জাতীয় জাদুঘরের উন্নয়ন
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৩, ২২:০৫
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হইল গত ৭ আগস্ট তারিখে। ১৯১৩ সালের এই দিনে তত্কালীন বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল নবগঠিত পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় নবনির্মিত সচিবালয়ের (বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) একটি কক্ষে ‘ঢাকা জাদুঘর’ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। পরে ইহাই আমাদের জাতীয় জাদুঘরের রূপ পরিগ্রহ করে। কিন্তু আজ ইহার আরও উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ব্যাপারে জাদুঘরবিদরা শংকিত হইয়া পড়িয়াছেন। নানা কারণে ইহার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হইতেছে বলিয়া জানা যায়। যদিও বর্তমান সরকারের আমলে নিরাপত্তা ও ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম আগাইয়া চলিয়াছে এবং ইহার পঞ্চম ও ৬ষ্ঠ শাখা বাস্তবায়নাধীন রহিয়াছে, তথাপি জাতীয় জাদুঘরের আছে বহুবিধ সমস্যা। যেমন— ইহার নূতন নূতন নিদর্শন সংগ্রহ প্রক্রিয়া গতিশীল নহে। এশিয়ার অন্যতম বৃহত্ এই জাদুঘরটির সমপ্রসারণ জরুরি হইলেও তাহা আমলে নেওয়া হইতেছে না। অভিজ্ঞমহলের দাবি, ৩০ বত্সর আগে জারি করা সামরিক অধ্যাদেশটি যুগোপযোগী করিয়া সংশোধন ও ইহাকে আইনে পরিণত না করিবার কারণে অনেকক্ষেত্রে জটিলতার অবসান হইতেছে না।
উল্লেখ্য, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এইচএম এরশাদের আমলে ‘দি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩’ জারি করা হয়। এই অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে ঢাকা জাদুঘরকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে পরিণত করা হয়। এই পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু অধ্যাদেশটি তাড়াহুড়া করিয়া পাস করায় পরবর্তীতে ইহার অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে নিদর্শন রহিয়াছে ৮৬ হাজার ৫শত ১৪টি। ইহার মধ্যে প্রথম মহাপরিচালক ড. এনামুল হক ও পরবর্তীতে মহাপরিচালক ড. ফিরোজ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালে সংগৃহীত হয় সর্বোচ্চ সংখ্যক তথা ৫৫ হাজার ৮৯৮টি নির্দশন। অর্থাত্ তাহাদের পর নিদর্শন সংগ্রহের হার ক্রমাগতভাবে কমিয়া গিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, জাতীয় জাদুঘরের কিছু সম্পত্তি হাতছাড়াসহ ইহার মূল্যবান নিদর্শন চুরির ঘটনাও ঘটিয়াছে। এইগুলি সংরক্ষণ ও রক্ষণা-বেক্ষণে অধিক মনোনিবেশের প্রয়োজন। বর্তমানে বত্সরে জাতীয় জাদুঘর দর্শনার্থীর সংখ্যা ৭ লক্ষেরও কম। অথচ ইহাই একসময় ছিল ১৭ লক্ষ। তাহাছাড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী জাতীয় জাদুঘরের জন্য সঠিক রূপরেখা ও গাইডলাইন নাই। তাই নানা সমস্যা তৈরি হইতেছে। অধ্যাদেশে জাদুঘরের মহাপরিচালকের নিয়োগ ও যোগ্যতা সম্পর্কে কিছু উল্লেখ নাই। ইহা একটি মারাত্মক ত্রুটি বলিয়া অনেকে মনে করেন। ইহার কারণে অনভিজ্ঞ ও জাদুঘরের প্রতি দরদ-ভালবাসা নাই এমন ব্যক্তিরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়োগ পাইতেছেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হইল, সামরিক শাসনামলে যাহাদের নিয়োগ দেওয়া হয় তাহাদের যোগ্যতা নিয়া কোন প্রশ্ন উঠে নাই। তাহা হইলে এখন কেন হইতেছে? ইহাছাড়া অধ্যাদেশে জাতীয় জাদুঘরের স্থাবর সম্পত্তির কোন তফসিল সংযুক্ত করা হয় নাই যাহা একটি বড় ভুল। অর্থাত্ ইহার অবস্থান সম্পর্কে কিছু বলা হয় নাই। ইহার কারণে জমি বেহাত হইয়া যাওয়া অস্বাভাবিক নহে। অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পুরাকীর্তি ছাড়া বাংলাদেশের সকল পুরাকীর্তির তালিকা প্রণয়ন এবং এইগুলির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছে জাতীয় জাদুঘরকে। অথচ অ্যান্টিকিউটি অ্যাক্ট অনুযায়ী এই কাজ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর আগে হইতেই করিতেছে। এখানে বিষয়টি সাংঘর্ষিক, তাই স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সর্বোপরি প্রতি অর্থবত্সর শেষে জাদুঘরের বাত্সরিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত।
জাতীয় জাদুঘরের বর্তমান মহাপরিচালক জানাইয়াছেন যে, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশটি সংশোধনপূর্বক তাহা আইনে পরিণত করিবার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আমরা আশা করি, এই সরকারের আমলেই কাজটি সুসম্পন্ন হইবে। জাতীয় জাদুঘরের নিদর্শন সংগ্রহ বৃদ্ধি, তাহা যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও জাদুঘর সমপ্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। জাতীয় জাদুঘরকে এমনভাবে সাজাইতে হইবে যাহাতে বাংলাদেশের সভ্যতার বিবর্তন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ ধারণা লাভ করা যায়। এজন্য অভিজ্ঞ, গবেষক ও যোগ্য লোককে ইহার সর্বোচ্চপদে নিয়োগ দিতে হইবে। ইহাকে কেন্দ্র করিয়া জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী গড়িয়া তৃুলিতে হইবে ইনস্টিটিউট অব হিস্টরি অ্যান্ড মিউজিওলজি।