[ সা ম্প্র তি ক ]
দেশে কী হচ্ছে?
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৩, ২২:১২
বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডে জনমনে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন উঠছে যে, খুনের প্রতিকার কি খুনিকে ধরে নিয়ে হত্যা করা? অভিযুক্ত ব্যক্তি যত ভয়ঙ্কর ও ঘৃণ্য অপরাধই করুক না কেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার তাঁর আছে; কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়শই অভিযুক্তকে সেই ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
রাজধানীর উচ্চবিত্তদের ঈদের কেনাকাটায় অগ্রাধিকার পায় গুলশান এলাকা। অপেক্ষাকৃত নিরাপদ পরিবেশের কারণে গভীর রাতেও দলে দলে ক্রেতারা ভিড় করেন এখানকার বিপণিবিতানগুলোতে। এখানে পুলিশ-র্যাবের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাও তুলনামূলক বেশি থাকে। এমন নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় একটি বিপণিবিতানের সামনে ২৯ জুলাই গভীর রাতে ঢাকা মহানগর যুবলীগের (দক্ষিণ) সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিলকীকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার রূপ ভয়ঙ্কর। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধারণকৃত সেই দৃশ্য দেখে মানুষ শিউরে উঠেছে। এ দৃশ্য যেন ফিল্মি স্টাইলকেও হার মানিয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে বিপণিবিতানে ঢুকছিলেন মিলকী। আর মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে বিপণিবিতান অতিক্রম করছিল ঘাতক যুবলীগ নেতা তারেক। দুজন কাছাকাছি হতেই তারেক, মিলকীর মাথা লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে মিলকী সড়কে ছিটকে পড়লেও ঘাতক থামেনি, চালাতে থাকে এলোপাতাড়ি গুলি। এক পর্যায়ে ঘাতকের সঙ্গে যোগ দেয় মোটরসাইকেলে আসা আরও কয়েক যুবক। মাত্র ১৪ সেকেন্ডেই ওই যুবকেরা গুলি করে মিলকীকে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে প্রকাশ্যে, অনেক লোকজনের আনাগোনাও ছিল সেখানে। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধারণ করা এই লোমহর্ষক হত্যাচিত্রের ভিডিও গণমাধ্যমের কল্যাণে প্রত্যক্ষ করে বিস্মিত-মর্মাহত হয়েছে দেশবাসী। নিঃসন্দেহে এ ঘটনায় জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে; কারণ তারা দেখেছে, শত্রুতাবশত কত সহজেই মানুষকে গুলি করে পাখীর মত হত্যা করা যায়।
যুবলীগ নেতা মিলকীকে হত্যার একই রাতে রাজধানীর হাজারীবাগে নিজ বাসার সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় বিএনপির ওয়ার্ড নেতা জসিমউদ্দিনকে। ওই রাতেই পাবনায় পায়ের রগ কেটে এক বিএনপি কর্মীকে হত্যা করা হয়। পরদিন অর্থাত্ ৩০ জুলাই রাজধানীতে আরও দুজন খুন হয়েছেন। বস্তুত, প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও খুনের ঘটনা ঘটছে। পবিত্র রমজান মাসে এ ধরনের খুনের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর কোনো কোনোটিতে রাজনীতিক প্রতিহিংসার সম্পৃক্ততা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধু শত্রুতাবশত হত্যা করা হচ্ছে। কোথাও দলীয় কোন্দল বা প্রতিপক্ষের হামলা কিংবা চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি হচ্ছে। আর এ সবই হচ্ছে আমাদের নষ্ট রাজনীতির ফসল। মিলকীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড একদিকে যেমন আইন-শৃঙ্খলার ভঙ্গুর চিত্রকে তুলে ধরেছে, তেমনি প্রকাশ করেছে দেশের দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির রূপ। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে এখন আর আদর্শ বলতে কিছু নেই—রাজনীতি, রাজনৈতিক দলের পদ ও পদবি এখন বড় ব্যবসার নাম। দলের পদ-পদবি থাকা মানেই ঠিকাদারি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার করে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ খুলে যাওয়া। বড় দলগুলোতে পদের জন্য লোভ-মোহ এতোটাই বেপরোয়া যে, একজন নিয়ন্ত্রক ও প্রভাবশালী হয়ে উঠলে আরেকজন তাকে টেক্কা দিতে প্রাণে মেরে ফেলতেও পিছপা হয় না। কেবল শাসক দলের মধ্যেই গত কয়েক মাসে অন্তত ডজন খানেক খুনের ঘটনা ঘটেছে দলীয় কোন্দলের কারণে। রাজনীতিও ক্রমাগতভাবে এগুলোকেই উত্সাহিত করে আসছে। অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয়-অনুকম্পা পাচ্ছে—দল ক্ষমতায় গেলেই নির্বিচারে মামলা প্রত্যাহার করা হয়, খুনিসহ গুরুতর অপরাধকারীরাও ছাড়া পেয়ে যায়, এমনকি রাষ্ট্রপতির ক্ষমাও মিলে। অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া ও বিচারহীনতা অপরাধকে আরো উসকে দেয়; আর এর করুণ পরিণতি সবাই প্রত্যক্ষ করলো মিলকী হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে।
তবে ঘটনার কার্যকারণ যাই হোক, দেশে প্রকৃত অর্থে আইনের শাসন থাকলে ও অপরাধীদের সাজা হলে খুন-খারাবির ব্যাপকতা কমে আসত। কিন্তু বাস্তবতা হল, গত কয়েক বছর ধরে দেশে একের পর এক খুন, গুম, অপহরণ ঘটে চলেছে, অথচ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এসব অপরাধের কোনো কূল-কিনারা করতে পারছে না; ফলে অপরাধীদের মনে কোনোরকম ভীতি কাজ করছে না। আলোচিত মামলাগুলোর তদন্তেও কোন অগ্রগতি না হওয়ায় অপরাধীরা এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পরোয়া করছে না। বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী তাঁর গাড়ি চালকসহ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ। এসব ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় আইন-শৃঙ্খলার ব্যাপারে সরকার গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না করলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না—এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা বলেও কিছু নেই এখন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছে পুলিশ ও রাজনৈতিক দল। পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ-উেকাচ নিয়ে আসামী না ধরার অভিযোগ বহু পুরনো। আবার অপরাধী ধরতে ব্যর্থ হলেও দায় নিতে হচ্ছে না তাদের। বিদ্যমান অবস্থায় রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি র্যাব-পুলিশ বাহিনীর জন্য জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করলে কিছুটা সুফল পাওয়া যেতে পারে।
এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। যুবলীগের নেতা রিয়াজুল হত্যার পর রাতেই মহানগর যুবলীগের (দক্ষিণ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদ সিদ্দিকী তারেকসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ থাকার কারণে খুনিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়নি। এতে সবাই ভেবেছিল, এবার অন্তত একটি নৃশংস ঘটনার কূলকিনারা হবে। হত্যার ঘটনায় অংশ নেওয়া অপরাধী ছাড়াও নেপথ্যে থাকা হোমরা-চোমরাদের নামও জানা যাবে। পাশাপাশি এ খবরও স্বস্তিদায়ক ছিল যে, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি রিয়াজুলের খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে পরদিনই জাহিদ এবং অপর একজনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে। কারণ, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগে সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের অল্প সময়ের মধ্যেই জাহিদকে গ্রেপ্তার জনমনে এ ধারণা সৃষ্টি করেছিল, সরকার অবশেষে বোধহয় দলীয় সন্ত্রাসীদের প্রতি কঠোর মনোভাব গ্রহণ করবে। কিন্তু, বিধি বাম। মিলকী হত্যার ৪৫ ঘণ্টার মাথায় হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি তারেক এবং তার সহযোগী শাহ আলম ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। সিনেমায় দেখা যায়, অপরাধীরা পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তারা যাতে স্বীকারোক্তি দিয়ে গডফাদার বা হুকুমের আসামীদের নাম প্রকাশ না করতে পারে, সেজন্য পুলিশের হাতে ধরা পড়া আসামীকে খুন করার চেষ্টা করা হয়। আর আমাদের দেশে আমরা এবার প্রত্যক্ষ করলাম, গডফাদারদের নাম প্রকাশের ভয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নিহত হল অপরাধী!
তারেক ও শাহ আলমের নিহত হওয়ার বিষয়ে র্যাবের ভাষ্য অতীতের ক্রসফায়ারের বিবরণের অনুরূপ হওয়ায় কয়েকটি প্রশ্ন সহজেই তোলা যায়| সরকারের একজন মন্ত্রী—যাঁর কোনো দপ্তর নেই—তিনিও ঘটনাটিকে র্যাবের নাটক বলে অভিহিত করেছেন। মন্ত্রীর চোখে যখন এটি নাটক; তখন সাধারণ মানুষের কাছে কী, তা সহজেই অনুমান করা যায়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে হাসপাতালে র্যাবের প্রহরায় থাকা এক ভয়ঙ্কর খুনিকে কেন রাত সাড়ে ১০টার দিকে গুলশান থানায় নেওয়ার প্রয়োজন পড়ল—সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। র্যাবের ভাষ্য সঠিক হলে, তারেকের মতো একজন ‘অপরাধী’-কে নিয়ে চলাচলের সময় কেন পর্যাপ্ত ফোর্স নেয়া হয়নি? অতীতে দেখা গেছে, জঙ্গিসহ গুরুতর অপরাধের আসামিদের ক্ষেত্রে র্যাব বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরানোসহ নানা ধরনের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেয়। তাহলে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি তারেকের ক্ষেত্রে সে রকম কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি? গাড়িতে র্যাব সদস্যদের মধ্যে থাকা অবস্থায় কেবল তারেকের শরীরেই গুলি লেগেছে—এ ঘটনা ফিল্মের কাহিনীকেও হার মানিয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে তারেকই যে শেষ ব্যক্তি ছিল, তা নয়| সংবাদমাধ্যমে এরই মধ্যে শাসক দলের আরো অনেক প্রভাবশালীর কথা বলা হয়েছে পর্দার আড়ালের ইন্ধনদাতা হিসেবে| হাসপাতালে স্বল্পকালীন অবস্থানকালে জাহিদ আন্ডারওয়ার্ল্ডের না জানা অনেক কথা, যুবলীগের রথী-মহারথীদের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা বলতে চেয়েছিলেন—এমন খবর দিয়েছে একাধিক জাতীয় দৈনিক। সিনেমার কাহিনীর মত তাদের নাম যাতে প্রকাশ না পায়, তারেককে দ্রুত সরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য কি সেটাই? খোদ রিয়াজুলের পরিবারের অভিযোগ, হত্যার নির্দেশদাতাদের রক্ষা করতেই তারেককে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়া হয়েছে। বলা বাহুল্য, তারেক নিহত হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়ায় অনেক তথ্যই অনুদঘাটিত থেকে যাবে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো রাঘব বোয়ালের ইঙ্গিত ছিল কি-না, তারেকের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাও হয়তো চাপা পড়ে গেল।
আরেকটি বিষয় হলো, র্যাবের ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ যে ভিত্তিহীন নয়, তা ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতের এ সংক্রান্ত নির্দেশনাই প্রমাণ করে। ওই বছরের ২৯ জুন হাইকোর্টে সরকারের প্রতি একটি রুল জারি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং কেন এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণের আদেশ দেয়া হবে না—এ মর্মে জানতে চাওয়া হয়। শুনানিকালে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আর কোনো ‘ক্রসফায়ার’ হবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই নির্দেশনার পরও দেশে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। গত ১৯ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্টে বলা হয়, ‘মিডিয়া, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা এবং সরকারি তথ্যমতে ৭০ জন মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এসব সংস্থা বিশ্বাস করে এর মধ্যে ৪০টি হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী র্যাব।’ মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা অধিকারের মতে, ২০১২ সালেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ৭০ জন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এদের ৫৩ জন ক্রসফায়ারে নিহত হন। গত ২৯ জুলাই ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন দুই কথিত ছিনতাইকারী। ১ আগস্ট রাজশাহীর বাগমারায় পুলিশের চাঁদাবাজি ও হয়রানির প্রতিবাদ করায় স্থানীয় এক ব্যবসায়ীকে পুলিশ গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অতীতে এমন অভিযোগও উঠেছে, কোনো অপরাধে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার জড়িত থাকার তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় সংশ্লিষ্ট অপরাধীকে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে।
বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডে জনমনে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন উঠছে যে, খুনের প্রতিকার কি খুনিকে ধরে নিয়ে হত্যা করা? অভিযুক্ত ব্যক্তি যত ভয়ঙ্কর ও ঘৃণ্য অপরাধই করুক না কেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার তাঁর আছে; কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়শই অভিযুক্তকে সেই ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। দুর্ধর্ষ অপরাধীরা ‘ক্রসফায়ার’ কিংবা অন্য কোনো অঘটনে মারা গেলে মানুষ তখনই খুশি হয় যখন দেখে, আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের বিচার হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আইন-শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, তারাই যদি আইনবহির্ভূত ঘটনা ঘটায়, তাহলে দেশে সন্ত্রাস, হত্যা ও নৈরাজ্য বন্ধ হবে না—এটাই স্বাভাবিক। মূলত র্যাব-পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করার কারণে একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মহাজোট বিচারবহির্ভূত হত্যা সহ্য করা হবে না বলে নির্বাচনের আগে যে ঘোষণা দিয়েছিল, এখন সেই ঘোষণা তাদের বিদ্রূপ করছে।
বর্তমানে শুধু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডই নয়, সার্বিকভাবেই দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। গুম, খুন, অপহরণ, সহিংসতা—ভয়ঙ্কর সব অপরাধের ঘটনা ঘটছে অহরহ। এসব অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে রাজনৈতিক সংঘাত সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যা অগণতান্ত্রিক কোনো শক্তির ক্ষমতা গ্রহণের অনিবার্য পরিস্থিতি তৈরি করবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়