ভর্তি লইয়া ভোগান্তি কি শেষ হইবে না
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪৭
ভর্তি লইয়া শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির বিষয়টি জানেন সকলেই। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে ভর্তির বিদ্যমান পদ্ধতিটি যে ত্রুটিপূর্ণ, ব্যয়বহুল ও কোচিংনির্ভর—তাহাও নীতিনির্ধারক মহলের অজানা নহে। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীও এই ব্যাপারে তাহার অসন্তোষ গোপন করেন নাই। এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের প্রতিক্রিয়া জানাইতে গিয়া গত শনিবার তিনি আক্ষেপ করিয়াই বলিয়াছেন যে, ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষা তো একবার দিলই, রেজাল্টের উপর ভিত্তি করিয়া যাহার যেইখানে ইচ্ছা ভর্তি হইবে, এতো পরীক্ষার দরকার কী? প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে যে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী এবং তাহাদের অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের অব্যক্ত বেদনা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ভর্তির বিষয়টি গত কয়েক বত্সর যাবত্ আলোচিত হইয়া আসিতেছে। এইবার ফল প্রকাশের আগে ইহা লইয়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সাথে বৈঠকও করিয়াছেন শিক্ষামন্ত্রী। গত ৭ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে পাবলিক মেডিক্যাল কলেজসমূহের মতো সমন্বিত বা গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের বিষয়ে একমতও হইয়াছেন তাহারা। কিন্তু ফলাফল সেই ‘পুনর্মুষিক ভব’। অর্থাত্ ভোগান্তি বলবত্ থাকিবে। বিদ্যমান পদ্ধতিতেই অনুষ্ঠিত হইবে সকল ভর্তিপরীক্ষা। সরকারের প্রধান নির্বাহী হইতে শুরু করিয়া শিক্ষামন্ত্রী অবধি সকলে একমত হইবার পরও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি পোহাইতে হইবে কেন—তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। বলা হইতেছে, সময়ের অভাব। স্বাভাবিকভাবে করদাতা জনগণ কিংবা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জিজ্ঞাসা করিতে পারেন যে, আপনারা যথাসময়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করিলেন না কেন? সেই সাথে প্রশ্ন তুলিতে পারেন তাহাদের উদ্দেশ্যের সাধুতা লইয়াও।
বিদ্যমান পদ্ধতিতে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা যে নানাভাবে দুর্ভোগের শিকার হইতেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের এক গবেষণায়ও তাহা প্রতীয়মান হইয়াছে। দুর্ভোগ লাঘবে পাবলিক মেডিক্যাল কলেজের আদলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে সাধারণ, প্রকৌশল ও কৃষি—এই তিনটি গুচ্ছে বিভক্ত করিয়া সমন্বিতভাবে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের সুপারিশ করা হইয়াছিল। ভোগান্তি শুধু নয়—ভর্তির বিদ্যমান পদ্ধতিটি যে ব্যয়বহুলও বটে, ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনেও তাহার স্বীকৃতি রহিয়াছে। এই পদ্ধতিতে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে অন্তত ৬ হইতে ১০টি ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হইতে হয়। ছুটোছুটি করিতে হয় দেশের এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত অবধি। ইহার পরও একই সময়ে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে সকল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয় না অনেকের পক্ষে। ইহাছাড়াও দীর্ঘসময় ধরিয়া কোচিং সেন্টারে দৌড়ঝাঁপের অর্থনৈতিক চাপ ও বিড়ম্বনা তো আছেই। এই সুযোগে প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ অনৈতিক পন্থায় কোচিং সেন্টারগুলির ভর্তিবাণিজ্যের অভিযোগও নূতন নহে। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে এই ধরনের নানা সমস্যার বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রীও স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিকারের কোনো পদক্ষেপ অদ্যাবধি গৃহীত হয় নাই। বরং শিক্ষামন্ত্রী বলিয়াছেন যে, ‘সময় কম থাকায়’ এইবারও আগের মতোই পরীক্ষা হইবে। পাঁচ বত্সর মেয়াদকালের একেবারে শেষ পর্যায়ে আসিয়াও যখন কোনো মন্ত্রী এই ধরনের খোঁড়া অজুহাত দেখান তখন অধিক শোকে পাথর হওয়া ছাড়া আর কীই বা করার থাকে!
ভর্তি লইয়া শিক্ষার্থীদের দীর্ঘকালীন দুর্ভোগ লাঘবে অবিলম্বে যথাযথ পদক্ষেপ গৃহীত হইবে ইহাই প্রত্যাশিত। আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী যেইভাবে সমস্যাটি অনুধাবন করিয়াছেন, এতদসংক্রান্ত নীতিনির্ধারণেও তাহার যথোচিত প্রতিফলন ঘটিবে।