কেনাকাটার নেশায় বুঁদ মারিসা মেয়ার

গত বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে দায়িত্ব নিয়েছেন ইয়াহু’র। সময়ের হিসেবে তাই এক বছর পার হয়ে গেছে। এর মধ্যেই উঠেপড়ে লেগেছেন ইয়াহুকে বদলে দিতে। গত এক বছর সময়ে প্রযুক্তি বিশ্বের বাঘা বাঘা সব প্রতিষ্ঠানকে পেছনে ফেলে অবশ্য শেয়ার বাজারে সবচেয়ে বেশি দর বাড়িয়েও নিতে পেরেছেন। সেই হিসেবে প্রযুক্তি বিশ্বের একজন সফল সিইও হিসেবেই স্বীকৃত দেওয়া হচ্ছে তাকে। হ্যাঁ, বলা হচ্ছে মারিসা মেয়ারের কথা। একের পর এক সিইও বদলে যখন ইয়াহুতে চলছে নেতৃত্বের সংকট, স্কট থম্পসনকে যখন বরখাস্ত করা হয়েছে তার বায়োডাটা কেলেংকারীর জন্য, তখন গুগল’র এই কর্মকর্তাকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হয় ইয়াহু’র নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। সেই কাজে যে সাফল্যের পথে তিনি হাঁটছেন, সেটা এখন বলাই যায়। ইয়াহুতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নানা ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন মারিসা নিয়ে আসেন। তবে এর সাথে সাথে তার আরও একটি দিকও স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রযুক্তি বিশ্বের সামনে। আর তা হলো কেনাকাটার অভ্যাস। না, ব্যক্তিজীবনে মারিসার কেনাকাটা নিয়ে কথা হচ্ছে না, কথা হচ্ছে ইয়াহু’র পক্ষ থেকে একের পর এক ছোট-বড় নানা ধরনের প্রযুক্তি পণ্য ও সেবার প্রতিষ্ঠান কেনার কথা। ১৯৯৫ সালের মার্চে যাত্রা শুরু করে ইয়হু। এরপর ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে এসে ‘নেট কন্ট্রোল’ নামের একটি ওয়েব সার্চ ইঞ্জিন কিনে নেয় ইয়াহু। অর্থাত্ প্রতিষ্ঠার দুই বছর পরে প্রথম অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কিনে নেওয়া শুরু করে তারা। এরপর মারিসা যোগ দেওয়ার আগ পর্যন্ত ১৭ বছরে সর্বমোট ৬৬টি বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে কিনে নিয়েছে তারা। আর মারিসা যোগ দেওয়ার তিন মাসের মাথাতেই ‘স্টাম্পড’ নামের একটি সামাজিক যোগাযোগের ছোট্ট প্রতিষ্ঠানকে কিনে নেওয়া হয়। এটা ছিল শুরু। এরপর এক বছরে আরও ২০টি প্রতিষ্ঠানকে কিনে নেয় মারিসা মেয়ারের অধীনস্ত ইয়াহু। অর্থাত্ মারিসা মেয়ার যোগ দেওয়ার এক বছরের মধ্যেই ২১টি ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানকে কিনে নিয়েছে ইয়াহু। সংখ্যার বিচারে মারিসা এখানে ছাড়িয়ে গিয়েছেন তার পূর্বসূরী তো বটেই, অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকেও। মারিসার অধীনে থেকে ইয়াহু’র কিনে নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্যও রয়েছে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, তেমনি রয়েছে খবর সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান, আবার রয়েছে ভিডিও কনফারেন্সিং, গেমিং বা অন্যান্য নানা ধরনের প্রোডাক্টিভিটি সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানও। নিজেদের সেবাকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য থেকেই বৈচিত্র্যময় এসব প্রতিষ্ঠানকে একে একে কিনে নিয়েছে ইয়াহু। মারিসা মেয়ার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইয়াহু প্রথম বড় যে প্রতিষ্ঠানকে কিনে নেয়, সেটি হচ্ছে ‘স্নিপ.ইট’। এটি এক ধরনের সোস্যাল নেটওয়ার্ক, যেখানে ব্যবহারকারীরা নিজেদের আগ্রহের বিষয়ের আর্টিকেল, ছবি, ভিডিও বা অন্যান্য কনটেন্টকে সংগ্রহ করতে সক্ষম। ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে এই সোস্যাল প্ল্যাটফর্মটি কিনে নেয় ইয়াহু এই বছরের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে। এরপর মার্চে এসে মারিসা কিনে নেয় ব্রিটিশ বংশোদ্ভুত অস্ট্রেলিয়ান তরুণ নিক ডি’অ্যালোইসিও’র তৈরি করা ‘সামলি’। এই অ্যাপ্লিকেশনটি যেকোনো সংবাদের সারসংক্ষেপ তৈরি করে দিতে পারে। আবার একই ধরনের খবর সংগ্রহও করতে পারে বিভিন্ন সাইট থেকে। এর জন্য ইয়াহুকে ব্যয় করতে হয় ৩০ মিলিয়ন ডলার। গত জুলাই মাসের শুরুতেই পরপর দুই দিনে দুই প্রতিষ্ঠানকে কিনে নেয় ইয়াহু। এই দুইটি প্রতিষ্ঠান হলো ‘কুইকি’ এবং ‘জবনি’। এর মধ্যে কুইকি মূলত একটি আইফোন অ্যাপ্লিকেশন যা বিভিন্ন ছবি এবং ভিডিওকে একটি সিনেমাতে রূপ দিতে সহায়তা করে। ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করা এই অ্যাপ্লিকেশনটিকে ইয়াহু কিনে নেয় ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে। কুইকি কিনে নেওয়ার পরের দিনেই ইয়াহু ঘোষণা দেয় জবনি কিনে নেওয়ার। ৪০ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেওয়া জবনি মূলত বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন এবং সার্ভিস তৈরি করে। মাইক্রোসফটের আউটলুক এবং বিভিন্ন মোবাইল ডিভাইসের জন্য রয়েছে জবনির বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন। তবে মারিসা মেয়ার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইয়াহু সবচেয়ে বেশি সাড়া জাগাতে সক্ষম হয় ‘টাম্বলার’ কিনে। মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে টাম্বলার অত্যন্ত জনপ্রিয় বিশ্বব্যাপী। ১৩০ মিলিয়নেরও বেশি ব্লগ হোস্ট করে থাকে টাম্বলার। ব্লগিংয়ে নিজেদের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করে তুলতেই টাম্বলারকে কিনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মারিসা মেয়ার। এর জন্য অর্থও কম ব্যয় করতে হয়নি। টাম্বলারের পেছনে খরচ হয়েছে ১১০ কোটি ডলার। তা অবশ্য জলে যায়নি বলেই মন্তব্য প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের। এসব বড় বড় প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ইয়াহু অন্যান্য যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিনে নিয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে স্টাম্পড, অন দ্য এয়ার, অ্যালাইক, জাইব, অ্যাস্ট্রিড, গোপোলগো, মাইলওয়াইজ, লোকি স্টুডিওজ, প্লেয়ারস্কেল, ঘোস্টবার্ড সফটওয়্যার, রনডি, বিগনগিস প্রোডাকশন, জেলিক, লেক্সিটি প্রভৃতি। এই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে রকমেল্ট। এই মাসেরই শুরুতে সামাজিক যোগাযোগের জন্য বিশেষায়িত এই ওয়েব ব্রাউজার কিনে নেয় ইয়াহু। রকমেল্ট অবশ্য এর আগে ঘোষণা দেয় ডেস্কটপের জন্য তাদের ব্রাউজারকে বন্ধ করে দিয়ে কেবল স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট পিসির অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে নিজেদের চালু রাখার। তবে ইয়াহু একে কিনে নেওয়ার পরে এটি কোন পথে নিজেদের চালু রাখবে, সে সম্পর্কে এখনও কিছু জানায়নি রকমেল্ট বা ইয়াহু। মারিসা মেয়ারের এই কেনার স্বভাবের সমালোচনা করেছেন অনেক প্রযুক্তি বিশ্লেষকই। তবে সেসব সমালোচনাকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আরও প্রতিষ্ঠানকে কিনে নেওয়ার বিষয়ে নিজের অনড় অবস্থানের কথা স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন প্রযুক্তি বিশ্বের সকলকে।