ভারতের ভবিষ্যত্ প্রধানমন্ত্রী!

ভারতের তরুণ প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ রাহুল গান্ধীকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বিশেষ করে তিনি কবে নাগাদ বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন, এটা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। সাম্প্রতিককালে সেই আলোচনায় আরও গতি এসেছে একটি বিশেষ কারণে এবং সেটা হলো, তার মা ভারতের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সোনিয়া গান্ধীর অসুস্থতার সংবাদে। গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভারতে সোনিয়া এবং রাহুল গান্ধী সরাসরি ক্ষমতায় না থেকেও অত্যন্ত ক্ষমতাবান। বলা চলে দেশের সরকার পরোক্ষভাবে তারাই চালাচ্ছেন। কারণটা স্পষ্ট। ক্ষমতায় রয়েছে কংগ্রেস। এই দলের প্রধান হলেন সোনিয়া গান্ধী এবং সাধারণ সম্পাদক তার পুত্র রাহুল গান্ধী। উভয়েই পার্লামেন্ট সদস্য। তবে, কেউই কোনো সরকারি পদ ইচ্ছা করেই গ্রহণ করেননি। কংগ্রেস ২০০৪ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসে এবং সেই সাফল্য সংগঠনের প্রধান সোনিয়া গান্ধীর জন্যই সম্ভব হয়। তাই এটাই প্রত্যাশিত ছিল যে, তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে সোনিয়া গান্ধী সেই সুবর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেননি এবং বর্ষীয়ান নেতা ও সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং সোনিয়ার পছন্দেই প্রধানমন্ত্রী হন। ইতালীয় বংশোদ্ভুত সোনিয়ার অবশ্য সেই সুযোগ প্রত্যাখ্যান করার পেছনে এটি বড় কারণও ছিল। সেটা হলো তার বিরোধী ও সমালোচকরা বলছিল, ভারতের মতো একটি বিশাল দেশ কি শেষ পর্যন্ত একজন ‘বিদেশিনীর’ দ্বারা শাসিত হবে! দেশে কি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতো আর মানুষ নেই! যদিও সোনিয়া গান্ধীর সরকার প্রধান হওয়ার পথে কোনো আইনগত বা অন্য কোনো বড় বাধা ছিল না, তারপরও তিনি মনে করেছেন, এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী না হওয়াই ভালো। এটা নিয়ে দেশে কোনো বিতর্ক এবং রাজনৈতিক তিক্ততা সৃষ্টি করতে চাননি তিনি। সে কারণেই সোনিয়া গান্ধী সেই প্রধানমন্ত্রিত্বের সম্ভাবনা থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস যখন মিত্রদের নিয়ে আবার ক্ষমতায় আসে, তখনও তিনি মনমোহন সিংকেই প্রধানমন্ত্রিত্ব চালিয়ে যেতে বলেন। যেহেতু, কংগ্রেস এবং মিত্রদের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, শাসক মোর্চা যাকে চাইবে, তিনিই স্বাভাবিকভাবে সরকার প্রধান হবেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল ক্ষমতা সোনিয়া-রাহুলের কাছে। তবে, মনমোহন প্রধানমন্ত্রী হলেও কংগ্রেসের অগণিত নেতাকর্মী চান, দেশের খ্যাতনামা ‘নেহেরু গান্ধী’ পরিবার থেকেই আরেকবার প্রধানমন্ত্রী করা হোক এবং এটা তাদের ঐকান্তিক বাসনা। কংগ্রেস এবং ভারতের নেতৃত্বের সঙ্গে এই পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। ব্রিটিশ ভারতে আইনজীবী মতিলাল নেহেরু স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে একজন কংগ্রেস নেতা হিসেবে জড়িত ছিলেন। তার পুত্র জওহরলাল নেহেরু রাজনীতিতে অসামান্য সাফল্য প্রদর্শন করে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন এবং আমৃত্যু সেই পদে আসীন ছিলেন। তারই কন্যা ইন্দিরা গান্ধী পিতার মৃত্যুর পর প্রথমে তথ্যমন্ত্রী এবং পরে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে দীর্ঘদিন রাজনীতি এবং শাসনে সরবে পদচারণা করেন। ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী স্বামী রাজনীতিবিদ ফিরোজ গান্ধীর পদবি গ্রহণ করে ‘গান্ধী’ হন এবং সেই থেকে পরিবারটি নেহেরু গান্ধী হিসেবে পরিচিত। ইন্দিরা ক্ষমতা হারিয়ে আবার ১৯৮০ সালের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রিত্বে ফিরে আসেন। কিন্তু ১৯৮৪ সালে শিখ দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হলে পুত্র রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। আগে ছোট ছেলে সঞ্জয় গান্ধীকে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হলে ইন্দিরা গান্ধী বড় ছেলেকেই রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। দুর্ভাগ্যবশত রাজীব গান্ধীও ১৯৯১ সালে শ্রীলংকার তামিল বিদ্রোহীদের বোমা বিষ্ফোরণে দক্ষিণ ভারতে নিহত হন। সেই সময় তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হয়ে জাতীয় নির্বাচনের আগে সেখানে গিয়েছিলেন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে কংগ্রেস সরকার গঠন করলে দলীয় নেতাকর্মীরা রাজীব গান্ধীর বিধবা স্ত্রী সোনিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হতে অনুরোধ জানালে তিনি সেই সুযোগে সাড়া দেননি। সরকার প্রধান হন নরসীমা রাও। সোনিয়া গান্ধী রাজনীতিতেই কোনো উত্সাহ দেখাননি। বেশ পরে যখন কংগ্রেস ক্ষমতা হারিয়ে দুরবস্থায় বিচরণ করছিল, তখন সোনিয়া রাজনীতিতে এসে দলের হাল ধরেন। সোনিয়া পুত্র রাহুল গান্ধী সোনিয়া গান্ধীর আমেরিকায় অবস্থানকালে দলকে চালানো এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিনি চার সদস্যের একটি কমিটি করে দিয়ে গেছেন। এর মধ্যে রাহুল গান্ধী আছেন এবং বিশ্লেষকদের ধারণা, এর মধ্য দিয়ে রাহুলকে প্রধানমন্ত্রী করার লক্ষ্যে আরেক ধাপ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। তার মাঝে বেশ কয়েকজন সিনিয়র দলীয় নেতা, প্রণব মুখার্জী এবং দিগ্বিজয় সিং বলেছেন, রাহুল গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ড. মনমোহন সিং নিজে বলেছেন, রাহুল প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি সানন্দে স্বীয় পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন। ৪১ বছর বয়স্ক রাহুল প্রত্যক্ষ ক্ষমতার কাছাকাছি আসছেন। ২০১৪ সালে বর্তমান সরকারের মেয়াদের আগে যে তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটা প্রায় নিশ্চিত, যদি না পরিস্থিতি ও পরিকল্পনায় কোনো বড় পরিবর্তন না হয়। অনেকে মনে করছেন সেটা হয়তো আগামী বছরের শেষেই হতে পারে। আলোচনার শীর্ষে থাকা সোনিয়া পুত্র রাহুল গান্ধী ১৯৭০ সালে দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। তরুণ রাহুলের পড়াশোনার পাঠ শুরু হয়ে দিল্লির সেন্ট কলোম্বিয়া স্কুল থেকে। এরপর ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত দেহরাদুন দুন স্কুলে ছিলেন। সেই সময় তার বাবা রাজনীতিতে যোগদান করেছিলেন। সময়টা ছিল ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। সেইসময় রাহুল গান্ধীর বোন, প্রিয়াংকাকে পড়াবার জন্য বাসাতেই শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে রাহুল গান্ধীকে সেন্ট স্টেফেন কলেজে ভর্তি করা হয়। দিল্লির এই কলেজ থেকে তিনি ১৯৮৯ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন। তবে এর পরপরই হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। তবে খুব বেশিদিন সেখানে পড়ার সৌভাগ্য তার হয়নি। প্রথম বছর পড়ার পরে নিরাপত্তার কারণে তাকে রোলিং কলেজে বিবিএ পড়তে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ১৯৯৪ সালে তিনি বিবিএ শেষ করেন। বাড়তি সতর্কতার কারণে তার প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল। পড়াশোনা শেষের পরে তিনি দেরি না করে লন্ডনের একটি কনসাল্টিং ফার্মে যোগ দেন। ২০০২ সালে মুম্বাইয়ের একটি বিখ্যাত ফার্ম ব্যাকঅপস সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেডের ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। এভাবেই এগিয়ে চলে তার ক্যারিয়ার। সবকিছু বেশ গোছানেই ছিল তার, কিন্তু রক্তের টান খুব বেশি সময় উপেক্ষা করে থাকতে পারেননি তিনি। ২০০৪ সালের মার্চে তার রাজনীতিতে প্রবেশের ঘোষণা দেন। ভারতের লোয়ার হাউজ পার্লামেন্টের লোকসভার নির্বাচনে উত্তর প্রদেশ থেকে নির্বাচন প্রচারণায় নামেন তিনি। খুব অল্প সময়েই সাফল্যও পেয়ে যান। এ সাফল্যের মধ্য দিয়েই শুরু হয় তার রাজনীতির অঙ্গনে পথচলা। রাহুল গান্ধীর রাজনীতিতে প্রবেশ সেসময় রাজনীতির জন্য বেশ ভালো একটা চমক ছিল। রাজনীতি শুরু করেই তিনি কংগ্রেসের ক্ষমতাশীল ভাট্টাচারিয়া পার্টিকে হারান। রাহুল ও তার বোন প্রিয়াংকা গান্ধী মিলে তাদের মায়ের বেশ ভালোই প্রচারণা চালিয়েছিলেন। ২০০৭ সালে উত্তর প্রদেশের ইলেকশনে অংশ নেন রাহুল। সেখানে ২২ আসনের ভোট পান তিনি। সেইসময় তিনি একই সাথে ইয়ুথ কংগ্রেস এবং ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ইউনিয়নে যোগ দেন। তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি সেখানেও। অনেকেই তাকে ভবিষ্যত্ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাবা শুরু করেন। সেই কথা যেন প্রমাণ করতেই কাজে নামেন রাহুল। ২০১২ সালে একটি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় তাকে। ‘নিউ আইডোলজি’ নিয়ে সামনে আসেন তিনি। সম্ভাবনাময় এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখান তিনি। এরফলে ২০১৩-তে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে পার্টিতে নিয়োগ পান তিনি। ভূমিকা রাখেন দেশের দারিদ্রতা দূরীকরণেও। সবাইকে আত্মউন্নয়নশীল হওয়ার প্রেরণা দিতে থাকেন সবসময়ই। সেই সাথে তিনি সবাইকে সাথে নিয়ে সফলতার পথে এগিয়ে চলার কথাও জানান। এসব কিছুর মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে তার উজ্জ্বল উপস্থিতির প্রমাণই পাওয়া যায়। আর সেগুলো প্রকাশ পায় কখনও বা তার কাজে আবার কখনও তার দর্শনে। সুতরাং, আমরা সবাই আশা করতেই পারি, সেই দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন রাহুল গান্ধীকে দেখা যাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আসনে।