আপনদর্পণ

সুখ-দুখ সমভাগ করে নেব সকলে ভাই

নাই হলো মা বসনভূষণ এই ঈদে আমার আল্লাহ্ আমার মাথার মুকুট রসুল গলার হার নামাজ রোজার উড়না শাড়ি ওতেই আমায় মানায় ভারী কলমা আমার মাথার মুকুট রসুল গলার হার এই তো হবে মুমিনের সত্যিকারের সাজ, অন্তরের, হূদয়ের এবং চরিত্রের। পথে পথে যখন দেখি বিপণী বিতানগুলো উপচে পড়ছে জনসমুদ্রে, শপিং মল নামক দৈত্য হাঙ্গরের মতো দাঁত মেলে গ্রাস করতে আসছে, তখন সত্যি ভয় পাই। কোথায় যাবো আমি, কিভাবে যাবো, আমার তো গন্তব্য ছিল কাছেই মাত্র আধ মাইল অতিক্রম করলেই ইউনাইটেড হাসপাতাল, যেখানে রোগশয্যায় কাতর হয়ে আছেন আমার প্রিয় বন্ধু, নিকটজন, এই মুহূর্তে তাঁর কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয়ার কথা, অথচ আমি স্থবির হয়ে আছি যানজটের ভয়াবহ বিভীষিকায়। মনে মনে দরুদ শরীফ পড়ি, দোয়া ইউনুস পড়ি, আল্লাহেক বলি তুমি ইউনুস নবীকে মাছের পেট থেকে উদ্ধার করেছিলে, আমাকে তো সেই রহম দিয়ে এই যানজট থেকে বাঁচাতে পারো। চোখ ছিল বন্ধ, হূদয়ে ছিল বিশ্বাস, মুহূর্তে স্বপ্নের মতো মিলিয়ে গেল স্থবির হয়ে থাকা গাড়ির সারি, আমি পাঁচ মিনিটে হাসপাতালের গেটে। মানুষের জন্য প্রয়োজন আলো বাতাস পানি বৃক্ষ নদী আকাশ। রাজধানীর বাসিন্দারা কোথায় পাবেন এহেন সোনার হরিণ। মানুষের হূদয়ে অর্থ এবং অনর্থ এত সহাবস্থান করছে যে, বসুন্ধরাকে বাসযোগ্য করার কথা তাদের কল্পনাতেও ধরা দেয় না। যারা অর্থবান তারা ঈদের ছুটিতে টিকিট কাটেন ইস্তাম্বুল মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুর ব্যাংকক নেপাল ভুটান ইউরোপ আমেরিকার। যাদের অর্থ নেই তারা প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার বাসনায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চড়ে বসেন পাঁচগুণ বেশি যাত্রীবাহী লঞ্চে, বাসে, কেউবা রেলগাড়ির ছাদে। আর আমরা খাঁচায় বন্দী পাখির মতো মুক্ত আকাশের স্বপ্ন দেখি। মধ্যবিত্তরা সমাজে ভারসাম্য রক্ষা করেন। ছেলেবেলায় দেখতাম পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন ভদ্রতা নম্রতা সততায় মোড়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। তারা সীমিত আয় থেকে ব্যয় করেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, রোগের চিকিত্সা, মেহমান এলে মেহমানদারি, ঈদ বকরি ঈদের নতুন কাপড়, জাকাত- ফেতরা সবই হয়ে যায় সেই বরকতের টাকায়। দুরারোগ্য রোগের কথা তেমন শোনা যায় না। কারণ সব কিছুই তো হক রোজগার থেকে ব্যয় হয়, অপব্যয় বা অসত্ টাকা সেখানে খেলা করে না। দিন কেন বদলে গেল সহসা, এত দ্রুত বিনা নোটিসে যেন মেঘহীন আকাশে বজ্রপাত। ধনীরা হচ্ছেন আরো ধনী, গরিব হচ্ছেন আরো গরিব। নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাওয়ার অবস্থা। মধ্যবিত্ত শব্দটি দূরাগত বংশীধ্বনির মতো শ্রবণে আসে শান্তির দিনের স্মৃতি নিয়ে। সুউচ্চ গগনচুম্বী এ্যাপার্টমেন্ট হাউসে ফ্ল্যাটগুলোতে বিদেশি ও দেশি সৌখিন ফার্নিচারের প্রদর্শন, ফ্রিজ, ডিপ ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, রাইস কুকার, ওভেন, এসি, ভিসিআর, শত শত গেজেটের ছড়াছড়ি। নিচে পার্কিং প্লেইসে নিত্যনব মডেলের চকচকে গাড়ি, এক একজনের দু’-তিনটে। সেই বাড়িতে যারা রাত জেগে পাহারা দেন, যারা দিনের গার্ড তাদের বেতন একশ টাকা বাড়াতে গেলেও কমিটির মেম্বাররা শোরগোল তোলেন, বোনাস দিতেও কিছুটা কার্পণ্য। দুঃখে হতাশ হয়ে পড়ি। এই কি মানবশ্রেষ্ঠ, সৃষ্টির সেরা হওয়ার লক্ষণ? লেখক:শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক mabbasi@dhaka.net