অপদস্থ হচ্ছে বিরোধীপক্ষের নেতাকর্মীসহ সরকারি কর্তাব্যক্তিগণ, গুলি খাচ্ছে, মার খাচ্ছে অনেক সাধারণ মানুষও। আইনের তোয়াক্কা না করে সম্পদ-সম্পত্তি নিরন্তর দখল করে নিচ্ছে এসব সন্ত্রাসীদের দল। আর এসব কাজ থেকে পাবলিক কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বাদ যাচ্ছে না। ছাত্রলীগের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো। ছাত্রলীগের অযাচিত অদম্য কর্মকাণ্ডের মধ্যে আছে পুলিশের সামনে প্রাকাশ্যে অস্ত্রবাজি, অস্ত্রের মহড়া, বড় বড় রাম দা, চাইনিজ কুড়াল নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া, শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা, হেনস্তা করা। তদ্রূপ এলাকা ও অঞ্চলভিত্তিক ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত হয়ে কায়েমী স্বার্থরক্ষার্থে ব্যাপক সহিংস ঘটনার জন্ম দেয়া থেকে শুরু করে বিরুদ্ধবাদীদের নিশ্চিহ্ন করার উদ্যোগ গ্রহণ, ব্যাপক চাঁদাবাজি, ইত্যাকার ঘৃণ্যতম কাজ পত্রিকা ও ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা আজ প্রত্যক্ষ করছি বা জানতে পারছি প্রতিনিয়ত।
গত ৩০ জুলাই ২০১৩ রাতে যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক মিল্কী নিহত হওয়ার পরপরই এ হত্যার সাথে জড়িত মহানগর যুবলীগের (দক্ষিণ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদ সিদ্দিকী তারেকসহ ছয়জনকে র্যাব গ্রেফতার করলেও এর মধ্যে জাহিদ সিদ্দিকী তারেকসহ তার এক সহযোগী আলম র্যাবের তথাকথিত ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে দেশে আজ দলীয় ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামে দুই ধরনের সন্ত্রাসী কার্মকাণ্ড দৃশ্যমান। এ দুই সন্ত্রাসের কাছে বাংলাদেশের জনপদ আজ জিম্মি। গত সাড়ে চার বছরে গুম, খুন, গুপ্তহত্যা, নির্বিচারে গণহত্যা, মাঠে-ঘাটে, খালে-বিলে লাশ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের কথা ও পত্রিকার কথা যদি বাদই দেই, খোদ মানবাধিকার সংস্থা হিসেবে অধিকার, অ্যামনেস্টি ইন্টান্যাশন্যাল এ সরকারের গুম, অপহরণ, গণহত্যা ও দমননীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। অনেক হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনা তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করার কথা বললেও সরকার তা করেনি বা আমলে নেয়নি।
অন্যদিকে বর্তমানে সন্ত্রাসী, হত্যাকাণ্ডের সাথে সাথে সমানতালে চাঁদাবাজদের হুমকি ও উত্পাতে দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের ঘুম হারাম হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বেপরোয়া চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদ সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। চাঁদাবাজির ঘটনার সঙ্গে সন্ত্রাসী ও গডফাদার ছাড়াও রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা ও ক্যাডাররা। মহাসড়ক থেকে ফুটপাত, মার্কেট থেকে বাসাবাড়ি, কাঁচাবাজার, লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, বাস টার্মিনাল সর্বত্রই এখন চাঁদাবাজদের দীপ্ত পদচারণা। জানা গেছে, মালিক-শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে কেবল রাজধানীতেই সাড়ে ১০ হাজার বাস-মিনিবাস থেকে প্রতিদিন চাঁদা উঠে কোটি টাকারও বেশি। পণ্য পরিবহনে ঘাটে ঘাটে চলছে পুলিশের বেপরোয়া চাঁদাবাজি। আর এই সন্ত্রাসী চাঁদাবাজির কবলে পড়ে অনেক নিরীহ ব্যবসায়ী নিরাপত্তাজনিত কারণে ভোগান্তির শিকার হয়েও মুখ বন্ধ করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। গত এক সপ্তাহে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শুধুমাত্র চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীদের হাতে অন্তত ১০ জন হতাহত হয়েছে। রামপুরায় গত ৩১ জুলাই সাধারণ ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকেরা পুলিশের এক সাব-ইন্সপেক্টরের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে তার বিচারের দাবিতে এলাকায় মিছিল-সমাবেশ পর্যন্ত করেছে।
তবে সবচেয়ে লোমহর্ষক বিষয় হলো, রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে এক বিপণী বিতানের সামনে সোমবার মধ্যরাতে যুবলীগ নেতা মিল্কীকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরায় ধারণকৃত সেই দৃশ্য দেখে দেশের সমস্ত মানুষ আঁতকে উঠেছে। ঘাতক এক হাত দিয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে এবং অন্য হাতে মিল্কীর মাথায় ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। সন্দেহ নেই যে, এ ঘটনা জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ দেখেছে কত সহজেই মানুষকে হত্যা করা যায়। আমরা দেখি, এখানে অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতা, লোভের প্রতিযোগিতা, হিংসা-বিদ্বেষের প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা চলছে, যা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের দিকে, অধঃপতনের দিকে। বিবেকবোধ থেকে উত্সারিত নৈতিকতার প্রতিযোগিতা আজ এখানে অদৃশ্যমান।
দিনবদলের অঙ্গীকারবদ্ধ সরকারের জনগণের কাছে প্রতিশ্রতি ছিল তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। অর্থাত্ আইনের প্রয়োগ সবার ক্ষেত্রে সমান হবে। কারণ এ কথা সুস্পষ্ট করে বলা যায় যে, দেশে আজ প্রকৃতপক্ষে আইনের শাসন বিদ্যমান থাকলে অপরাধী যেই হোক, যে দলেরই হোক তাদের বিচারের আওতায় এনে সাজা দিলে খুন-খারাবির ব্যাপকতা কমে যেত। কিন্তু বাস্তবতা হলো গত কয়েক বছর ধরে ও সাম্প্রতিককালে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, অপহরণ যেভাবে ঘটে চলেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সেরকম কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি। ফলে অপরাধীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অপরাধীদের মনে কোন ভীতি না থাকায় পুনরায় একই ধরনের ঘটনা ঘটাতে তারা উত্সাহিত হচ্ছে। সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। অথচ এখনো তাদের হত্যার রহস্য উত্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম, ইলিয়াস আলী ও তার ড্রাইভার নিখোঁজ হয়েছে এক বছরেরও বেশি সময় আগে। এক্ষেত্রেও তদন্তের নেই কোন অগ্রগতি। রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে যে কোন অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, সরকার আজ সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। আসলে খোদ রাষ্ট্র যখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, রাজনৈতিক কারণে গুরুতর অপরাধীকে মুক্ত করে দেয় এবং বিশেষ করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূল উপাদান হিসেবে স্বাধীন বিচার বিভাগ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন কাঠামো গড়ে না উঠে তখন এ ধরনের বিয়োগান্তক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে। সরকারের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে পরিস্থিতির কোন উন্নতি হবে বলে মনে হয় না। কেননা, সামনে আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। সেক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকেই মূলত ইতিবাচক মনোভাবের পরিচয় দিতে হবে। দলের কথা বিবেচনা না করে দেশের কথা, দেশের মানুষের কথা চিন্তা করতে হবে। তাহলেই কেবল সর্বক্ষেত্রে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে, নচেত্ নয়। গ্রীক লেখক সফক্লিস তাই বলেছেন, “আমরা আমাদের শেষ সময়ে শিখি বা বুঝি, তখন ওই শেখা বা বুঝা কোন কাজে আসে না।”
লেখক :চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
kirondebate@gmail.com