তাহলে সুন্দরবন কি ধ্বংস হয়ে যাবে

বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন—সুন্দরবন কি সত্যিই বিলীন হয়ে যাবে। সুন্দরবনের পাশে যেসব প্রকল্প নেয়া হয়েছে তাতে দেশের তথা বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবন ধীরে ধীরে মৃত্যুমুখে পতিত হবে। পরিবেশবিদ সচেতন নাগরিক, তেল, গ্যাস, বিদ্যুত্ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জাতীয় কমিটি সকলের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ উপেক্ষা করে ভারতের সাথে বিতর্কিত রামপাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র সই করল বাংলাদেশ। এখন সুন্দবনের কাছে রামপালে ১৩০০ মেগাওয়াট এই কেন্দ্র নির্মাণ হলে ঝুঁকিতে পড়বে সুন্দরবন। রামপালের এই বিদ্যুত্ কেন্দ্রের পানি নেয়া হবে পশুর নদী থেকে যে নদীটি এমনিতেই শুকিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই নদীটিই সুন্দরবনের অনেকখানি অংশের জীবন প্রবাহ টিকিয়ে রাখছে। এতে করে বিরল প্রজাতির ডলফিন হারিয়ে যাবে। বাড়বে খুলনা অঞ্চলের লবণাক্ততা রাসায়নিক ক্ষতি যা হবে তা হচ্ছে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড, সালফার-ডাই-অক্সাইড, পারদ, আর্সেনিক, সীসা, ক্যাডিয়ামসহ পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদানের নির্গমন। তাছাড়া তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্রের কয়লা পুড়ে ছাই হয় এবং কয়লা ধোঁয়ার পর পানির সঙ্গে মিশে তৈরি হয় আরেকটি বর্জ্য-তরল কয়লা বর্জ্য এই উভয় বর্জ্য বিষাক্ত। এগুলোর তেজস্ক্রিয়তা সুন্দরবনের জৈবিক পরিবেশ ও বায়ুমণ্ডলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সুন্দরবনের পাশে এরকম একটি বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তির আগে অবশ্যই বনের পরিবেশের বিষয়টি গভীরভাবে দেখা দরকার ছিল। এখানেই শেষ নয়। সুন্দরবনের পাশে বলেশ্বর নদীতে স্থাপন করা হচ্ছে জাহাজভাঙ্গা শিল্প। একদিকে রামপাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র অন্যদিকে জাহাজভাঙ্গা শিল্প— দুই মিলে সুন্দরবনকে অচিরেই নিয়ে যাবে ধ্বংসের দিকে। বাংলাদেশে ভাল কাজের গতি না থাকলেও মন্দ কাজের গতি দ্রুত থেকে দ্রুত হতে সময় লাগে না। সারাবিশ্ব যখন পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য রক্ষায় সোচ্চার ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যতিব্যস্ত তখন আমরা নিজেরাই নিজেদের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্যকে নিয়ে যাচ্ছি ধ্বংসের দিকে। শুধু সুন্দরবন নয় পরিবেশ রক্ষার সকল ক্ষেত্রেই আমাদের ভূমিকা নেতিবাচকই বলতে হবে। বৃক্ষ নিধনের কথাই বলি। আমাদের একসময় বিশাল বনভূমি ছিল। দিনের পর দিন বনবিভাগের রাঘব-বোয়ালদের সহযোগিতায় আর যখন যারা ক্ষমতায় তাদের সমর্থক সন্ত্রাসীদের যোগসাজশে সরকারি গাছ কেটে বনভূমি বিরান করে দেয়া হয়েছে। এখনও কি বন্ধ আছে? সুতারং পরিবেশ ভারসাম্য হারিয়েছে। আবাসিক এলাকার যেটুকু বাগান ছিল, দিন দিন তা শেষ হচ্ছে। বাগান কেটে আবাদি ফসলের মাঠ কেড়ে নিয়ে, খাল ভরাট করে হচ্ছে বহুতল বাড়ি। ধুমসে চলছে হাউজিং ব্যবসা। কারা ব্যবসায়ী। ক্ষমতার কাছের মানুষ তারা। সবসময় প্রভাবশালী। অর্থবিত্ত আর দুর্নীতির কালো টাকা তাদের শক্তি। তাই নদী দখল শেষে এখন কেউ কেউ সাগর দখলেও মনোযোগ দিচ্ছে। এ এক সব সম্ভবের দেশ। সুতরাং পরিবেশ কে বাঁচাবে? বাঁচাতে পারত সরকার। কিন্তু আমাদের সরকার সবসময় লুটেরাদের, গাছ কাটা, লুটপাট, দখলকারদের ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখেন। কি কারণে দেখেন সেটা সহজবোধগম্য। বড় বড় নগরীর ঘরবাড়ির ছাদে এবং চারপাশে গাছপালা বাধ্যতামূলকভাবে থাকতে হবে। গ্রামে প্রতিটি পরিবারে গাছপালা, ফলদ বৃক্ষ লাগানোর সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে। নদী, খাল ও জলাশয়গুলো পুনরুদ্ধার ও রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা আইনের কঠোর প্রয়োগ চাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী পরিবেশবিষয়ক একাধিক আন্তর্জাতিক ফোরামের নেতৃত্ব দিয়ে পরিবেশের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এই দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছেন। যেমন কানকুন সম্মেলনসহ বিভিন্ন ফোরামের উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন তিনি গড়ার কথা বলেছেন। জলবায়ুর ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ দানে বিশ্বের পরিবেশ ও জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্টকারী ধনী দেশগুলোর চাপ প্রয়োগ করার কথা বলেছেন। অনেকখানি সফলও হয়েছেন এ আন্দোলনে। যারা কার্বন ছড়িয়ে তেল,গ্যাস পুড়িয়ে নিজেদের ভোগবাদী জীবন-যাপনে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন আমাদের মতো দেশগুলোর, তারা কেন ক্ষতিপূরণ দেবেন না? সেই চিত্র দেখে যদি চোখ ফিরাই নিজের দেশের পরিবেশের দিকে? নিশ্চিত হতাশ হবো আমরা। কারণ আমাদের আবহাওয়া জলবায়ু আমরা প্রতিদিন ধ্বংস করে চলছি। কিছুতেই আত্মঘাতী এই প্রবণতা বন্ধ করা যাচ্ছে না। অথবা কোন সরকারই এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কেন নিচ্ছে না? এই কেন এর জবাব পাওয়া যাবে পরিবেশ যারা নষ্ট করছে তাদের সামাজিক পরিচয়েই। এভাবে একটা দেশের পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য নষ্ট হতে দেয়া যায় না। এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে সচেতন মানুষকেই সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিতে হবে জনগণকেই। তাহলেই পরিবেশ বিনষ্টকারী সর্বনাশা প্রক্রিয়া হয়তো বন্ধ হবে। লেখক: পরিবেশবিদ Email: bccemccbabul@hotmail.com