জনস্বাস্থ্য রক্ষার উদ্যোগ বিফলে যায় কেন
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০১৩, ২১:২৬
নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণ বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তের শ্রেষ্ঠ জনস্বার্থ বিষয়ক উদ্যোগ হলেও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের পূর্বাপর অভিজ্ঞতা বলে দেয়— এটা বিফলে যেতে বাধ্য। কারণ যে সময়ে এসে সরকার এই কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন হুবহু একই রকম মেয়াদ প্রান্তে বিগত সরকার ‘বিশুদ্ধ খাদ্য আইন-১৯৫৯’র প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে National Food Safety Advisory Council নামের Authority গঠন করেছিলেন ২০০৫ সালে। ফলাফল শূন্য। দেশের জনগণের নিরাপদ খাদ্য-স্বাস্থ্য রক্ষার সরকারি উদ্যোগ বার বার ব্যর্থ হবার কতক সুনির্দিষ্ট কারণ বিদ্যমান। উদ্যোক্তা মন্ত্রী-আমলারা যে বোঝেন না এমনও নয়, প্রধানত যাদের অসহযোগিতার কারণে সরকারের এই মহতি উদ্যোগ ব্যর্থ হয়—সেই চক্রের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে এবং জাতীয় পর্যায়ের নীতি নিধারণী কমিটিসমূহে স্বজাতীয় বিভাগের নিম্নস্তরের প্রতিনিধিত্ব না-রাখতে পারলে দেশের মানুষের নিরাপদ খাদ্য-স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা বিধান স্বপ্নই থেকে যাবে।
বিগত প্রায় দেড় যুগ ধরে দেশের রাজনীতির ভেজালের সঙ্গে খাদ্যদ্রব্যের ভেজাল সমান্তরাল গতিতে বাড়তে থাকায় জনগোষ্ঠীর সচেতন অংশ, সংবাদ মাধ্যম ও বিশেষজ্ঞদের অনেকে ভেজাল খাদ্য গ্রহণে মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতিকর দিক জনসম্মুখে উপস্থাপন করার পাশাপাশি জনমত তৈরি অব্যাহত রেখেছেন। জনমতের চাপসহ আদালতের নির্দেশনায় বাধ্য হয়ে সরকার ‘বেশ কিছু করে যাচ্ছি’ ধরনের কিছু কর্মসূচি হাতে নেন। যার মধ্যে ঢাল-তলোয়ারবিহীন নিধিরাম সরদারের মতো (জনবল, পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রপাতির অভাব) দপ্তরসমূহের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও আইনের সংশোধন প্রধান্য পায়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় মতবিনিময় সভায় খাদ্যবিজ্ঞানী, আইন প্রণেতা, সর্বস্তরের প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞগণের মতামত নেওয়া হচ্ছে, যা কখনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
খাদ্যের ভেজালের সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি সম্পর্কিত থাকায় ভেজাল প্রতিরোধের জাতীয় কৌশল নির্ধারণ ও বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে যে সব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে তার মধ্যে ক. ভেজালের পূর্বাপর চিত্র ও প্রতিরোধের কৌশল কী ছিল? খ. জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণের প্রধান দায়-দায়িত্ব কার? গ. FAO/WHO-র গাইড লাইনস্ কী? ঘ. ব্যর্থতার কারণসমূহ চিহ্নিতকরণ। এই চারটি বিষয়কে আড়ালে রেখে ভেজালের মূলোত্পাটন সম্ভব হবে কিনা তা ভবিষ্যত্ই বলে দেবে। গড়ে ৭৫ শতাংশ খাদ্যদ্রব্যে ভেজালের উপস্থিতিতে দেশের জনগণ যেখানে ব্যাপক মাত্রায় আতংকিত, পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থায় গোটা বাংলাদেশই একটা বাজার বা বৈশ্বিক বাজারের অংশ সেখানে চালাকির মাধ্যমে ভোক্তাগণকে বোকা বানানোর হীন উদ্দেশ্যে যারা অমুক-তমুক বাজার ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করছেন তাদেরকে ‘অতিচালাকের গলায় ফাঁস’ প্রবাদটা মনে করিয়ে দিতে চাই। বাস্তবে চিকিত্সাবিজ্ঞানের তিনটি মৌলনীতির একটি হচ্ছে রোগ-প্রতিরোধমূলক ধারা। যার সঙ্গে জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণের বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হু/ফাও-এর গাইড লাইনস্ অনুসরণ করে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও খাদ্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বর্তানো রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর (বিজনেস রুলস্ অব ১৯৯৬ দ্রষ্টব্য)। উল্লিখিত ধরনের কাজে টেকনোলজিক্যাল পর্যায়ের দক্ষ জনবল তৈরি অব্যাহত থাকলেও কোনো এক জানা/অজানা কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জনস্বাস্থ্যের রোগ-প্রতিরোধমূলক ধারাকে দুর্বল করে রেখেছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যায় নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি না করায় এবং যুগোপযোগী আইন-কানুন প্রণয়নে যথাযথ ভূমিকা পালন না করায় রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে উত্পাদিত ১৫০০ উদ্বৃত্ত জনবল কোনো কাজেই আসছে না। শুধু তাই নয়, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিগণ যাঁদের চাপে বাধ্য হয়ে সুষম বিকাশ-বিভাজনের নীতি পরিহার করে ইউনিয়ন পর্যায়ে কমপক্ষে ১ জন (কোথাও কোথাও ২ জন) ডাক্তারের পদ সৃষ্টি করে নিয়োগদান করেছেন তাঁদের বেশিরভাগই যে গ্রামে গিয়ে জনগণের সেবাদানে আগ্রহী নয় তা আজ সরকারের উচ্চ পর্যায়েও স্বীকৃত। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যের রোগ-প্রতিরোধমূলক ধারায় ১৯২৭ সাল থেকে কর্মরত স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের পদের সংখ্যা, মর্যাদা ও কর্মপরিবেশের কোনো উন্নয়ন হয়নি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে থানা পর্যায়ের ডিসপেন্সারির LMAF কম্পাউডারদের ৬ মাসের শর্টকোর্স প্রশিক্ষণ দিয়ে এমবিবিএস ডিগ্রি ও প্রথম শ্রেণির অফিসারের মর্যাদা প্রদান করা হলেও সেই সময়ে তাদের চেয়ে উচ্চশিক্ষিত স্যানিটারি ইন্সপেক্টরগণ অবহেলিত থেকে যান।
বিজনেস রুলস্ অব ১৯৯৬ ও WHO-র পরামর্শ পাশ কাটিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গৃহীত একপেশে নীতি বা কর্মকৌশলে ইতিমধ্যে দেশের ১৬ কোটি মানুষকে ডাক্তারদের বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। জনমনে সাধারণ ধারণা জন্মেছে যে, ডাক্তারদের কাজ একটাই চিকিত্সাদান; রোগ-প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে চিকিত্সাবিজ্ঞানের অধীন তা নাগরিকবৃন্দ ভুলতে বসেছেন। প্রকৃত বিবেচনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণের (ডাক্তার) প্রধান ও মৌলিক কাজই হচ্ছে জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণ ও জেলায় জেলায় ভোক্তাদের স্বার্থে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যদ্রব্য-পরিবেশের নিশ্চয়তা বিধান (সিভিল সার্জন কর্তৃক প্রিমিসেস দানের আইন দ্রষ্টব্য)। ১৯৯৫ সালে TBT সম্পাদনের পর এর ক্ষতিকর দিকের প্রয়োগে দেশের স্বাস্থ্য প্রশাসন অতিমাত্রায় উত্সাহী হয়ে ওঠে। ফলে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ, প্রাইভেট ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক নামের দোকান দ্রুততার সঙ্গে বেড়ে উঠছে। এইদিকে লাভের পাল্লা ভারী হওয়ায় ঐদিকের দায়িত্বটুকু বেমালুম চাপা পড়ে যায়। একইসঙ্গে সরকার বিভ্রান্তিতে পড়ে খাদ্য নিয়ন্ত্রণের আইন-কানুনের সংশোধনী আনতে কখনো এলজিআরডি কখনো বা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হচ্ছেন। তাতে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের মতপার্থক্য ভেতরে ভেতরে বিরোধে রূপ নিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। কার্য-কারণ সম্পর্ক বুঝে রাষ্ট্র ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিভ্রান্তি পরিহার করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হলে এবং নাগরিদের তরফে নিরাপদ খাদ্য-স্বাস্থ্য আন্দোলন জোরদার করা না গেলে একদিকে যেমন মানবসৃষ্ট এই বিপর্যয় থেকে দেশের জনগণের সহজে নিষ্কৃতির সম্ভাবনা নেই অন্যদিকে তেমনি পুঁজির স্বাভাবিক ধর্ম মুনাফা-অতিমু্নাফায় বণিক ডাক্তারদের পকেট ভারী হতে থাকবে।
ঢাকা