সাংবিধানিক বনাম গ্রহণযোগ্য নির্বাচন

সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছিল। সে অনুযায়ী ২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে কমিশনকে। কিন্তু সংবিধান নির্দেশিত সময়ে আগামী নির্বাচন হতে পারবে কি-না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ আছে। দুই কারণে যথাসময়ে ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন আয়োজন নিয়ে শঙ্কা প্রতিনিয়ত প্রবলতর হচ্ছে। প্রথমত, নির্বাচন দলীয় সরকার, না নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে এ প্রশ্নের সুরাহা হয়নি। রাজনীতিতে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে চলমান সংকটের মীমাংসা না হওয়ায় এবং সরকার ও বিরোধী দলের স্ব স্ব দাবিতে অনড় অবস্থানের কারণে দেশে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা দিন দিন জোরালো হচ্ছে। এই সংঘাত-সহিংসতায় দেশের রাজনীতির গতিপথ কোনদিকে যায়, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের আর বেশি সময় বাকি নেই; অথচ নির্বাচন কমিশন তার নির্বাচনী প্রস্তুতি শেষ করতে পারেনি। নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এছাড়া নির্বাচনী বিধিমালায় কয়েকটি ধারা সংযোজন, বিয়োজন ও সংশোধন করতে গিয়ে নিজেকে বিতর্কে জড়িয়ে ফেলেছে নির্বাচন কমিশন। এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার সদিচ্ছা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠায় তা চলমান সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ঈদের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরে। পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন শেষ হয়েছে; এবার দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিবে তা নিয়ে এখন থেকেই অজানা উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা দেখা দিয়েছে। তবে গত ফেব্রুয়ারি পরবর্তী অব্যাহত অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সাধারণভাবে এটাই ধারণা করা হচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতেও দেশের পরিস্থিতি যে আকার ধারণ করবে তা আর যাই হোক সুখকর কিছু হবে না। তবে আপাতত স্বস্তির বিষয় এই যে, বিরোধী দলের নেতাদের সাম্প্রতিক মন্তব্য ও বক্তব্যে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে তেমন বড় কিছু হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে অক্টোবরে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি কোনদিকে যায় সেটাই বিবেচ্য বিষয়। কারণ দুই বড় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের মধ্যে এখন পর্যন্ত আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো কিছু লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অথচ কিছুদিন আগেও দেখা গেছে রাজনীতিতে সমঝোতার একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল, আলোচনার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিএনপিকে চিঠি দেয়ার কথাও জানিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক; কিছুদিন আগ পর্যন্ত বাংলাদেশস্থ কূটনীতিকরা সমঝোতার ব্যাপারে তত্পরও ছিলেন। প্রধান দুই দলের একগুঁয়েমি ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার একরোখা নীতির কারণে হতাশ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তারা। এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি রাজনীতিতে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি মরিয়া হয়ে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ খুঁজছে। আর এর অন্যতম কারণ হচ্ছে অসহিষ্ণু রাজনীতিতে কেউই কাউকে বিশ্বাস করছে না; বরং একপক্ষ ক্ষমতায় গেলে অন্যপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা করছে। বস্তুত পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবির পর আওয়ামী নেতৃত্বের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এসেছে। তাদের ধারণা, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তারা নিশ্চিতভাবেই পরাজিত হবেন। নির্বাচনের সময় সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা না থাকলে দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। সম্ভবত তারা এও আশঙ্কা করছেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে জামায়াত এবং হেফাজতের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে তাদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় আতংকিত তারা। এসব কারণে জনমত উপেক্ষা করে শেষ মুহূর্তে আলোচনার উদ্যোগে বিরোধিতা আছে সরকারের মধ্যে। বলা হচ্ছে, সমঝোতার ব্যাপারে বিএনপিকে ছাড় দেয়া মাত্র আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে যাবে। সুতরাং নির্বাচন হতে হবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকেই। সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনে বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোটকে বাদ দিয়ে হলেও নির্বাচন আয়োজন করতে চায় সরকার। অন্যদিকে পাঁচ সিটিতে বিপুল বিজয়ের পর বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা চাঙ্গা ভাব চলে এসেছে। তারা মনে করছেন তাদের পক্ষে জনসমর্থন এমন পর্যায়ে রয়েছে যে, আন্দোলনের মাধ্যমে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করা সম্ভব। এ দাবি আদায় না হলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না, নির্বাচন হতেও দিবে না। বিএনপি সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর তুলনামূলক কম শক্তির সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দেবে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হোক অন্তত একটি গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দাবি জানাবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুযায়ী নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে অক্টোবর মাসজুড়ে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দেয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। এরকমই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার কথায়ও। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে চূড়ান্ত আন্দোলন ঘটবে আগামী অক্টোবরে। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও সম্প্রতি লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে দলকে এখন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি না নিয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদও বলেছেন, অক্টোবরের কর্মসূচির মধ্যে হরতালের পাশাপাশি অবরোধ দেয়া হবে। মাসের শেষদিকে রেল, সড়ক ও নৌপথ অবরোধ করার পরিকল্পনা আছে বিএনপির। প্রধান দুই শিবিরের এই পরস্পরবিরোধী চিন্তার প্রেক্ষাপটে কি ঘটতে যাচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে আরেকটি বিষয় দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে, নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড বর্তমানে এতটা গতিশীল নয় যে, এই কমিশন দিয়ে সংসদ নির্বাচনের মতো একটি বড় আয়োজন সুসম্পন্ন করতে পারবে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনী আইনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। কিন্তু এবার অন্তর্বর্তী বা দলীয় সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হলে সেসব বিধানে পরিবর্তন আনতে হবে। অথচ কমিশন এখনও তা চূড়ান্ত করতে পারেনি। এছাড়া নির্বাচনী আচরণবিধি ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংসদে পাস হতে সময়ের প্রয়োজন হবে। সংসদ থেকে আরপিওতে আরও সংশোধনী দিলে তা পাস হতে আরও বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে। নির্বাচনের আগে এত সময় কমিশন পাবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। অথচ সরকার পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছিল দলীয় সরকারের অধীনেই নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠুভাবে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু সেই কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নির্বাচনী প্রস্তুতিও সম্পন্ন করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। অবশ্য এটাও ঠিক, অন্তর্বর্তী নাকি তত্ত্বাবধায়ক—কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে তা নির্ধারিত না হওয়ায় বেকায়দায় থাকা নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী প্রস্তুতিও পুরোপুরি নিতে পারেনি। তারপরও নির্বাচন কমিশন দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন করার জন্য আইন ও বিধিমালায় দফায় দফায় সংশোধনী এনেছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও দল নির্ধারিত ২০ জনকে প্রচারণার সুযোগ দিয়ে বিধিমালায় সংশোধন করা হচ্ছে। সংসদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার পথ বন্ধ করা হয়েছে। এমনকি ইসির প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও (৯১-ই ধারা) বাদ হয়েছে আরপিও থেকে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় রাখা হয়নি সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিধান। তবে আরপিও সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছে কমিশন এবং সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই এই কমিশনের অধীনে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে এবং বিরোধী দল নির্বাচন কমিশনারদের পরিবর্তনের দাবি তুলেছে। যদি তাই হয় তাহলে সমস্যা-সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করবে। আরেকটি বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হবে সেটা আগামী সংসদ অধিবেশনে পরিষ্কার হবে। কেননা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে এবং তার শেষ সুযোগ নবম সংসদের এই শেষ অধিবেশন। এই অধিবেশনে কোনো ফলাফল না এলে নির্বাচন অন্তর্বর্তী তথা দলীয় সরকারের অধীনেই হবে। পাশাপাশি এও মনে রাখতে হবে, সংসদ ভেঙে যাওয়ার হিসাবে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ আছে আর মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি সময়। এরপর মূলত স্পষ্ট হবে সরকার ও বিরোধী দলের শক্তি-সামর্থ্যের বিষয়টি। তবে এটি বড় সত্য যে, প্রধান দুই দলই নির্বাচনে নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করতে চায়; আর এজন্য দুই দলই নিজেদের সুবিধাজনক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে আগ্রহী। নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘নির্বাচন যতই এগিয়ে আসবে বাংলাদেশে সহিংসতা ততই বাড়তে থাকবে এবং সৃষ্টি হবে হিংসাত্মক পরিস্থিতি।’ বলার অপেক্ষা রাখে না, বিএনপির ঘোষণা অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে দলটির আন্দোলনের মুখে সরকার হার্ডলাইনের পথেই যাবে। আর সে অবস্থায় অক্টোবর মাস থেকে অনিবার্য সংঘাত-সহিংসতা অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য এবং শেষ পর্যন্ত এই সংঘাত কোন মাত্রায় পৌঁছাবে তা-ই উদ্বেগের বিষয়। রাজনীতির এই হিসাব-নিকাশে আগামী দিনে বড় কোনো পরিবর্তন ঘটবে কি-না সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা ঠিক, পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে একতরফা নির্বাচন করা হলে সেই নির্বাচনের সাংবিধানিক বৈধতা থাকবে বটে; কিন্তু দেশি-বিদেশি কোনো মহলেই তা গ্রণযোগ্য হবে না। আর তাতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সংকটেরও নিরসন হবে না। সুতরাং সরকারের উচিত হবে এমন এক নির্বাচন অনুষ্ঠান করা যাতে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। লেখক : সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়