[ সা ম্প্র তি ক ]

আদিলুর রহমান খানের গ্রেফতার জনমনে প্রশ্ন

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সাধারণ সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে গ্রেফতারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যে দক্ষতার ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে তা সত্যি প্রশংসার যোগ্য। জানার চেষ্টা করলাম যে, আদিলুর রহমান খান কোনো দাগি আসামি, খুনি কিংবা কোনো পলাতক সন্ত্রাসী কিনা? তাঁর বিরুদ্ধে এরকম কিছুই খুঁজে পেলাম না। জেনে বিস্মিত হলাম যে, তিনি একজন মানবাধিকার কর্মী এবং বহুল পরিচিত ব্যক্তিত্ব। এই ব্যক্তিটিকে গ্রেফতার করার নাটকীয়তা শুধু আমাকেই বিস্মিত করেনি, বিস্মিত হয়েছে দেশি-বিদেশি সচেতন সব মানুষ। একটি ব্যাংকের মাইক্রোবাস নিয়ে সাদা পোশাকে ওত পেতে থেকে আদিলুর রহমান খানকে রাতে গ্রেফতারের এই প্রক্রিয়ার সদুত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে আদিলুর রহমান খানের মতো একজন ব্যক্তিত্বকে গ্রেফতার করে, সেই দক্ষতার পরিচয় যদি সত্যিকার অপরাধীদের ধরতে আইন- শৃঙ্খলা বাহিনী দেখাতে পারত তাহলে দেশের মানুষ অন্তত স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে সক্ষম হতো। দুর্ভাগ্যজনক এই যে, আমাদের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী অপরাধী ছাড়া অন্যদের ধরতে পারদর্শিতার চূড়ান্ত পরিচয় দিতে সক্ষম হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই গ্রেফতার? বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে জানতে পারলাম যে, তাঁকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ধারার ব্যবহার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ন্যক্কারজনকভাবে ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারের আমলে তার সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার জন্য অতীতে এই ধারাটির ব্যবহার বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এরকম একটি ধারা প্রয়োগ করে আদিলুর রহমান খানের মতো একজন মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে যে, ৫৪ ধারা ছাড়াও আদিলুর রহমান তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার ১ ও ২ উপধারায় অপরাধী। এই ধারায় অপরাধী চিহ্নিত করে আদিলুর রহমানের বিরুদ্ধে দুইটি জিডি করা হয়েছে বলেও জানতে পেরেছি। বাংলাদেশের থানাগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে যে, বহু অপরাধের জন্য বহু জিডি করা আছে। যেগুলোর কোনো তদন্তই হয়নি। অথচ আদিলুর রহমানের মতো ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে এটি তাঁর গ্রেফতারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সংবাদ মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, আদিলুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে একটি প্রতিবেদন ওয়েবসাইডে প্রকাশ করার জন্য। প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে গত ৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে। উক্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, আইন- শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৬১ জন মারা গেছে। একটি মানবাধিকার সংস্থা বা সংগঠন হিসেবে অধিকারের এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা কোনো অপরাধ নয় বলেই আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। একটি মানবাধিকার সংস্থা হিসেবে অধিকার অবশ্যই প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে। এ কারণে আদিলুর রহমানকে গ্রেফতার করা বাক স্বাধীনতার উপর যেমন হস্তক্ষেপ, তেমনি গোপনীয়তা রক্ষায় স্বাধীনতার উপরও হস্তক্ষেপ বটে। এই প্রতিবেদনে যদি কোনো মিথ্যা তথ্য পরিবেশিত হয়, তবে সে বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার সরকারের আছে। বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে মৃতের সংখ্যা নিয়ে। সরকারের দাবি ঐ রাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কোনো মারণাস্ত্র ব্যবহার করেনি এবং কারো মৃত্যু ঘটেনি। অথচ অধিকারের দাবি তার বিপরীত। সরকারের তরফ থেকে অধিকারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে মৃত ব্যক্তিদের পরিচিতি এবং তাদের পরিবার-পরিজনদের পরিচিতি। নিরাপত্তার কারণে এই তথ্য অধিকার সরকারকে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অধিকারের বক্তব্য হচ্ছে যে, এই তথ্য পেলে সরকারের নিপীড়ন-নির্যাতন উক্ত মৃত ব্যক্তিদের পরিবার-পরিজনদের উপর শুরু হবে। একই সাথে অধিকার এ কথাও বলেছে যে, কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠিত হলে অধিকার সেই কমিশনকে তথ্য সরবরাহ করবে। এ কথা থেকে স্পষ্ট যে, অধিকার তথ্য সরবরাহে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে না। তাহলে কেন আদিলুর রহমানের মতো একজন মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করা হলো? হেফাজতে ইসলামের ৫ মে ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথম থেকেই জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল। জনমনে আজ সন্দেহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, কারো মৃত্যু ঘটেনি। অথচ অন্যান্য সূত্র থেকে দাবি করা হয়েছে যে, অনেকেরই সেদিন মৃত্যু হয়েছে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার মনেও প্রশ্ন যে, সত্যিই সেদিন কী ঘটেছিল? এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারের কার্যক্রম জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। সমস্ত টিভি চ্যানেলে প্রচার বন্ধ করে মধ্যরাতে হেফাজতে ইসলামের উপর অভিযান চালানো কতটুকু যৌক্তিক হয়েছে, সেটি প্রশ্ন সাপেক্ষ। কেনইবা সরকার হেফাজতে ইসলামের মতো একটি মৌলবাদী সংগঠনকে আকস্মিকভাবে শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছিল? কেনইবা তাদের ঢাকা অবরোধের সুযোগ দেয়া হয়েছিল? দিনের আলোয় যখন অরাজকতা সৃষ্টি হয়, কেন সরকার তখন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি? এসব প্রশ্নের জবাব অধিকারের বক্তব্যেই নিহিত। অধিকার যে স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে তাই একমাত্র সমাধান দিতে পারে এসব প্রশ্নের। অধিকারের ধারণা অমূলক নয় যে, সরকারের হাতে তথ্য গেলে নিপীড়ন-নির্যাতন শুরু হতে পারে। অতীত ঘাঁটলে এ ধরনের অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। কাজেই সরকারকে তথ্য সরবরাহ না করে অধিকার সঠিক কাজটি করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক সঠিক কথাই বলেছেন যে, সবকিছুই সরকারের হাতে তুলে দিলে সংবিধান মানুষের বাসস্থান ও যোগাযোগের গোপনীয়তার যে অধিকার দিয়েছে তা অর্থহীন হয়ে পড়বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল সঠিক পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, তথ্য যদি দিতে হয় তাহলে মানবাধিকার রক্ষণ বলে কিছু থাকবে না। সরকার দাবি করেছে যে, আদিলুর রহমান দেশে-বিদেশে সরকার এবং শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে। আদিলুর রহমানের গ্রেফতার নিয়ে আজ দেশে-বিদেশে যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে তাতে কী সরকারের সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে? সাধারণ জনমনে এই গ্রেফতার নিয়ে যে ধারণা জন্মেছে তাহলো সরকার তার সমালোচকদের কঠোর হস্তে দমন করতে চায়। একজন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, আদিলুর রহমান মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। আর যদি তথ্যের সত্যতা থাকে তবে সরকার যে কার্যক্রম ঘটিয়েছে তা ন্যক্কারজনক। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, এই বির্তকের সমাধান অধিকারের বক্তব্যেই নিহিত। সরকারের উচিত হবে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের মাধ্যমে এই বির্তকের অবসান ঘটানো। এই বির্তকের অবসান ঘটানোর মধ্য দিয়ে নাগরিকদের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারও নিশ্চিত হবে। কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার মতামত সরকারের বিরুদ্ধে গেলেই তাকে যে এই ন্যক্কারজনকভাবে গ্রেফতার হতে হবে না তার নিশ্চয়তা নেই। তদন্ত হলে সত্য বেরিয়ে আসবে এবং এ বিষয়সহ যে কোনো বিষয়ে মতামত প্রকাশের অধিকারটিও সুনিশ্চিত হবে। মত প্রকাশের এই অধিকার নিশ্চয়ই কোনো সচেতন নাগরিক হারাতে রাজি নন। তাই তদন্ত অপরিহার্য। তৃতীয় বিশ্বের যে সমস্ত দেশে বর্তমানে সামরিক শাসনের পরিবর্তে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে সমস্ত দেশের এই নির্বাচিত সরকারের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এই সমস্ত দেশের নির্বাচিত সরকারগুলোকে গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান না। এই সমস্ত সরকারকে গবেষকগণ Electoral Authoritarianism, Delegative Democracy, Neopopulism কিংবা Facade Democracy হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই সমস্ত সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিরোধী শক্তি ও মতকে চরমভাবে দমন করতে চেষ্টা করে। আদিলুর রহমানের গ্রেফতার অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যে, আমাদের সরকার কি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক?  লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়