দেশের শিশু শ্রম পরিস্থিতি
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০১৩, ২২:১৩
পুরাতন ঢাকার কর্মজীবী শিশুদের উপর পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যাইতেছে, শ্রমজীবী শিশুদের প্রায় ৯৪ শতাংশকে ১০ ঘণ্টার উপরে কাজ করিতে হয়। তাহাদের মধ্যে চিকিত্সা সুবিধা পায় ১৬ শতাংশ, আর মাত্র ৫ ভাগ সৌভাগ্যবান নিয়মিত স্কুলে যাইবার সুযোগ যায়। জরিপভুক্ত শিশুদের দিকে তাকাইলে দেখা যাইবে, তাহাদের ৫১ শতাংশ সপ্তাহে উপার্জন করে মাত্র ১০০ হইতে ৪০০ টাকা, যাহা দিয়া আজিকার যুগে তাহার নিজের অন্নসংস্থানও সম্ভব নহে। ৪০১ হইতে ৮০০ টাকা মজুরি পায় ৩৬ শতাংশ, এবং ৮০১ হইতে ২০০০ টাকা মজুরি পায় মাত্র ১২ শতাংশ শিশু। অধিকন্তু, নির্যাতন ও নিপীড়ন অধিকাংশ শ্রমজীবী শিশুর নিত্যসঙ্গী। সপরিবারে কেবল দুমুঠো খাইয়া বাঁচিবার জন্য রঙিন শৈশবের সবটুকু নির্দয় মজুরি শ্রমের চাকায় পিষ্ট করিবার এই চিত্র কেবল পুরাতন ঢাকা নহে, টেকনাফ হইতে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সকল শ্রমজীবী শিশুর ললাটেই লিখিত হইয়া রহিয়াছে।
পরিসংখ্যান বলিতেছে, বাংলাদেশে মোট ৭৪ লক্ষ শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত। তাহাদের মধ্যে ৩২ লক্ষ শিশুশ্রমিক এবং তাহদেরও মধ্যে ১৩ লক্ষ শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জীবিকায় নিয়োজিত। যদিও, এই পরিসংখ্যানের আওতায় গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুরা অন্তর্ভুক্ত হয় নাই। তদুপরি, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল হইতে শুরু করিয়া রাজধানীর বস্তি এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলি ভরণপোষণ দিতে না পারিয়া তাহাদের সন্তানকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে, যেখানে শিক্ষার পাশাপাশি তাহাদেরকে বিভিন্ন শ্রমেও নিয়োজিত করা হয়। ইহাছাড়াও পোশাক শিল্প হইতে শুরু করিয়া অনেক কারখানায় বয়স বাড়াইয়া শিশুদের শ্রমশোষণের কারবার এই সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করিবার মতো সুশাসন আমাদের দেশে নাই বলিলেই চলে। সুতরাং, আন্দাজ করিয়াই বলা সম্ভব উক্ত পরিসংখ্যানের তুলনায় বহুগুণ বেশি শিশু শ্রমের বিনিময়ে জীবিকা অর্জনে নিয়োজিত। জীবন ও শৈশবের বিনিময়ে অসংখ্য শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কর্মে নিয়োজিত এবং তাহাদের মধ্যে গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুরা অধিক ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছে। এসকল শিশু শিক্ষা লাভের সুযোগসহ সব ধরনের মৌলিক অধিকার হইতে বঞ্চিত। দৃষ্টির অন্তরালে এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বসবাস করিতেছে তাহারা।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যখন কোনো শ্রম বা কর্মপরিবেশ শিশুর জন্য দৈহিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক এবং সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায় ও ক্ষতিকর হইয়া দাঁড়ায় তখন তাহা শিশুশ্রম হিসেবে গণ্য হইবে। ১৯৯১ সালের ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদটি কার্যকর করা হয়। দীর্ঘ ২২ বছর ধরিয়া শিশু সনদটি বাংলাদেশে অনুশীলন করা হইয়াছে। তবু, বাংলাদেশে এখনও শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হয় নাই। বাংলাদেশ সরকার শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক করিয়াছে। বর্তমান সরকার দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে বই বিতরণ করিতেছে। কিন্তু তবুও শতভাগ শিশুর লেখাপড়া নিশ্চিত করা যায় নাই। উপরন্তু শিক্ষারত অবস্থায়ও প্রচ্ছন্নভাবে লক্ষ লক্ষ শিশু শ্রমের সঙ্গে জড়িত। এই শিশুদের যথাযথ পরিসংখ্যান কাহারও কাছে নাই। দেশের আইনে বলা হইতেছে, সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করিয়া শিশুকে শিক্ষা দিতে হইবে। শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০-এ বলা হইয়াছে, ২০১৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নিরসন করা হইবে। এই নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় কর্ম-পরিকল্পনা ২০১২-২০১৬ প্রণয়ন করাও হইয়াছে। কিন্তু, ১৯৭৪ সালে প্রথম শিশু রক্ষা আইন হইতে আজ ২০১৩ সালে আসিয়া শিশু রক্ষার্থে অনেক আইন হইলেও সেগুলির যথাযথ বাস্তবায়ন হইতেছে না। তদুপরি, প্রধান নীতি নির্ধারকদের শিশু আইন সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা রহিয়াছে। সর্বোপরি, আইন বাস্তবায়ন হইতেছে কিনা তাহা দেখিবার জন্য সঠিক মনিটরিং ব্যবস্থাও নাই। আর সেই কারণেই উল্লিখিত জরিপের ভয়াবহ চিত্রের মুখোমুখি হইতেছে যে ৯৪ ভাগ শিশু শ্রমিক তাহাদের ১০ ঘণ্টাধিক খাটিয়া জীবিকা উপার্জন করিতে হয়। আমাদের ভবিষ্যত্ নাগরিকদের সুষ্ঠুভাবে গড়িয়া তুলিতে মিডিয়া, সরকার, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সর্বোপরি জনসাধারণের দায়িত্বশীল চিন্তাভাবনা কবে গড়িয়া উঠিবে!