অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বাংলাদেশে রাজনীতি কোন পথে
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৭
আর মাত্র কয়েকটি মাস অপেক্ষা, তারপরই সাধারণ নির্বাচন। কিন্তু আজও সেই সাধারণ নির্বাচনের পদ্ধতি কি হবে তা এই জাতি নিশ্চিত হতে পারেনি। প্রধান দুই দল এই নির্বাচন নিয়ে দু’টি ভিন্ন অবস্থানে আছে। বিএনপি চায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার চায় দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন। সাত বছর আগে এই জাতি আরও একবার এমন ভয়ানক রাজনৈতিক অবস্থার শিকার হয়েছিল। সেদিন বিএনপি ছিল সরকারে এবং সেই সরকার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসাবে বিচারপতি কে এম হাসানকে নিয়োগ দিতে চাইলে সংঘাতের শুরু হয়। আওয়ামী লীগ বলে ‘না’ আর বিএনপি বলে ‘হ্যাঁ’। এই ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’-এর দুলাচলে সেদিন ঢাকার রাজপথ রাজনৈতিক কর্মীদের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সরকার পুলিশ দিয়ে এবং নিজেদের জঙ্গি কর্মীবাহিনী দিয়ে বিরোধী দলের মোকাবিলা করল, আর বিরোধী দল তাদের জঙ্গি কর্মীদল দিয়ে নতুন নতুন আক্রমণের সুযোগ ঘটাল। লগী-বৈঠা দিয়ে আক্রমণ করা হল, রাস্তায় রাস্তায় সহিংস আক্রমণ হল এবং একাধিক মৃত্যুকে জাতি বরণ করতে বাধ্য হল। সেদিনের অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ডেকে নিয়ে এল নির্দলীয় এক তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার পেছনে শক্তি হিসাবে কাজ করল সেনাবাহিনীর সমর্থন। তারপরের ঘটনাগুলো এদেশের সকলেরই জানা। শত শত দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বড় বড় শহরের অবৈধ স্থাপনা ভাঙ্গা থেকে শুরু করে প্রতিটি সরকারি অফিসে দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে সেই সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিশেষভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। কারাগারে যেতে হয় বড় বড় রাজনীতিবিদদের। একসময় শীর্ষ দুই নেত্রীকেও কারাবরণ করতে হয়।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বড় একটি কাজ ছিল রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। রাজনীতিবিদদের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থার সূত্রপাত হয়েছিল সেই সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে। রাজনৈতিক দলের সংস্কার করার তাগিদ উঠেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। রাজনৈতিক মহলে তখন রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র এবং সংস্কার আনয়নের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছিল। দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র, দলে পরিবারতন্ত্র, রাজনৈতিক দলের দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয়গুলো তখন ছিল রাজনৈতিক কর্মীদের মুখে মুখে। অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের হয়রানির বিষয়টি ছিল বিশেষ নজর দেয়ার বিষয়। এতকিছুর মধ্যে তখন একটি জনপ্রিয় বক্তব্য ছিল যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফলে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শিক্ষা গ্রহণ করবে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক দলগুলোর তেমন শিক্ষা লাভের কাজটি হয়নি বলেই মনে হয়। দলে গণতন্ত্র কখনও আসেনি; রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে, রাজনৈতিক
স্বেচ্ছাচারিতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সর্বোপরি দেশের শান্তি-শৃংখলা ভঙ্গকারী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে ক্রমশ দূরত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। একে অপরের শত্রু হিসাবে চি?িহ্নত হয়েছে এবং একে অপরের সমর্থন পাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। দুই দলের জঙ্গি কর্মীরা প্রস্তুত আছে। যে কোন মুহূর্তে বড় সংঘাতের সম্ভাবনা। একদল জোর করেই নির্বাচন করবে আর অন্য দল নির্বাচন প্রতিহত করবে। এমন একটি থমথমে অবস্থার মধ্যে নতুন করে পরিস্থিতি আরও অস্থির করেছে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবতা। যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবির দেশে সহিংস আন্দোলন করে যাচ্ছে। তাদের সহিংস আন্দোলন রীতিমত হিংস্র তাণ্ডবতায় রূপ নিয়েছে। গাড়ি ভাংচুর, জনগণের সম্পদের ক্ষতিসাধন এবং পুলিশের উপর আক্রমণ করে জামায়াত-শিবির সারা দেশে অস্থির একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রণীত রায় কার্যকরণে তারা বাধা দিতে চায়- আর সেই লক্ষ্যে তারা এই তাণ্ডবতা চালিয়ে যাবে সামনের দিনগুলোতেও এমনটাই মনে হচ্ছে। তাদের এমন একটি অস্থির পরিস্থিতির সাথে যোগ হয়েছে দুই প্রধান দলের আগামী নির্বাচন ইস্যুতে মতবিরোধ এবং পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণুতা। যতই সময় পার হচ্ছে, যতই নির্বাচন সামনে এগিয়ে আসছে ততই যেন আমাদের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। বড় দু’টি দল সমাজ তথা রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রের মানুষের শান্তির কথা ভেবে পারস্পরিক সমঝোতায় আসছে না। কেউ কোন ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। তবে কিভাবে হবে সামনের নির্বাচনটি? আওয়ামী লীগ তাদের সরকারের অধীনেই করবে এটা একরকম স্থির করেই ফেলেছে। অন্যদিকে বিএনপি নির্দলীয় সরকার ব্যতীত কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। বিএনপি শুধু অংশগ্রহণ করবে না এমনটাই নয়, বরং তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যতীত দেশে নির্বাচন হতে দেবে না এমনটাই তাদের ঘোষণা। তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে সংঘাত অনিবার্য। দুই দলের কর্মীরা রাজনৈতিক মাঠে এখনই প্রস্তুতির মহড়া দিচ্ছে নানাভাবে। বিএনপি ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, ঈদের পরই তারা বৃহত্তর কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসবে এবং সরকারকে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করাতে বাধ্য করবে।
ধরে নেই যে, সরকার জোর করেই জাতীয় নির্বাচন করিয়ে নিবে। সেখানে বিএনপি বাইরে থাকবে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির রাজনৈতিক শক্তি সমানে সমান। এক্ষেত্রে বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন করার অর্থই হবে আওয়ামী লীগের একটি বড় রাজনৈতিক ভুল করা। অন্যদিকে সমঝোতার রাস্তা ছেড়ে এবং সরকারের সাথে আস্থার জায়গাটি সৃষ্টি না করে জোর করে নির্বাচন ঠেকানোর কাজটিও হবে বিএনপির ভুল সিদ্ধান্ত। এই দু’টি দলের একগুঁয়েমি কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় যে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে কোন শিক্ষাই তারা গ্রহণ করতে পারেনি। বরং তারা ভুল রাজনীতির পরিমাণ বৃদ্ধি করে দেশের স্থিতিশীলতার পথে হুমকি রূপে কাজ করছে। সরকার প্রধান বার বার বলেছেন, এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে আবার দুই নেত্রীকে কারাগারে যেতে হবে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার একবার এলে আর ক্ষমতা ছাড়বে না। আর এই কারণেই সরকার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় সম্মত নয়। সরকার প্রধানের বক্তব্যটি ঠিক গ্রহণ করার মত যথেষ্ট যুক্তি আছে বলে মনে করি না। কেননা তৃতীয় শক্তি কিভাবে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের সময়েও আসতে পারে তা মুরসির মিশর ইতিমধ্যে আমাদের দেখিয়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মুরসিকে মিশরের সেনাবাহিনী গৃহবন্দী করে ক্ষমতা দখল করার পরও বিশ্ব সমাজ মিশরের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে না গিয়ে বরং সমর্থন জানিয়েছে।
যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্ব নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর কথা, সেখানে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দায়িত্ব-জ্ঞানহীনভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রসারে ভূমিকা রাখছে। আর এর ফলে দেশের সমস্ত স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ছে। দেশের শান্তির পথে বাধা হয়ে না দাঁড়িয়ে বরং দেশের মানুষের সুখ ও শান্তির স্বার্থে এখন বড় দু’টি দলের প্রয়োজন একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় এসে আগামী নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা।
লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা