অসহিষ্ণু রাজনীতি ও বিলবোর্ড বিতর্ক

রোজার মাসেও এবার দেশের রাজনীতি কেবল ইফতার পার্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইফতার রাজনীতি শুরু হয়েছিল মূলত এরশাদ আমলে, যখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক তত্পরতা সামরিক শাসনের বিধিনিষেধের কারণে সহজ ছিল না। কিন্তু তারপর ক্রমেই রাজনীতিতে ইফতার কালচার জমজমাট হয়ে উঠেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দেশে যে অসংযমের রাজনীতির চর্চা চলছে তার আঘাত এবার সিয়াম সাধনার মাসেও লেগেছে। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযম এবং বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রোজার মধ্যেই জামায়াতে ইসলামী পরপর ৪ দিন হরতাল দিয়েছে। আজকাল কোনো হরতালই আর শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয় না। ভয়ভীতি দেখিয়ে হরতাল পালনে বাধ্য করা হয়। রোজার মাসে জামায়াতের ডাকা ৪ দিনের হরতালেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা হয়েছে। অসংখ্য যানবাহনে আগুন দেয়া হয়েছে, ভাংচুর করা হয়েছে। কমপক্ষে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। পবিত্র রোজার মাসে এই নৃশংসতা জামায়াতের মতো একটি ‘ইসলামী’ দলের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। হাইকোর্টের এক রায়ে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক- মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালো হয়ে উঠলেও সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ও এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। আদালতের রায়ের কারণে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের অস্তিত্ব টিকে থাকলেও তারা দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। আদালতের এই রায় জামায়াতের পছন্দ হয়নি। রায়ের মধ্যে তারা ‘সরকারের গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ খুঁজে পেয়েছে এবং রায়ের প্রতিবাদে আগামী ১৩ ও ১৪ আগস্ট দেশব্যাপী ৪৮ ঘণ্টার টানা হরতাল ডেকেছে। প্রথমে ১২-১৩ আগস্ট এই হরতাল ডাকা হলেও পরে তা একদিন পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। আপনজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য নাড়ির টানে যারা বাড়ি ফেরেন, এবার তারা জামায়াতের হরতালের ফাঁদে পড়ে সংকটে পড়েছেন। জামায়াতি হরতাল অসংখ্য মানুষের ঈদের আনন্দ মাটি করে দিয়েছে। যারা পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকার বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তাদের অনেকেই সেটা বাদ দিয়েছেন ফিরে আসার অনিশ্চয়তার কারণে। রোজার শুরুতেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ইফতার পার্টিতে দাওয়াত করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি রাজনীতিতে কিছুটা সুবাতাস ছড়িয়েছিল। সংবাদপত্রে খবর বের হয়েছিল সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল বিএনপির ইফতার পার্টিতে যোগদান করবে। এই খবরে রাজনীতিতে আগ্রহী অনেকেই উত্সাহিত হয়েছিলেন। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে বৈরিতা কমে আসুক, দুই দলের নেতারা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় উপনীত হোক, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে রাজনীতির আকাশে সংকটের যে কালো মেঘ দেখা দিয়েছে তা কেটে যাক—এটা দেশের সব মানুষই মনে-প্রাণে কামনা করছে। সেজন্যই বিএনপির ইফতারে আওয়ামী লীগ নেতারা যাবেন এবং তারপর আওয়ামী লীগের ইফতারে উপস্থিত হবেন বিএনপি নেতারা—এমন একটি সুন্দর দৃশ্য মানুষ কল্পনা করতে না করতেই আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত বদল করে বিএনপির ইফতারে অনুপস্থিত থাকে। তারপর থেকেই সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা বিভিন্ন ইফতার পার্টি কিংবা ঘরোয়া সভা-সমাবেশে পরস্পরের প্রতি হুমকি পাল্টা হুমকি দিতে থাকেন। এসব হুমকি-ধমকির কারণে ঈদের পর দেশের রাজনীতি কোনদিকে মোড় নেবে তা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দুই দলের নেতাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে সংঘাত-সংঘর্ষ যেন অনিবার্য। রোজার আগে ৫ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের ফলে সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে যে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে তা কাটিয়ে উঠার জন্য নানা প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে এমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না যা থেকে মনে হতে পারে যে, আওয়ামী লীগ সত্যি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। রোজার মাসে যুবলীগের এক ইফতার পার্টিতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি বক্তব্য আওয়ামী মহলে যেমন কিছুটা চাঙ্গাভাব ফিরিয়ে এনেছে, তেমনি বিরোধী মহলে জন্ম দিয়েছে বিতর্কের। জয় বলেছেন, তার কাছে তথ্য আছে, আগামী নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগই আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে। জয়ের এই আশাবাদ স্বাভাবিকভাবেই বিএনপির মাথায় বজ্রাঘাতের মতো। কারণ ৫ সিটি নির্বাচনের পর তারা ধরেই নিয়েছে যে, তাদের ক্ষমতায় যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। অথচ জয় কিনা বলছেন তার কাছে তথ্য আছে আওয়ামী লীগের জেতার! বিএনপি মনে করছে, তথ্যফত্য কিছুই নয়, এটা আসলে আওয়ামী লীগের ‘নীল নকশা’। আওয়ামী লীগ যে নিজেদের অধীনে নির্বাচন করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে জয়ের কথায় তাই স্পষ্ট হয়েছে। এজন্যই তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ঈদের পর কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বলছেন। জয়ের বক্তব্যের বিরূপ সমালোচনা করে কথা বলার আগে বিএনপি নেতারা কি একবারও ভেবে দেখেছেন যে, নির্বাচনের আগে নিজের বা নিজ দলের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করাটা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। নির্বাচনের আগে সব দলই দাবি করে থাকে তারাই জিতবে। এটা কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ নয়। বিএনপি সরকারে থাকতে দলের নেতারা যখন বলতেন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ৩০টির বেশি সিট পাবে না তখন সেটা কি তাহলে নীল নকশার অংশ হিসেবেই বলতেন? বেগম জিয়া একবার বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ আগামী ৪০ বছরেও আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তিনি কিসের ভিত্তিতে? দলীয় কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করা এবং বিরোধী পক্ষকে চাপের মধ্যে রাখার কৌশল হিসেবেই রাজনৈতিক নেতারা নির্বাচনের জয়-পরাজয় নিয়ে নানা ধরনের কথা বলে থাকেন। এসব কথা শতভাগ সত্য বলে ধরে নিয়ে পানি ঘোলা করার কোনোই অর্থ হয় না। বিএনপি নেতারা যে এখন বলছেন আগামী নির্বাচনে তারাই জিতবেন, সেটা কি কোনো নীল নকশা অনুযায়ী বলছেন? বিএনপি নেতারা তাদের জয়ের ব্যাপারে এবং আওয়ামী লীগের পরাজয়ের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করলে যদি রাজনীতির মহাভারত অশুদ্ধ না হয় তাহলে আওয়ামী লীগের কেউ তাদের জয়লাভের কথা বললেই সেটা ষড়যন্ত্র বা নীল নকশা হতে যাবে কেন? সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য নিয়ে বিতর্কের শেষ হতে না হতেই রোজার একেবারে শেষে এসে সরকার এবং আওয়ামী লীগ বিলবোর্ড বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। ক’দিন আগে হঠাত্ করেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারের উন্নয়ন কাজের বিবরণ দিয়ে বেশ কিছু বিলবোর্ড লাগানো হয়। বিলবোর্ডগুলোতে যেহেতু সরকারের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সেহেতু ধরে নেয়া যায় এটা সরকার কিংবা সরকারি দলের কাজ। কিন্তু বিলবোর্ডের কোথাও লেখা নেই কাদের পক্ষ থেকে এই বিলবোর্ডগুলো লাগানো হয়েছে। এটা উল্লেখ থাকা উচিত ছিল। গণমাধ্যমে এ নিয়ে হইচই শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে সরকার বা সরকারি দল নিজেদের প্রচারণা চালানোর জন্য অবৈধভাবে অন্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিলবোর্ড জবরদখল করেছে। বিলবোর্ডগুলো আইন মেনে লাগানো হয়নি। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার নিজেদের সাফল্য প্রচার করতে গিয়ে নিয়ম-নীতি মেনে না চলায় বিতর্কের মুখে পড়েছে। সরকারি সাফল্য প্রচারের লক্ষ্যে প্রস্তুত বিলবোর্ড নিয়ে বিএনপি নেতারাও কটাক্ষ করে বক্তব্য দিচ্ছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিলবোর্ড লাগিয়ে কোনো লাভ নেই, এতে পতন ঠেকানো যাবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, বিলবোর্ড লাগানোর কারণে যদি সরকারের পতন ঠেকানো না যায় তাহলে তো বিএনপির গা-জ্বলার কোনো কারণ থাকতে পারে না। বিএনপি তো সরকারের পতনই চায়। বিলবোর্ড লাগানোর কারণে যদি পতন ত্বরান্বিত হয় তাহলে তো বিএনপির উচিত আপত্তি না তুলে আওয়ামী লীগ বা সরকারকে আরো বেশি বেশি বিলবোর্ড লাগানোর পরামর্শ দেয়া। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেছেন, বিলবোর্ড তৈরি ও টানানোতে নাকি ৬০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। তিনি এই টাকার উত্স জানতে চেয়েছেন। এটা জানতে চেয়ে তিনি অন্যায় করেননি। রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের তথ্য দেশের মানুষের জানার অধিকার আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিএনপি নেতার আওয়ামী লীগের বিলবোর্ডের টাকা কোথা থেকে এসেছে সেটা জানতে চাইলেও বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের জন্য যে অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে তার উত্স সম্পর্কে তথ্য দেশের মানুষকে জানাবেন কি? বিলবোর্ডের ব্যয় যে ৬০ কোটি টাকা হয়েছে এই তথ্যইবা বিএনপি নেতা কার কাছ থেকে পেয়েছেন? এটা কি যারা বিলবোর্ড তৈরি করেছে তাদের কাছ থেকে পাওয়া, নাকি এম কে আনোয়ারের মনগড়া হিসাব? এ ধরনের অনুমাননির্ভর তথ্য ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা ছাড়া আর কিছু করা যায় বলে মনে হয় না। সরকার বা আওয়ামী লীগের সাফল্যগাথা নিয়ে যারা সমালোচনা করছেন তারা কি এইসব বিলবোর্ডে যেসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে তার কোনোটা অসত্য বলে প্রমাণ করতে পারবেন? বিলবোর্ডের তথ্যগুলো যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে এটা নিয়ে উত্তেজনা ছড়ানোর উদ্দেশ্য কি আওয়ামী লীগ যা করবে তাকেই বিতর্কিত করার অপপ্রয়াস, না অন্য কিছু? লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট Bibhu54@yahoo.com