ঈদের আনন্দ বিনিময়

ঈদ উপলক্ষে এক কোটি পরিবারের মধ্যে বিনামূল্যে ১০ কেজি করিয়া চাল বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হইয়াছে। এই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হইতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হইয়াছে জেলা প্রশাসনকে। দেশের ৬৪টি জেলার ৪৮৬টি উপজেলা এবং ৩১৩টি পৌরসভার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে প্রায় এক লক্ষ মেট্রিক টন চাল। সরকারের ভিজিএফ কর্মসূচির মাধ্যমে এই চাল বিতরণ করা হইবে। তবে ইহার জন্য ১২টি শর্ত নির্ধারণ করা হইয়াছে। তন্মধ্যে ন্যূনতম ৪টি শর্ত পূরণসাপেক্ষে সকল ধর্মের মানুষই এই চাল পাইবেন। ইহার আপাত উদ্দেশ্য হইল ঈদকে সামনে রাখিয়া দুঃস্থ, দুর্গত ও অতিদরিদ্র মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া। তবে উদ্দেশ্য মহত্ হইলেও এই দেশে তাহার যথাযথ বাস্তবায়ন যে মোটেও সহজ নহে—তাহা সর্বজনবিদিত। সেই জন্যই কিছু শর্ত জুড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য একটাই—বরাদ্দকৃত চাল যাহাতে প্রকৃত দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষের হাতে পৌঁছায় তাহা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় মহাসেন, সাম্প্রতিক বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ারও নির্দেশনা প্রদান করা হইয়াছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ১০ কেজি চাল এমন কিছুই নহে। আর দারিদ্র্যের অথৈ সমুদ্রে যাহারা হাবুডুবু খাইতেছেন তাহাদের জন্য ইহা হয়তো সিন্ধু মধ্যে বিন্দুবত্। অন্যদিকে, যাহাদের মধ্যে এই চাল বিতরণ করা হইবে তাহাদের বৃহদাংশের ঈদ উদযাপন যে এই চালের উপর নির্ভরশীল নহে—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। বিষয়টি নিশ্চয় নীতিনির্ধারক মহলেরও অজানা নহে। বুঝিতে অসুবিধা হয় না যে, সরকারের আসল লক্ষ্য ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা। সীমিত সম্পদের এই দেশে ইহাই বা কম কী। অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, দারিদ্র্যের দুঃসহ থাবার মধ্যেই আমাদের বসবাস। দশকের পর দশক ধরিয়া এই অবস্থা চলিয়া আসিতেছে। বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীনতা পাইয়াছি—সেই স্বাধীনতারও প্রধান প্রেরণা ও অঙ্গীকার ছিল দারিদ্র্য হইতে মুক্তি। তবে সেই লক্ষ্য অর্জন করিবার জন্য যেই সময়, সম্পদ ও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন তাহার কোনোটাই আমাদের আয়ত্তে ছিল না। বরং দারিদ্র্যপীড়িত মানুষকে কোনোমতে বাঁচাইয়া রাখাই ছিল সর্বাপেক্ষা বড়ো চ্যালেঞ্জ। ফলে স্বাধীনতাপরবর্তী সকল সরকারই ব্যতিক্রমহীনভাবে সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচির উপর জোর দিয়াছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদল সত্ত্বেও অব্যাহতভাবে নিরাপত্তা বেষ্টনি সম্প্রসারিত হইয়াছে। বাড়িয়াছে বরাদ্দ এবং উপকারভোগীর সংখ্যা। স্বাধীনতাপরবর্তী গত চার দশকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় পরিবর্তন সত্ত্বেও সেই ধারাবাহিকতা এখনও অব্যাহত আছে। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশকে এখন খুঁজিয়া পাওয়া যে যথার্থই কঠিন শুধু বাজেটের আকারের দিকে তাকাইলেই তাহা স্পষ্ট হইয়া যায়। মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট লইয়া যেই বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হইয়াছিল, সেই দেশের সর্বশেষ বাজেটের (২০১৩-১৪) আকার ছিল প্রায় সোয়া দুই লক্ষ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বকে বিস্মিত করিয়া দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা নামিয়া আসিয়াছে এক-তৃতীয়াংশে। কমিয়াছে বৈষম্য। দর্শনীয়ভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে সামগ্রিক জীবনমানও। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হইল, উত্তরাঞ্চলের মঙ্গার মতোই উধাও হইয়া গিয়াছে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত দারিদ্র্যের সেই ভয়ঙ্কর ছবিটিও। দেশের কোথাও অনাহারে-অর্ধাহারে মৃত্যু এখন কল্পনাই করা যায় না। বিস্ময়কর এই সাফল্য সত্ত্বেও দিনের শেষে চাঁদের কলঙ্কের মতো যেই সত্যটি জাগিয়া থাকে তাহা হইল—এখনও প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের বসবাস দারিদ্র্যসীমার নিচে। অতএব, ঈদকে সামনে রাখিয়া এক কোটি পরিবারের মধ্যে চাল বিতরণের যেই উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করিয়াছে তাহাকে অপ্রয়োজনীয় কিংবা বাহুল্য মনে করিবার কোনোই কারণ নাই। বরং দুঃখে-দারিদ্র্যে নিষ্পেষিত মানুষের সাথে সরকারি উদ্যোগে আনন্দ ও সম্পদ ভাগাভাগি করিবার এই ধারা অব্যাহত রাখাই সমীচীন বলিয়া আমরা মনে করি।