ট্যাবলেট পিসি কিনবেন?

সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তি পণ্যের ধরন বদলে যাচ্ছে। একটা সময় কম্পিউটারের বিকল্প কোনো ডিভাইস চিন্তাও করা যেত না। ডেস্কটপ কম্পিউটার যে ল্যাপটপ বা নোটবুকের গণ্ডি পেরিয়ে ট্যাবলেট পিসি’র আকারে আক্ষরিক অর্থেই হাতের মুঠোয় চলে আসবে, তাই বা কয়জন চিন্তা করতে পেরেছে দশ বছর আগে? ২০১০ সালে এসে অ্যাপল’র প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম প্রতিভাবান উদ্ভাবক প্রয়াত স্টিভ জবসের হাত ধরে বাজারে প্রবেশ করে বিশ্বের প্রথম ট্যাবলেট পিসি আইপ্যাড। তারপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। সময়ের পরিক্রমায় যখন ট্যাবলেট পিসিই দখল করে নিচ্ছে প্রযুক্তি পণ্যের বাজার। ল্যাটপ কিংবা ডেস্কটপের বাজারও কমে যাচ্ছে ট্যাবলেট পিসির আগ্রাসনেই। শুরুটা আইপ্যাডের হাতে হলেও বিশ্বব্যাপী ট্যাবলেট পিসির বাজারটা জমজমাট। স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি ট্যাব থেকে শুরু করে অ্যামাজনের কিন্ডল ফায়ার, গুগল’র নেক্সাস ১০ বা নেক্সাস ৭, মাইক্রোসফটের সারফেস ছাড়াও বড় বড় সব প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতাই তৈরি করেছে ট্যাবলেট পিসি। এর বাইরে স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও স্থানীয় প্রযুক্তি ব্র্যান্ডগুলো ঝুঁকে পড়েছে ট্যাবলেট পিসির দিকে। বৈচিত্র্যময় ডিজাইন আর আকার ছাড়াও দামেও রয়েছে ভিন্নতা। কিন্তু এই বিশাল ট্যাবলেট পিসির বাজারে কোন ট্যাবলেটটি আপনি কিনবেন? কোন ট্যাবলেটটি আপনার প্রয়োজনে ভালো পারফর্মেন্স দেবে? এসব প্রশ্ন নিয়েই ট্যাবলেট পিসি কেনার নির্দেশনামূলক এই লেখা। ট্যাবলেট কেনার ৩ শর্ত ট্যাবলেট পিসি কিনতে চাইলে অনেক ধরনের প্রশ্নের ভিড়ে তিনটি প্রশ্নের জবাব পাওয়াকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এই তিনটি বিষয়ে জবাব মিললেই প্রয়োজনীয় ট্যাবলেটটি খুঁজে পেতে সহজ হবে। ১. আপনার কাজের বিষয় :ট্যাবলেট পিসি কিনতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটির জবাব আপনাকে পেতে হবে, তা হলো একে আপনি কোন কাজে ব্যবহার করবেন। এটি কি আপনার পিসির বিকল্প হিসেবে কাজ করবে নাকি কেবল ভ্রমণের সময় ছবি দেখা, গান শোনা, ভিডিও দেখার কাজগুলো করবেন? যে কাজেই হোক না কেন, তার উপরেই নির্ভর করবে আপনার ট্যাবলেট পিসি। সার্বক্ষণিক ইন্টারনেটের প্রয়োজনীয়তা, স্টোরেজ ক্যাপাসিটি কিংবা এইচডিএমআই থাকা না থাকা এটি পছন্দ করতে ভূমিকা রাখবে। ২. দামই সব নয় :পণ্যের দামটা একটু বেশি হবে, সেটা স্বাভাবিক। তবে তাই বলে দামি পণ্যই সর্বোচ্চ মানের নিশ্চয়তা প্রদান করবে না। কমদামি পণ্যটিও গুণে-মানে ভালো হতে পারে। কোনো কোম্পানি তাদের লাভের পরিমাণ একেবার কমিয়েও কম দামে পণ্য দিতে পারে। আবার অ্যাপল’র মতো প্রতিষ্ঠানের পণ্যগুলো গুণে-মানে যেমন, তেমনি দামেও উর্ধ্বমুখী। ৩. নির্মাতা প্রতিষ্ঠান :প্রযুক্তি পণ্য কেনার ক্ষেত্রে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কম্পিউটার বা এই ধরনের প্রযুক্তি পণ্যের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি প্রযোজ্য। প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তার সাথে ভালো নির্মাতাই পুরোনো পণ্যের প্রয়োজনীয় আপডেটগুলো সঠিকভাবে প্রদান করতে পারে। কোন প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যে কত দ্রুত আপডেট প্রদান করে থাকে, সেটা জেনে নেওয়া ভালো। ট্যাবলেট পিসির আকার ৭ ইঞ্চি থেকে শুরু করে ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত সাধারণত ট্যাবলেট পিসি পাওয়া যায়। তবে এর বড় ট্যাবলেটও রয়েছে বাজারে। এগুলোর কোনটা কেমন? সেটা জেনে নিতে হবে আগেই। আকৃতির দিক থেকে এগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ছোট ট্যাবলেট :ছোট আকারের ট্যাবলেট পিসিগুলো ৭ ইঞ্চি থেকে ৮.১ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই ট্যাবলেট পিসিগুলো সাধারণত দামে কম হয় এবং এদের কর্মক্ষমতাও কিছুটা কম হয়। তবে আকারে ছোট হওয়ার কারণে ওজন কমে যায় এবং বহনেও সুবিধা হয়। চওড়ায় কম হলে পকেটেও এঁটে যেতে পারে এগুলো। ওজনে ও আকারে কম হয় বলে ই-রিডার হিসেবে এগুলো অত্যন্ত উপযোগী। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ই-বুক পড়া বা অনান্য কাজের জন্য যারা ট্যাবলেট পিসি কিনতে চান, তারা এসব ছোট ট্যাবলেট পছন্দ করতে পারেন। মাঝারি ট্যাবলেট :বাজারের বেশিরভাগ ট্যাবলেট পিসি পাওয়া যায় এই আকৃতির ক্যাটাগরিতে। ডিসপ্লে’র আকারের সাথে সাথে এতে রেজ্যুলেশনও বেশি পাওয়া যায়। সিনেমা দেখা বা গেম খেলার জন্য এই আকারটা বেশ ভালো। এগুলোর প্রসেসর তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। ফলে এতে ছবির মান ভালো হয় এবং গেমও অ্যাপ্লিকেশনগুলো অনেক বেশি ইন্টার্যাকটিভ হয়ে উঠে। বড় ট্যাবলেট :১০.১ ইঞ্চির চাইতে বড় আকারের ট্যাবলেট পিসি বাজারে কিছুটা কম হলেও উইন্ডোজ ৮ ব্যবহার করে এই ধরনের বেশ কিছু ট্যাবলেট পিসি বাজারে এসেছে এবং আসার অপেক্ষায় রয়েছে। এদেরকে ‘হাইব্রিড’ ডিভাইসও বলে থাকেন অনেকে। এগুলোর বড় সুবিধা হচ্ছে, আকারে বড় হওয়ায় কনফিগারেশনের দিক থেকে এগুলো উচ্চতর হয় এবং এতে করে এদের কাজের ক্ষমতা বাড়ে বহুগুণ। তবে দামের দিক থেকেও এগুলো বেশিই হয়ে থাকে। প্রসেসর ট্যাবলেট পিসি’র জন্য এর প্রসেসর হচ্ছে অন্যজন প্রধনা একটি বিবেচ্য বিষয়। বাজারে সবচেয়ে ভালো যে প্রসেসরগুলো রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে জানানো হলো এখনে। অ্যাপল এ৬এক্স :বাজারে ট্যাবলেট পিসির জন্য বিশেষায়িত যে প্রসেসরগুলো রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যাপল এ৬এক্স। চতুর্থ প্রজন্মের আইপ্যাডে ব্যবহূত হয়েছে এটি। গেম, অ্যাপ্লিকেশন প্রভৃতি দ্রুত চালাতে সক্ষম এই প্রসেসর, যাতে রয়েছে কোয়াড কোরের জিপিইউ। এনভিডিয়া টেগরা :এনভিডিয়া’র টেগরা সিরিজের সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে কয়েকমাসের মধ্যেই বাজারে আসছে টেগরা ৪। এই প্রসেসর ব্যবহার করেই বাজারে আসতে যাচ্ছে এনভিডিয়া’র নিজস্ব গেম কনসোল শিল্ড এবং তোশিবার দুইটি ফ্ল্যাগশিপ ট্যাবলেট পিসি। এতে রয়েছে ৪টি হাই-পারফরর্মেন্স সিপিইউ এবং ৭২ কোরের (!) জিপিইউ। ফলে গেম, ভিডিও আর অ্যাপ্লিকেশন চালাতে এটিও পারদর্শী হগবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্যামসাং এক্সিনস :ট্যাবলেট প্রসেসর হিসেবে স্যামসাংয়ের এক্সিনস সিরিজও পারফর্মেন্সের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। তবে এই প্রসেসরের সমস্যা একটাই—এটি ব্যবহার করে তৈরি ডিভাইসে ব্যাটারির চার্জ দ্রুত ফুরিয়ে যায়। এই সিরিজে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে অক্টো ৫। শ্রীঘ্রই বাজারে আসতে যাওয়া এই প্রসেসরের ব্যাটারি চার্জের সমস্যা থাকবে না বলেই জানিয়েছে স্যামসাং। কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন :সনির এক্সপেরিয়া জেডের মতো ট্যাবলেট পিসিতে ব্যবহূত হয়েছে কোয়ালকমের স্ন্যাপড্রাগম এস৪ প্রসেসর। তবে পাইপলাইনে থাকা ৬০০ এবং ৮০০ সিরিজের কোয়ালকম প্রসেসরগুলো স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসরের সবার চ াইতে অনেক বেশি দ্রুতগতির এবং অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন বলে জানিয়েছে কোয়াল কম। সেগুলোতে ব্যাটারির চার্জও ফুরাবে কম। ডিসপ্লের মান ট্যাবলেট পিসিতে ঝকঝকে-তকতকে ছবি দেখতে এবং ভিউ অ্যাঙ্গেলের সমস্যায় না পড়তে হলে ট্যাবলেট পিসির স্ক্রিন রেজ্যুলেশন এবং প্যানেল টাইপের দিকে নজর দিতে হবে। এখন পর্যন্ত ট্যাবলেট পিসির ডিসপ্লের সর্বোচ্চ রেজ্যুলেশন রয়েছে গুগল নেক্সাস ১০-এ, যার মান ২৫৬০ বাই ১৬০০ পিক্সেল। তবে ১৮০০ বাই ১২০০ রেজ্যুলেশনের ডিসপ্লেও ভালো ছবি প্রদর্শনে সক্ষম। মনে রাখবেন, রেজ্যুলেশন যত বেশি হবে, ছবি তত ঝকঝকে হবে। এর পাশাপাশি ভিউ অ্যাঙ্গেল নির্ভর করে প্যানেলের উপর। ছবির রঙ কতটা নিঁখুতভাবে প্রদর্শিত হবে, তাও এর উপরেই নির্ভর করবে। সেক্ষেত্রে আইপিএস (ইন প্লেন সুইচিং) এবং পিএলএস (প্লেন লাইন সুইচিং) প্যানেলগুলোই সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করবে। অপারেটিং সিস্টেম ও সফটওয়্যার ট্যাবলেট পিসির পছন্দের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে অপারেটিং সিস্টেম এবং সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম। একদম নিজস্ব ইকোসিস্টেম এবং ব্যবহারবান্ধব ইন্টারফেস নিয়ে এদিকে শুরু থেকেই এগিয়ে রয়েছে আইওএস। তবে সময়ের সাথে সাথে গুগল’র অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমও বাজিমাত করেছে। আইওএস-এর সাথে পাল্লা দিয়েই গড়ে উঠেছে অ্যান্ড্রয়েডের ইকোসিস্টেম। ওপেন সোর্স প্ল্যাটফর্ম হওয়ায় দ্রুত ডেভেলপাররা এর দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এতে করে তৈরি হয়েছে প্রচুর পরিমাণ অ্যাপ্লিকেশন। এ ছাড়া অ্যানড্রয়েড ব্যবহার করে কেবল ট্যাবলেট পিসি বা স্মার্টফোনই নয়; রেফ্রিজারেটর, ওভেন, রেবটসহ নানা ধরনের ডিভাইস তৈরি হচ্ছে। ফলে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে সব জায়গায়। এর বাইরে উইন্ডোজ ৮ বা উইন্ডোজ আরটি অপারেটিং সিস্টেমও বাজারে এসেছে শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করতেই। উইন্ডোজ ইকোসিস্টেমে অত্যন্ত পিসি ব্যবহারকারীদের ট্যাবলেট ও উইন্ডোজ অভ্যস্ত হতে সহজ হবে। স্টোরেজ অপশন ট্যাবলেট কিনতে আরেকটি বিবেচ্য বিষয় এর স্টোরেজ। মুভি, অডিও, ভিডিও, ই-বুকসহ নানা ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট বাড়তি স্টোরেজ দাবি করেই। সেক্ষেত্রে বিল্ট-ইন স্টোরেজ যত বেশি হয়, তত ভালো। পাশাপাশি মাইক্রোএসডি বা অন্য ফরম্যাটের বাড়তি স্টোরেজ সর্বোচ্চ কতটুকু পর্যন্ত সমর্থন করবে, সেটাও জেনে নিনন। বিল্ট-ইন স্টোরেজ একটু কম হলেও ৩২ জিবি তার বেশি মাইক্রোএসডি ব্যবহারের সুবিধা থাকলে সহজেই স্টোরেজ বাড়িয়ে নিতে পারবেন।